স্বামী বাউলানন্দজীর পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন সময়ের কথা বলা হচ্ছিলো। স্বামী বাউলানন্দ ওখানে বিভিন্ন উৎসব করার কথা ভাবছিলেন । ভক্তদের সঙ্গে পরামর্শ করে ভক্তগণ এবং অন্যান্য কতিপয় ব্যক্তির সহায়তায় দশেরা, মুকোটি এবং মহা শিবরাত্রি উৎসব পালনের সিদ্ধান্ত হোল এবং এগুলি জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হতে লাগলো। এই উৎসব গুলি আরো বেশি করে ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের আকর্ষণ করতে লাগলো। সমভূমির লোকেরা উপজাতিদের সংস্পর্শে আসতে লাগলো । স্বামী বাউলানন্দজী এটাই আশা করেছিলেন । এই সমভূমির লোকেরা আসার সময় সঙ্গে করে নতুন এবং পুরোনো কাপড় নিয়ে আসতো এবং উপজাতিদের মধ্যে সেগুলি বিতরণ করতো। উপজাতিরা প্রীতিপূর্ণ হাসি দিয়ে তাদের এই দাক্ষিণ্যের উত্তর দিতো। উভয়পক্ষের মধ্যে প্রেম প্রীতির ভাব গড়ে উঠতে লাগলো।
সমভূমি হতে কখনো কখনো কিছু কিছু বেকার এবং আধা বেকার যুবক তাদের ভাগ্যোন্নতির জন্য আশীর্বাদ লাভের আশায় স্বামীজীর নিকট আসতো। স্বামীজী ছাড়া তখনও পর্যন্ত আশ্রমে কোনো স্থায়ী বাসিন্দা ছিল না ।
আর এক পক্ষ কাল পরে মুকোটি উৎসব হওয়ার কথা ! একদিন স্বামীজী মন্দিরে পুজো করছেন _এমন সময় কুটিরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, কুটিরের পিছনে একটি সাত/আট বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে আছে ! কেমন করে এবং কোন দিক দিয়ে ছেলেটি সেখানে এলো _তা তিনি বুঝতে পারলেন না ! যাইহোক, তিনি চোখ বুজে পুজো করতে লাগলেন। পূজো সেরে স্বামীজি চোখ খুললেন । চোখ খুলে দেখলেন ছেলেটি তখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে ! যতই তিনি ছেলেটিকে দেখতে লাগলেন, ততই তার রূপে তিনি মুগ্ধ হোতে লাগলেন ! ছেলেটির মাথায় মুকুট ! সূর্যালোকে এই মুকুট তার চোখ ঝলসে দিতে লাগলো ! মুকুটে যে ময়ূর পাখাটি ছিল _তা মৃদু বাতাসে আন্দোলিত হচ্ছিলো। এই চোখ ঝলসানো আলোয় মুকুটের রত্নের দিকে তাকানো তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে যাচ্ছিলো!
ছেলেটির হাতে ছিল বাঁশি ! ত্রিভঙ্গ হয়ে দণ্ডায়মান ! পরনে হলদে রঙের কাপড় ! মনমাতানো সৌন্দর্য ! এ নিশ্চয়ই বৃন্দাবনের নন্দকিশোর ছাড়া আর কেউ নন !
স্বামীজি দ্রুতবেগে এই দেবসন্তানের দিকে এগিয়ে গেলেন কিন্তু ছেলেটি অদৃশ্য হয়ে গেল !
গোবর্ধন গিরির গোবিন্দকে আর দেখা গেল না ! সেই গোবিন্দ-গোপাল খুব দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল ! কিন্তু স্বামীজীর মনে হলো চারিদিকে যেন “গোবিন্দ-গোপাল” শব্দের প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো ! সেই মুহূর্তে হোতে স্বামীজীর শরীরের ভিতর থেকে “গোবিন্দ-গোপাল” শব্দ বেরিয়ে আসতে লাগলো। এরপর থেকে তিনি প্রায়ই গোবিন্দ-গোপাল ভাবে বিভোর হয়ে থাকতেন । এই ভাব তাঁর মনকে একেবারে গ্রাস করে ফেললো। স্বামীজী যখন নিত্য পূজার্চনায় নিমগ্ন থাকতেন _তখন‌ও এই শব্দ তার ভিতর থেকেই আসতো।
এক পক্ষকাল অতিক্রান্ত হোল !এই ভাব তাঁর মধ্যে আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠলো ! মুকোটি উৎসব উপলক্ষে ভক্তেরা আসতে লাগলো । কিন্তু স্বামীজী গোবিন্দ-গোপাল ভাবে তন্ময় হয়ে ছিলেন।
ভর রামচন্দ্রপুরম থেকে ‘শ্রদ্ধা’ (এক ভক্তের নাম )এসেছে ! পূর্বে সে ‘গোপাল’ বলে একটি ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতো। স্বামীজী ছেলেটিকে খুব‌ই ভালবাসতেন। স্বামীজীর “গোবিন্দ-গোপাল” ভাব, ঐ গোপালের দিকে মোড় নিল । তিনি আশা করতে লাগলেন যে উৎসবের সময় ‘শ্রদ্ধা’ ছেলেটিকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবে । তিনি সাগ্রহে তাদের আগমনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন ‌ কিন্তু ছেলেটি এলো না । শ্রদ্ধা এসে জানালো ছেলেটি পঙ্গু হয়ে পড়ে আছে। স্বামীজি বিমর্ষ হয়ে পড়লেন ।ছেলেটির শারীরিক অসুস্থতা এবং আশ্রমে তার অনুপস্থিতি প্রেমিক পিতাকে যেন অশান্ত করে তুললো।।
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
……………………………………………………………….
[কোন একসময় ভক্তেরা বিভিন্ন তীর্থ ভ্রমণ করতে গিয়ে প্রতিটি জায়গায় স্বামীজীর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি টের পেলেন এবং সেই তীর্থস্থানগুলির মূর্তি দর্শন ভালোভাবেই করতে পারলেন এবং তৃপ্ত হলেন৷ কিন্তু তীর্থ ভ্রমণের সময় তারা সকলেই স্বামীজীর সাক্ষাৎ দর্শন পাওয়া সত্ত্বেও তাদের মনে কিন্তু দর্শন সম্বন্ধে বিশ্বাস ও সংশয়ের দ্বন্দ্ব চলতে লাগলো। তাহলে কি বিভিন্ন স্থানের ক্ষেত্রনাথ এবং আমাদের হৃদয়ের গুরুনাথ (স্বামী বাউলানন্দ)-এর সঙ্গে কি কোনো পার্থক্য নেই ?? এমনতর দর্শনের ব্যাপারে স্বামীজীকে জানালে স্বামীজি বলতে লাগলেন –]
এর আগে এই বিষয় নিয়ে অনেকবার বলেছি। তোমরা জানো সর্বেসর্বা সর্বত্রই বিরাজ করছেন। এমন কোন স্থান নাই যেখানে সর্বেসর্বা ঈশ্বর অনুপস্থিত। ঈশ্বর কি ? তিনি হলেন অখণ্ড প্রেম এবং কৃপা। ওরা যে সমস্ত স্থান পরিদর্শন করেছে তাদের সবগুলিই কৃপা এবং প্রেমে পরিপূর্ণ। ভক্তের মধ্যে ভক্তি এবং বিশ্বাসের গভীরতার উপর নির্ভর করে ‘কৃপা’। ভক্তকে তৃপ্ত করার জন্য ঈশ্বর তার ঈপ্সিত মূর্তি ধারণ করে ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন। এ বিষয়ে দুটো দিক লক্ষ্য করার আছে :- ভক্ত যেখানেই যায় সেখানেই গুরু তার সঙ্গে থাকেন এবং প্রয়োজনে তাকে সাহায্য করেন। পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, সাগর-মহাসাগর, অট্টালিকা এবং এর দেওয়াল—প্রভৃতি কোন ভৌগােলিক প্রতিবন্ধকতা কৃপার প্রবাহকে কোন বাধা দিতে পারে না। কৃপা অসীম এবং সমস্ত প্রতিবন্ধকের ঊর্ধ্বে —সর্বব্যাপী। ভক্তের দৃঢ় ভক্তি এবং বিশ্বাসে কৃপা প্রতিমূর্ত হয়ে ওঠে এবং ভক্তের ইষ্টের রূপ নিয়ে ভক্তকে রক্ষা করেন । শক্তি, সামর্থ্য এবং গুণগত দিক দিয়ে বিচার করলে কৃপা একই। ঈশ্বরের কৃপা এবং গুরুর কৃপার মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। ঈশ্বরের কৃপা গুরুর মাধ্যমে প্রকাশিত হলে তা গুরুর কৃপা বলে গণ্য হয়।
ভক্ত তার দৃঢ় বিশ্বাসের বলে তার নিজের মধ্যে কৃপা-দুর্গ গড়ে তােলে। কখন কখন ভক্তের অজ্ঞাতসারেই কৃপা মূর্তিধারণ করে এবং তাকে রক্ষা করে। ওয়াডিগুডেম মন্দিরে ‘নরসীমা’ মূর্ত হয়ে আমাকে রক্ষা করেছিলেন । আমাকে রক্ষা করার জন্য আমি তাঁকে প্রার্থনা জানাই নি। কৃপা সর্বদর্শী এবং চৈতন্যময়। এই আশ্রমে ব্ল্যাক ম্যাজিকে স্বামী যে অশুভ শক্তি প্রয়ােগ করেছিল তা দূর করার জন্য কৃপা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে মূর্ত হয়েছিল। দত্তাত্রেয় এবং আল্লির রূপ নিয়ে মা জগদম্বা স্বেচ্ছায় আবির্ভূত হয়ে অশুভ শক্তি হতে আমাকে রক্ষা করেছিলেন। কোন্ মূর্তিতে কৃপা আবির্ভূত হল সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, যা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ—তা হল ‘কৃপা’-র প্রকাশ।”