স্বামী বাউলানন্দজীর পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন সময়ের কথা বলা হচ্ছিলো। স্বামীজীর তখন “গোপাল” দর্শনের পর “গোবিন্দ-গোপাল” ভাব চলছিল।
“মুকোঠি উৎসব” নির্বিঘ্নে উদযাপিত হোল। ভক্তেরা যে যার বাড়ি ফিরে গেল । আরও চার মাস ধরে স্বামীজীর মনে গোবিন্দ-গোপাল ভাব চলতে থাকলো।
একদিন বিজয়ওয়াড়া থেকে এক ভক্ত, তার স্ত্রী এবং পুত্রকে সঙ্গে করে আশ্রমে এলো । তারা কয়েক দিন থাকলো । লোকটির পেশা ছিল চিত্রাংকন । এই ব্যবসায় তার পর্যাপ্ত অর্থ উপার্জন হচ্ছিলো না _অন্যত্র গিয়ে সে তার ভাগ্য পরীক্ষা করতে চাইছিল । তাই তার ছেলেটিকে কয়েকদিন আশ্রমে রাখার জন্য ওই ভক্ত স্বামীজীকে অনুরোধ কোরলো । কয়েক দিন পরে এসে সে ছেলেটিকে নিয়ে যাবে _সেই কথা বললো। ছেলেটিও আশ্রমে থাকার জন্য খুবই আগ্রহী ছিল । স্বামীজীর উপর ছেলেটির ভার দিয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনই চলে গেল ।
ছেলেটির নাম গোবিন্দ শুনে স্বামীজী উল্লসিত হলেন । “গোবিন্দ-গোপাল” বলতে বলতে স্বামীজী তাকে দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গন করলেন । ছেলেটি এরপরে আট মাস যাবত আশ্রমে রইলো।
ছেলেটির কয়েকটা অদ্ভুত গুন ছিল । ঘরের ভিতরে কয়েক মিনিট কোন দেব-দেবীর ফটোর সামনে দাঁড়িয়ে থেকে ঘরের বাইরে আসত এবং ওই দেবদেবীর মহিমা কবিতা-আকারে আবৃত্তি করতো বা সংগীত-আকারে গাইতে পারতো। সে নিজেই নাটকের রূপে ওইসব দেব-দেবীর মহিমা পুনরাবৃত্তি করতো। কন্ঠস্বর পাল্টিয়ে বিভিন্ন ভূমিকায় সে অভিনয় কোরতো। পুরাণের গল্পগুলিকেও সে স্বামীজীর সামনে অভিনয় করে দেখাতো । সংলাপ যত বড় বা কঠিন‌ই হোক না কেন ___ভাষা বা অভিনয়ের দিক থেকে তার কোনো ত্রুটি ছিল না
! স্বামীজী ওর আচরণে মোটেই বিরক্ত হোতেন না ! ছেলেটি গল্পগুলি পুনরাবৃত্তি করতে কোনরূপ ক্লান্তি বোধ করতো না । কিন্তু কোনো কুটিল লোক দেখার সঙ্গে সঙ্গে সে এই অভিনয় বন্ধ করে দিতো। সে এই কবিতা, গান এবং সংলাপ কারো নিকট শিক্ষা লাভ করে নাই! বস্তুত সে কোনোদিন স্কুলেই যায় নাই ! কেবল আশ্রমেই কিছু পাঠ শিখেছিল। ছেলেটির গান এবং আচার-আচরণ স্বামীজীকে খুবই আকৃষ্ট করেছিল ।
ছেলেটির আট মাস অবস্থান স্বামীজীকে তার গোবিন্দ -গোপাল ভাবকে পুষ্ট করতে সাহায্য করেছিল । প্রকৃতপক্ষে ছেলেটির মধ্যে তিনি গোবিন্দ-গোপালকেই দেখতে পেতেন ! তার কথাবার্তা, গান, কাজকর্ম প্রভৃতি যা কিছু সে কোরতো __সে সবের মধ্যে দিয়ে বালক গোপাল গোপালের লীলাই যেন তাঁর চোখে প্রকাশ পেত । আট মাস ধরে স্বামীজী সেই দেবসন্তান গোপালের যেন সঙ্গ পাচ্ছিলেন । তার সঙ্গ পেয়ে স্বামীজী এক স্বর্গীয় ভাবাবেশে ছিলেন!
ছেলেটি আশ্রমে লেখাপড়া শিখছিল । তার শরীর_স্বাস্থ্য‌ও ভালোই ছিল । আধ্যাত্মিক সঙ্গ পেয়ে সুখেই তার দিনগুলি কাটছিল । কিন্তু একদিন তার বাবা-মা এসে তাকে নিয়ে যেতে চাইলো। ছেলেটিকে বিদায় দিতে স্বামীজীর ইচ্ছা ছিল না, বাবা-মাকেও ছেলেটিকে নিয়ে যাবার ব্যাপারে নিয়ে যাবার ব্যাপারে আগ্রহী বলে মনে হলো না ! কিন্তু তাদের সঙ্গে একজন যোগিনী এসেছিল, সে জিদ করে ছেলেটিকে নিয়ে চলে গেল ! স্বামীজী বুঝতে পারলেন ছেলেটির বাবা মা তাকে যোগিনীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে।
যোগিনীর মৃত্যুর পর ছেলেটি 1965 খ্রিস্টাব্দে পুনরায় আশ্রম এসেছিল। কিন্তু তখন সে তার সমস্ত আকর্ষণ, সৌন্দর্য এবং ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে! স্বামীজী তাকে বাগানে কাজ করতে বললেন! কয়েক মাস কাজ করার পর সে পেরেন্টাপল্লী আশ্রম ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
………………………………………………………………..
জিজ্ঞাসা :– ঈশ্বরের এত নামরূপ কেন ?
মীমাংসা :– “ঈশ্বর, বিশ্ব-সত্তা, বিভিন্ন ধরণের জীব, মানুষ–সবই ঈশ্বরের নাম। উদ্ভিদ শরীর, অমানবিক শরীর, মানবিক শরীর সবই তাঁর রূপ। এইরূপ, বিশ্বসত্তারও একটা রূপ আছে। তা হল বিশ্ব-সত্তা নামটি ‘কোন একটা কিছু’র প্রতিরূপ এবং ‘কোন একটা কিছু’ই হচ্ছে ঈশ্বর। শুধুমাত্র জীবই ঈশ্বরের প্রতিরূপ নয়। প্রত্যেকটি জিনিস, বালুকণা, পাথর, জলকণা, শুকনাে গাছ –শবদেহ, অগ্নি, অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, মেঘ অর্থাৎ যা দেখা যায়, স্পর্শ করা যায়, অনুভব করা যায়–সমস্তই ঈশ্বরের প্রতিরূপ ।
সমস্ত কিছু বিশ্বের মধ্যেই অবস্থান করছে । তারা নিজ নিজ আয়তন অনুযায়ী বিশ্বের একটা স্থান অধিকার করে রয়েছে । প্রত্যেক জিনিসের মধ্যেই আকাশ রয়েছে । বিশ্ব-সত্তার বৈশিষ্ট্য –প্রেম, জ্ঞান এবং শক্তি ঐ আকাশের মধ্যেই বর্তমান। অর্থাৎ বিশ্ব-সত্তাও ঐ আকাশের মধ্যে বিরাজ করছে। সুতরাং সমস্ত জিনিসের মধ্যে বিশ্ব-সত্তা এবং এর গুণ বর্তমান ।
জলকণা, বালুকণা, পাথর, অগ্নি প্রভৃতি এবং মানবসত্তা কর্তৃক অধিকৃত স্থান (space ) বিশ্ব-সত্তা এবং ঈশ্বরের গুণ প্রকাশ করে। আকার এবং আয়তনে জিনিসের মধ্যে ভিন্নতা দেখা যায়, কিন্তু তারা প্রত্যেকেই ঈশ্বরের প্রতিরূপ । দেশ, কাল ও পাত্র অনুসারে ঈশ্বরের প্রক’শ ভিন্ন হতে পারে । বস্তু বা জিনিসের মধ্যে ঈশ্বরের যে প্রকাশ তা মানুষের প্রচেষ্টার উপর নির্ভর করে । এমন কি মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশও মানুষের প্রচেষ্টার উপর নির্ভর করে। কারণ ঈশ্বরের প্রকাশ নির্ভর করে নিরন্তর ভালবাসা এবং প্রেমের গভীরতার উপর। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের প্রতি গভীর বিশ্বাস হতে আসে ঈশ্বরের উপর মানুষের নিরবচ্ছিন্ন ভালবাসা। সমস্ত বস্তু, অমানবিক শরীর প্রভৃতি সবই ঈশ্বরের প্রকাশ। কিন্তু এদের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশের তারতম্য থাকে ৷
ঈশ্বর সমস্ত কিছুর মধ্যে আছেন–এই বিশ্বাসের উপর নির্ভর করেই মন্দির, মসজিদ নির্মিত হয়েছে। ওখানে মানুষ ঈশ্বরের কৃপা পায়। কিরূপে তা সম্ভব সেটা আলােচনা করছি মন্দিরগুলিতে মাটি, কাঠ বা ধাতু নির্মিত বিশেষ কিছু জিনিস রয়েছে। ঐগুলিকে মূর্তি বা প্রতীক বলা যেতে পারে। যে নামেই ওগুলিকে চিহ্নিত করা হােক না কেন তারা নির্দিষ্ট স্থান (space ) অধিকার করে রয়েছে। ঐ স্থানগুলিতে ঈশ্বর রয়েছেন। যিনি ঐ সমস্ত জিনিসের মধ্যে রয়েছেন তিনি ওগুলির মধ্যে দিয়েই প্রকাশিত হচ্ছেন। সুতরাং ওগুলির মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের কৃপা প্রবাহিত হয়। (ক্রমশঃ)