স্বামী বাউলানন্দজীর পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন সময়ের কথা বলা হচ্ছিলো।(বণিকেরা কিভাবে রেড্ডিদেরকে শোষণ কোরতো __সেই সব কথা এখানে বলা হচ্ছিলো।)
রেড্ডিরা কিন্তু বণিককে চটাতে চাইতো না । তারা চাইতো বণিকের দয়া , যাতে দরকার পড়লেই তারা তার কাছ থেকে টাকা ধার পায় । যদি কখনো বণিক খুশি হয়ে এক টুকরো তামাকপাতা দিতো, তাহলেই তারা চির কৃতজ্ঞ থাকতো । কোন্ডা রেড্ডিদের অসহায় অবস্থা এবং কিস্তিতে ধার শোধ__ তাদেরকে চিরদাসত্বে পরিণত করে । পরিবারের সকলের কাজ এবং মজুরি দিয়েও ধার কখনো কমেনা ! প্রতিবছরই তা বেড়ে যায় । যদি ওই বণিক ওই এলাকায় তার ব্যবসা বন্ধ করে দেয়, তাহলে সে সমস্ত ঋণ তার উত্তরাধিকারীকে বিক্রি করে । সুতরাং রেড্ডিদের স্বাধীনতা অন্য লোকের কাছে বিকিয়ে যায়, তারা কখনোই মুক্ত হতে পারে না ।
বণিকরাই তাদের মজুরি ঠিক করে । মজুরকে তার কথাই মানতে হয় । সে দায়বদ্ধ মজুর, সুতরাং দরকষাকষি করার তার কোনো অধিকার নাই। বণিকরা যে মজুরি বেঁধে দেয়, তাও নগদে মেটায় না । শুকনো মাছ, চাল, পেঁয়াজ প্রভৃতি চড়াদামে তাদেরকে সরবরাহ করে। বণিকদের নিকট হোতেই রেড্ডিদের এইসব জিনিস কিনতে হয়।
নির্ধারিত মজুরি খুব অল্প । যদি 10 জন সদস্য বিশিষ্ট কোন পরিবার 1000 বাঁশ কেটে নদীর ধারে নিয়ে আসে, তাহলে ওই পরিবার কুড়ি টাকা পায়(এটা ১৯৫০/৫১ সালের কথা) । একশটা গাছ এক দিনে কাটা যেতে পারে, কিন্তু সে গুলোকে নদীর ধারে বয়ে আনতে 4/5 দিন লাগবে ! সুতরাং সপ্তাহে প্রতি সদস্যের মজুরি দাঁড়ায় দু-টাকা! এইভাবে রেড্ডিদের জীবন ধারণ করতে হোত।
বণিকদের অত্যাচার ছাড়াও রেড্ডিদের সরকারি কর্মচারীর অত্যাচারের সম্মুখীনও হতে হোত। যখন এইরূপ কোনো অত্যাচারী সরকারি কর্মচারী গ্রামে ক্যাম্প খাটাতো, তখন সমগ্র গ্রামকে তার সামনে হাজির হতে হোত। তিনি যে কাজ বলবেন তা বিনা মজুরিতে করে দিতে হোত। কর্মীরা খেয়েছে কি না খেয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কোন খোঁজ রাখতেন না । কোন উপজাতির দুগ্ধবতী গাভী থাকলে সেই কর্মচারীকে বিনা পয়সায় দুধ দিতে হোত । শাকসবজি হলে শাকসবজি দিতে হোত। যদি কেউ সারাদিন পরিশ্রম করে কয়েকটি মাছ ধরে তাহলে সেগুলোও সেই সরকারি কর্মচারীর ক্যাম্পে নিয়ে আসতে হোত। তাদের ঘরে কোনো মুরগি থাকলে তাও তাদেরকে কর্মচারীর রন্ধনশালায় পাঠিয়ে দিতে হোত।
উপজাতিদের শুধুই সরকারি কর্মচারী বা বণিককে উপহার দিতে হয় __কিন্তু বিনিময়ে তারা পায় না কিছু ! তারা শুধু অপরের সেবাই করে যায় । যে পারিশ্রমিক তারা পায় তা হোল প্রহার বা তিরস্কার । প্রতিবাদ হিসেবে তারা কিছুই বলতে পারেনা, ন্যায্য পাওনা চাইতে পারে না, তারা শুধু জানি পেটে মরে কাজ করতে । কোন্ডা রেড্ডিদের এই হোল অবস্থা ! তাদের এই অবস্থা দেখে স্বামীজীর চোখে জল এসে যায় !
তাদের কাজ করার ইচ্ছা আছে কিন্তু খাবার নাই । না খেয়ে কে কাজ করতে পারে ? ক্ষুধার্তকে কাজ করতে বাধ্য করানো আসুরিক কাজ নয় কি ? এই ভয়ানক আবর্তের মধ্যে ঘুরপাক কেমন করে বন্ধ করা যাবে ? কেইবা করবে এবং কখনই বা করবে ? এই আসুরিক কর্ম বন্ধ করার যে পদ্ধতি তার সূচনা হওয়া উচিত কিন্তু কে সূচনা করবে এবং কেমন করেই বা করবে? [ক্রমশঃ]
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
…………………………………………………………….
জিজ্ঞাসা :– “স্বামীজী, কথিত আছে পূর্বে মূর্তি পূজা ছিল না একথা কি ঠিক ?”
মীমাংসা :– “হ্যাঁ, একথা ঠিক । ধর্ম প্রবর্তনের পূর্বে কোন মূর্তিপূজা ছিল না। এমনকি ধর্ম প্রবর্তনের পরও বহুদিন যাবৎ মূর্তিপূজা হয়নি । কালের প্রবাহে মানুষ ঈশ্বরের ভাবময় রূপ দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল । তাদের অনুভূতি অক্ষরে রূপ নিল। আধ্যাত্মিকতার জন্য প্রতীক সৃষ্টি হল। আধ্যাত্মিক সূত্র বিধিবদ্ধ হওয়ার পর এবং অক্ষরের মাধ্যমে শব্দ প্রকাশিত হওয়ার পরও ঈশ্বরের জন্য কোন মন্দির ছিল না। পরে যখন এই ধর্মভাব নষ্ট হতে লাগল তখন এর সংস্কারের জন্য প্রচেষ্টা শুরু হল । আদি ধর্মভাবের সংস্কার করতে গিয়ে দ্বিতীয় ধর্মীয়ভাবের সৃষ্টি হল । তখন মন্দির নির্মাণ শুরু হল । আরও কিছুকাল পরে ধর্ম থেকে সম্প্রদায় এবং উপ-সম্প্রদায়েয় সৃষ্টি হল । এইভাবে বিভিন্ন মূর্তি নিয়ে বিভিন্ন মন্দির নির্মিত হয় । মন্দির, বিভিন্ন মূর্তি এবং ধর্মাচরণ প্রভৃতির উদ্দেশ্য হল–সামাজিক ঐক্য, শান্তি এবং ঊর্ধ্বপ্রগতির মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতা লাভ করা।
কিন্তু প্রথম থেকেই ধর্মের আচার-আচরণ পুরােপুরি আদর্শের বিপরীত হয়ে গেল । ফলে সারা পৃথিবীতে এগুলি তাদের অনুগামীদের আধ্যাত্মিকতা লাভে সহযােগিতা করছে না। অনুগামীরা দলগত স্বার্থে লিপ্ত হয়ে রয়েছে। তারা স্বার্থশূন্য হচ্ছে না। প্রত্যেক ধর্ম সম্প্রদায় এমন আচরণ করছে যেন তাদের ধর্মাচরণগুলিই পৃথিবীর একমাত্র ধর্ম। এরফলে প্রভাবশালী ধর্মসম্প্রদায়গুলি তাদের বিরােধী দলের বা সম্প্রদায়কে নিন্দা করে তাদেরকে দাবিয়ে রাখছে । এমন কি, যে সমস্ত ধর্ম সম্প্রদায় আদর্শে পৌঁছিয়ে আধ্যাত্মিকতা লাভ করেছে তারাও ওদের নিন্দা করে দাবিয়ে রাখছে।
ছােট শিশু যখন হাঁটতে শেখে তখন তার পিতা-মাতা তাকে তিন চাকার গাড়ী কিনে দেয় । সে গাড়ী চালায়। কিন্তু যখন সে হাঁটতে পারে তখন সে আর ঐ গাড়ী ব্যবহার করে না। ঠিক একইভাবে ধর্মের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে আধ্যাত্মিকতা লাভে সহায়তা করা। হাঁটতে শিখেছে এমন শিশুকে তিন চাকার সাইকেল চালাতে বাধ্য করার মত ধর্মসম্প্রদায়গুলি যে সমস্ত মানুষ আধ্যাত্মিকতার পথে উন্নত হয়েছে তাদেরকে দাবিয়ে রাখছে।
এর ফলে ধর্মগুলি মানুষের অগ্রগতির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্মে লিপ্ত থেকে তারা আজ অমানবীয় প্রবণতার দিকে ঝুঁকছে এবং কু-অভ্যাসে রত হয়ে অমানুষিক আচার-আচরণ করছে। মানুষ যে অগ্রগতি লাভ করছে তা বাহ্যিক এবং একেই চরম সার্থকতা বলে সমাজে প্রতিষ্ঠা করছে। এটাই চরম আদর্শ বলে পরিগণিত হচ্ছে ৷ ধর্মসম্প্রদায়গুলির সংস্কার করতে গিয়ে নূতন ধর্মসম্প্রদায়ের সৃষ্টি হচ্ছে । কিন্তু তারাও পরস্পর বিরােধী ।
‘আমাদের ধর্মই মহান এবং ব্যাপকভাবে সমর্থিত, জগতের সমস্ত লােকের উচিত আমাদের ধর্ম গ্রহণ করা, ঈশ্বর অদ্বিতীয়—এই সিদ্ধান্ত আমাদের ধর্মই দিচ্ছে।’– কোন একটি ধর্ম সম্প্রদায় এই অভিমত পােষণ করে । কোন ধর্মসম্প্রদায় আবার উপরের সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিজের আরো কিছু কথা যােগ করে বলছে–‘এই ধর্ম যেমন ঈশ্বরকে উপাসনা করছে, এইভাবেই উপাসনা কর । অন্য ধর্ম-প্রদর্শিত পথে চললে নরকে যেতে হবে।’
তৃতীয় এক ধর্ম সম্প্রদায় বলছে—’আমাদের প্রদর্শিত পথে যদি ঈশ্বরকে উপাসনা না কর তাহলে আমাদের সম্মুখ হতে সরে যাও।’
ট্রেনে-বাসে এমনকি শ্মশানে তােমাকে তােমার কোন্ জাতি বলতে হচ্ছে । মন্দিরে মূর্তি দর্শন করতে গিয়ে যদি তোমার পোশাক দেখে তোমার ধর্ম বুঝতে না পারা যায় তাহলে তােমার কোন্ ধর্ম তা বলতে হবে। পৃথিবীতে ধর্মসম্প্রদায়গুলির এই হাল । কতকগুলি স্বার্থান্বেষী এবং সুযোগ-সন্ধানী লােকের জন্য ধর্মের আজ এই হাল দাঁড়িয়েছে । সকল ধর্মের একই প্রবণতা । কতকগুলি ধর্ম খুবই প্রাচীন কিন্তু তারা সংখ্যালঘু । সেজন্য তারা গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম বলে গণ্য হচ্ছে না । কোন ধর্মপুস্তকে বেশ আধ্যাত্মিকতা রয়েছে। কিন্তু যেহেতু তাদের সংখ্যাধিক্য নাই সেইহেতু এ ধর্মও অতি নগণ্য। [ক্রমশঃ]
রেড্ডিরা কিন্তু বণিককে চটাতে চাইতো না । তারা চাইতো বণিকের দয়া , যাতে দরকার পড়লেই তারা তার কাছ থেকে টাকা ধার পায় । যদি কখনো বণিক খুশি হয়ে এক টুকরো তামাকপাতা দিতো, তাহলেই তারা চির কৃতজ্ঞ থাকতো । কোন্ডা রেড্ডিদের অসহায় অবস্থা এবং কিস্তিতে ধার শোধ__ তাদেরকে চিরদাসত্বে পরিণত করে । পরিবারের সকলের কাজ এবং মজুরি দিয়েও ধার কখনো কমেনা ! প্রতিবছরই তা বেড়ে যায় । যদি ওই বণিক ওই এলাকায় তার ব্যবসা বন্ধ করে দেয়, তাহলে সে সমস্ত ঋণ তার উত্তরাধিকারীকে বিক্রি করে । সুতরাং রেড্ডিদের স্বাধীনতা অন্য লোকের কাছে বিকিয়ে যায়, তারা কখনোই মুক্ত হতে পারে না ।
বণিকরাই তাদের মজুরি ঠিক করে । মজুরকে তার কথাই মানতে হয় । সে দায়বদ্ধ মজুর, সুতরাং দরকষাকষি করার তার কোনো অধিকার নাই। বণিকরা যে মজুরি বেঁধে দেয়, তাও নগদে মেটায় না । শুকনো মাছ, চাল, পেঁয়াজ প্রভৃতি চড়াদামে তাদেরকে সরবরাহ করে। বণিকদের নিকট হোতেই রেড্ডিদের এইসব জিনিস কিনতে হয়।
নির্ধারিত মজুরি খুব অল্প । যদি 10 জন সদস্য বিশিষ্ট কোন পরিবার 1000 বাঁশ কেটে নদীর ধারে নিয়ে আসে, তাহলে ওই পরিবার কুড়ি টাকা পায়(এটা ১৯৫০/৫১ সালের কথা) । একশটা গাছ এক দিনে কাটা যেতে পারে, কিন্তু সে গুলোকে নদীর ধারে বয়ে আনতে 4/5 দিন লাগবে ! সুতরাং সপ্তাহে প্রতি সদস্যের মজুরি দাঁড়ায় দু-টাকা! এইভাবে রেড্ডিদের জীবন ধারণ করতে হোত।
বণিকদের অত্যাচার ছাড়াও রেড্ডিদের সরকারি কর্মচারীর অত্যাচারের সম্মুখীনও হতে হোত। যখন এইরূপ কোনো অত্যাচারী সরকারি কর্মচারী গ্রামে ক্যাম্প খাটাতো, তখন সমগ্র গ্রামকে তার সামনে হাজির হতে হোত। তিনি যে কাজ বলবেন তা বিনা মজুরিতে করে দিতে হোত। কর্মীরা খেয়েছে কি না খেয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কোন খোঁজ রাখতেন না । কোন উপজাতির দুগ্ধবতী গাভী থাকলে সেই কর্মচারীকে বিনা পয়সায় দুধ দিতে হোত । শাকসবজি হলে শাকসবজি দিতে হোত। যদি কেউ সারাদিন পরিশ্রম করে কয়েকটি মাছ ধরে তাহলে সেগুলোও সেই সরকারি কর্মচারীর ক্যাম্পে নিয়ে আসতে হোত। তাদের ঘরে কোনো মুরগি থাকলে তাও তাদেরকে কর্মচারীর রন্ধনশালায় পাঠিয়ে দিতে হোত।
উপজাতিদের শুধুই সরকারি কর্মচারী বা বণিককে উপহার দিতে হয় __কিন্তু বিনিময়ে তারা পায় না কিছু ! তারা শুধু অপরের সেবাই করে যায় । যে পারিশ্রমিক তারা পায় তা হোল প্রহার বা তিরস্কার । প্রতিবাদ হিসেবে তারা কিছুই বলতে পারেনা, ন্যায্য পাওনা চাইতে পারে না, তারা শুধু জানি পেটে মরে কাজ করতে । কোন্ডা রেড্ডিদের এই হোল অবস্থা ! তাদের এই অবস্থা দেখে স্বামীজীর চোখে জল এসে যায় !
তাদের কাজ করার ইচ্ছা আছে কিন্তু খাবার নাই । না খেয়ে কে কাজ করতে পারে ? ক্ষুধার্তকে কাজ করতে বাধ্য করানো আসুরিক কাজ নয় কি ? এই ভয়ানক আবর্তের মধ্যে ঘুরপাক কেমন করে বন্ধ করা যাবে ? কেইবা করবে এবং কখনই বা করবে ? এই আসুরিক কর্ম বন্ধ করার যে পদ্ধতি তার সূচনা হওয়া উচিত কিন্তু কে সূচনা করবে এবং কেমন করেই বা করবে? [ক্রমশঃ]
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
…………………………………………………………….
জিজ্ঞাসা :– “স্বামীজী, কথিত আছে পূর্বে মূর্তি পূজা ছিল না একথা কি ঠিক ?”
মীমাংসা :– “হ্যাঁ, একথা ঠিক । ধর্ম প্রবর্তনের পূর্বে কোন মূর্তিপূজা ছিল না। এমনকি ধর্ম প্রবর্তনের পরও বহুদিন যাবৎ মূর্তিপূজা হয়নি । কালের প্রবাহে মানুষ ঈশ্বরের ভাবময় রূপ দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল । তাদের অনুভূতি অক্ষরে রূপ নিল। আধ্যাত্মিকতার জন্য প্রতীক সৃষ্টি হল। আধ্যাত্মিক সূত্র বিধিবদ্ধ হওয়ার পর এবং অক্ষরের মাধ্যমে শব্দ প্রকাশিত হওয়ার পরও ঈশ্বরের জন্য কোন মন্দির ছিল না। পরে যখন এই ধর্মভাব নষ্ট হতে লাগল তখন এর সংস্কারের জন্য প্রচেষ্টা শুরু হল । আদি ধর্মভাবের সংস্কার করতে গিয়ে দ্বিতীয় ধর্মীয়ভাবের সৃষ্টি হল । তখন মন্দির নির্মাণ শুরু হল । আরও কিছুকাল পরে ধর্ম থেকে সম্প্রদায় এবং উপ-সম্প্রদায়েয় সৃষ্টি হল । এইভাবে বিভিন্ন মূর্তি নিয়ে বিভিন্ন মন্দির নির্মিত হয় । মন্দির, বিভিন্ন মূর্তি এবং ধর্মাচরণ প্রভৃতির উদ্দেশ্য হল–সামাজিক ঐক্য, শান্তি এবং ঊর্ধ্বপ্রগতির মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতা লাভ করা।
কিন্তু প্রথম থেকেই ধর্মের আচার-আচরণ পুরােপুরি আদর্শের বিপরীত হয়ে গেল । ফলে সারা পৃথিবীতে এগুলি তাদের অনুগামীদের আধ্যাত্মিকতা লাভে সহযােগিতা করছে না। অনুগামীরা দলগত স্বার্থে লিপ্ত হয়ে রয়েছে। তারা স্বার্থশূন্য হচ্ছে না। প্রত্যেক ধর্ম সম্প্রদায় এমন আচরণ করছে যেন তাদের ধর্মাচরণগুলিই পৃথিবীর একমাত্র ধর্ম। এরফলে প্রভাবশালী ধর্মসম্প্রদায়গুলি তাদের বিরােধী দলের বা সম্প্রদায়কে নিন্দা করে তাদেরকে দাবিয়ে রাখছে । এমন কি, যে সমস্ত ধর্ম সম্প্রদায় আদর্শে পৌঁছিয়ে আধ্যাত্মিকতা লাভ করেছে তারাও ওদের নিন্দা করে দাবিয়ে রাখছে।
ছােট শিশু যখন হাঁটতে শেখে তখন তার পিতা-মাতা তাকে তিন চাকার গাড়ী কিনে দেয় । সে গাড়ী চালায়। কিন্তু যখন সে হাঁটতে পারে তখন সে আর ঐ গাড়ী ব্যবহার করে না। ঠিক একইভাবে ধর্মের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে আধ্যাত্মিকতা লাভে সহায়তা করা। হাঁটতে শিখেছে এমন শিশুকে তিন চাকার সাইকেল চালাতে বাধ্য করার মত ধর্মসম্প্রদায়গুলি যে সমস্ত মানুষ আধ্যাত্মিকতার পথে উন্নত হয়েছে তাদেরকে দাবিয়ে রাখছে।
এর ফলে ধর্মগুলি মানুষের অগ্রগতির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্মে লিপ্ত থেকে তারা আজ অমানবীয় প্রবণতার দিকে ঝুঁকছে এবং কু-অভ্যাসে রত হয়ে অমানুষিক আচার-আচরণ করছে। মানুষ যে অগ্রগতি লাভ করছে তা বাহ্যিক এবং একেই চরম সার্থকতা বলে সমাজে প্রতিষ্ঠা করছে। এটাই চরম আদর্শ বলে পরিগণিত হচ্ছে ৷ ধর্মসম্প্রদায়গুলির সংস্কার করতে গিয়ে নূতন ধর্মসম্প্রদায়ের সৃষ্টি হচ্ছে । কিন্তু তারাও পরস্পর বিরােধী ।
‘আমাদের ধর্মই মহান এবং ব্যাপকভাবে সমর্থিত, জগতের সমস্ত লােকের উচিত আমাদের ধর্ম গ্রহণ করা, ঈশ্বর অদ্বিতীয়—এই সিদ্ধান্ত আমাদের ধর্মই দিচ্ছে।’– কোন একটি ধর্ম সম্প্রদায় এই অভিমত পােষণ করে । কোন ধর্মসম্প্রদায় আবার উপরের সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিজের আরো কিছু কথা যােগ করে বলছে–‘এই ধর্ম যেমন ঈশ্বরকে উপাসনা করছে, এইভাবেই উপাসনা কর । অন্য ধর্ম-প্রদর্শিত পথে চললে নরকে যেতে হবে।’
তৃতীয় এক ধর্ম সম্প্রদায় বলছে—’আমাদের প্রদর্শিত পথে যদি ঈশ্বরকে উপাসনা না কর তাহলে আমাদের সম্মুখ হতে সরে যাও।’
ট্রেনে-বাসে এমনকি শ্মশানে তােমাকে তােমার কোন্ জাতি বলতে হচ্ছে । মন্দিরে মূর্তি দর্শন করতে গিয়ে যদি তোমার পোশাক দেখে তোমার ধর্ম বুঝতে না পারা যায় তাহলে তােমার কোন্ ধর্ম তা বলতে হবে। পৃথিবীতে ধর্মসম্প্রদায়গুলির এই হাল । কতকগুলি স্বার্থান্বেষী এবং সুযোগ-সন্ধানী লােকের জন্য ধর্মের আজ এই হাল দাঁড়িয়েছে । সকল ধর্মের একই প্রবণতা । কতকগুলি ধর্ম খুবই প্রাচীন কিন্তু তারা সংখ্যালঘু । সেজন্য তারা গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম বলে গণ্য হচ্ছে না । কোন ধর্মপুস্তকে বেশ আধ্যাত্মিকতা রয়েছে। কিন্তু যেহেতু তাদের সংখ্যাধিক্য নাই সেইহেতু এ ধর্মও অতি নগণ্য। [ক্রমশঃ]
