স্বামী বাউলানন্দজীর পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন সময়ের কথা বলা হচ্ছিলো।
পেরেন্টাপল্লী গ্রামের অধিবাসীদের কোন্ডা রেড্ডি বলা হয় । অন্ধ্রপ্রদেশে যে সমস্ত উপজাতি বাস করে, তাদের মধ্যে এরাই হোলো আদি । এই গ্রামবাসীরা বিশেষ ভাগ্যবলে স্বামীজীকে সেবা করার অধিকার পেয়েছিল । তাঁর সেবা পাওয়ার ভাগ্য তাদের হয়েছিল । যে এলাকায় তারা বাস কোরতো _সেখানে সভ্যতার বিকাশ তখনও পর্যন্ত ঘটেনি । তখনও তারা তীর-ধনুক নিয়ে শিকার কোরতো । তারা তেলেগু ভাষায় কথা বলতো এবং ‘কোন্ডা’ দেবতার উপাসনা কোরতো । কৃষি ছিল তাদের প্রধান উপজীবিকা। কিন্তু যেহেতু তারা পার্বত্য এলাকায় বাস করতো, ফলে সেখানে কোনো সমতল জমি বা উর্বর জমি ছিল না । উপযুক্ত জমি থাকলেও __তাদের কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং উন্নত কৃষি কাজের দক্ষতাও ছিলনা ।
পর্বতের ঢালু অংশের নির্বাচিত স্থানে বন কেটে তারা পরিষ্কার করতো এবং কাটা গাছের গোড়া পুড়িয়ে দিয়ে সেখানে বীজ বপন কোরতো। বর্ষায় এই বীজ অঙ্কুরিত হোত । অধীর আগ্রহে তারা এই ফসল বেড়ে ওঠার অপেক্ষা কোরতো । ফল পাকতে শুরু করলেই তারা ফসল কাটতে শুরু করতো এবং পেটে খিদে নিয়ে তারা ফসল পুরোপুরি পাকা পর্যন্ত অনেক সময় অপেক্ষা করতেই পারতো না ।
এই ধরনের কৃষিকাজ প্রতিবছর স্থানান্তরিত হোতো এবং কৃষিকাজকে ওদের ভাষায় বলা হয় “পডু” ! কুন্ডা রেড্ডিরা ঐ পডু-চাষ‌ই জানতো, অন্য কোনো চাষের পদ্ধতি জানতোই না।
সারা বছরের জন্য পর্যাপ্ত শস্য তারা পেতোনা। আহার্য সংগ্রহের জন্য তাই তারা বনে কাজ করতো । পর্বতের ঢালু অংশে যে বন রয়েছে, সেই বনে গিয়ে তারা বাঁশ এবং অন্যান্য গাছ কাটতো। সেগুলি কাটার পর তারা নদীর ধারে নিয়ে আসতো এবং ওখানে যে ব্যবসায়ী থাকতো _তাকেই দিয়ে দিতো। ওই ব্যবসায়ীরা তাদের যে পারিশ্রমিক দিতো, তাই দিয়ে ওরা খাদ্য দ্রব্য ক্রয় করতো। কিন্তু তাতেও যথেষ্ট পরিমাণে খাবার ওদের জুটতো না । ক্ষুধার্ত অবস্থায় তারা বনে বনে কাজ করে বেড়াতো। এইজন্য দুর্বল শরীরে তারা ঠিকমতো কাজ করতেও পারতো না এবং ঠিক মত কাজ না করার ফলে তারা উপযুক্ত বেতন পেতোনা । এই ভাবে তারা সীমাহীন ভয়ানক এক আবর্তে ঘুরপাক খেতো।
প্রয়োজনে তারা নদীতে মাছ ধরতো, কাঁচা পাকা আম যা পেতো, তাই কুড়িয়ে নিয়ে খেতো। আমের আঁটির ভেতরের নরম অংশটা বার করে নিয়ে সেটা নদীর জলে ধুয়ে সেটাকে গুঁড়ো করে মন্ড তৈরি করা হোতো। তেতুলের কাঁই গুঁড়ো করে তা দিয়েও মণ্ড করা হোতো । এতোরকম ব্যবস্থা সত্ত্বেও তাদের সারাবছর পেট ভরে খাবার জুটতো না ।
কোন্ডা রেড্ডিরা জিলুগা গাছের উপর খুবই নির্ভরশীল ছিল। ছয় মাস ধরে এই গাছ থেকে তাড়ি পাওয়া যায় এই কল্পতরু গাছ হতে যতদিন তাড়ি পাওয়া যায় ততদিন তারা ওই গাছের নিচেই বাস কোরতো এবং তাড়ি খেয়ে জীবন ধারণ কোরতো। প্রত্যেক পরিবারের সকলেই গাছের নিচে বাস কোরতো_ যখনই তাদের খিদে পেতো, তখনই গাছে উঠে রসের হাঁড়ি নামিয়ে এনে রস পান করে পেট ভরাতো। গাছের নিচে শুয়েই রাত কাটাতো তারা।
কোন্ডা রেড্ডিরা নিজেদের মধ্যেই সমাজ তৈরি করে । তাদের সমাজপতি আছে । বিবাহ এবং অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানের খরচ এবং জরিমানার টাকা মেটানোর জন্য সহুকার (বণিকের)-এর নিকট তারা টাকা ধার করে । এই সহুকার তাদের টাকা ধার দেয় কিন্তু এই ধার শোধ করতে হয় কাজ করে অর্থাৎ বনের বাঁশ কেটে বা গাছ কেটে । বনে কাজ করে তারা যে মজুরি পায় তা দিয়ে সুদ সমেত ধারের টাকা শোধ করতে হয় । সমগ্র পরিবারকে ধার শোধ করার জন্য এবং আহার্যের জন্য কাজ করতে হয় । সারা গ্রামকেই ওই সহুকারের অধীনে কাজ করতে হয়। ঋণ শোধ না করে তারা কোথাও চলে যেতেও পারে না ।এই রুপে তারা চির বন্ধনে আবদ্ধ থাকে ওই বণিকের কাছে । বনিকের কাছেই তাদের হিসাব নিকাশ থাকে।রেড্ডিরা কোনো হিসাব জানে না । সুতরাং বনিকের মর্জি মতোই হিসাব হয়। একবার ধার করলে সে হিসাব আর শোধ হয় না!!
*স্বামী বাউলানন্দজীর অধ্যাত্মিক আলোচনা*
………………………………………………………………..
(পরবর্তী অংশ) …মন্দির, মসজিদ, গির্জা প্রভৃতি স্থান একসময় ফাঁকা ছিল । ঈশ্বরের প্রতি মানুষের বিশ্বাস এবং ঈশ্বরত্ব বােধের পরিপ্রেক্ষিতেই ঈশ্বর পূজিত হচ্ছেন। ঐ সমস্ত ধর্মস্থানগুলিতে সর্বেসর্বা ঈশ্বর রয়েছেন। যে সমস্ত ব্যক্তি তাঁকে প্রার্থনা জানাচ্ছে, তাদের মধ্যেও ঈশ্বর বর্তমান । একই ঈশ্বর উভয়স্থানেই বিরাজমান। এই বােধ তীব্র হলে একত্ববােধ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে।
ভক্তরা ভক্তিভরে মন্দির-মসজিদে উপাসনা বা প্রার্থনা করলে মূর্তির মধ্যে ভালবাসা ঘনীভূত হয় ৷ যদি ভক্ত কোন কামনা-বাসনা পূরণের জন্য প্রার্থনা করে তাহলে মূর্তির মধ্যে যে শক্তি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে তা ভক্তের মধ্যে প্রকাশিত হয়ে তার মনােবাঞ্ছা পূরণ করে। এইরূপে প্রত্যেক মানুষই কৃপা পেতে পারে—তাতে তাদের ধারণা যথাযথ থাক বা না থাক ।
বাজারে কিছু পণ্য আছে । সেগুলি ভাল বা মন্দ হতে পারে । এগুলি কে উৎপাদন করেছে তা তােমার জানা থাকতেও পারে আবার নাও পারে। এদের উৎপত্তিস্থল তােমার জানা থাকতে পারে আবার নাও পারে। কিন্তু যেহেতু তুমি মূল্য দিয়েছ সেইহেতু তুমি ওগুলি পেয়েছ । সেইরূপ যদি তােমার কোন আকাঙ্ক্ষা থাকে এবং মন্দিরে গিয়ে ভক্তিভরে মন্দির-দেবতাকে প্রার্থনা জানাও তাহলে ঐ মূর্তি হতে তােমার উপর কৃপা বর্ষিত হবে এবং তােমার আকাঙক্ষা পূর্ণ হবে। যে মূল্য দিয়ে তুমি কৃপা পাচ্ছ তা হল তােমার ঐকান্তিকতা, শ্রদ্ধা এবং ভক্তি । কোন শূন্য স্থানে যেখানে মূতি নাই সেখানেও যদি তুমি প্রার্থনা জানাও তাহলেও তুমি ফল পাবে ।
যখন তুমি কোন মসজিদ, মন্দির বা গির্জায় বা কোন শূন্য স্থানে গিয়ে চোখ বন্ধ করে ঈশ্বর সম্বন্ধে চিন্তা করতে শুরু করছ তখন তােমার মধ্যে ঈশ্বর সম্বন্ধে পূর্ব হতে যে ধারণা আছে তা তুমি উপলব্ধি করতে পারবে । ঈশ্বরের যে মূর্তি তােমার মধ্যে রয়েছে তা মন্দিরের মুর্তি হতে আলাদা হতে পারে । যাইহােক তােমার মনে ঈশ্বরের যে রূপ রয়েছে তার মধ্য দিয়েই তােমার উপর কৃপা বর্ষিত হবে—মন্দিরের মূর্তির মধ্যে দিয়ে নয়। …… ভক্তির গভীরতা, শ্রদ্ধা, ঐকান্তিকতা একত্রিত হয়ে তােমার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ করবে।
অনেকে বলে মূর্তিপূজা ঠিক নয়।—এই ধারণা ভুল । মূর্তিপূজার প্রয়ােজনীয়তা আছে । ঈশ্বর সম্বন্ধে ভাব গভীর হলে মূর্তির মধ্যে তাঁর প্রকাশ হয় ।
জাগতিক ক্ষেত্রে দেহ এবং দেহীকে এক বলা হয়। দেহ হচ্ছে দেহীর প্রতিনিধি। একইরূপে ঈশ্বরকে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু মূর্তিটা তার প্রতিনিধিস্বরূপ। অশরীরী অবস্থায়, সূক্ষ্ম স্থিতিতে ব্যক্তির শরীর থাকে না। সেজন্য তাদের ক্ষেত্রে মন্দিরের বা মূর্তির প্রয়ােজনীয়তা নাই।”