স্বামী বাউলানন্দজীর পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন সময়ের কথা বলা হচ্ছিলো। সেই সময় স্বামী বাউলানন্দজী সহুকার বা বণিকের অত্যাচার হোতে ওখানকার আদিম অধিবাসীদের রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন।
“মুকুঠি উৎসবে” সহুকার বা বণিক যেরূপ অপমানিত হয়েছিল, তার কথা সে ভুলতে পারে নাই। তার শারীরিক ক্ষত শুকিয়ে গেলো কিন্তু তার আত্মসম্মানে যে আঘাত লেগেছিল, তার উপশম হোলো না ।
‘অর্ধ উপবাসী স্বামীজীর গায়ে কি শক্তি! আমার এই বিশাল দেহটা অনায়াসে তুলে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন ! স্বামীজীর শান্তি এবং অহিংসার কথা বলা উচিত ছিল কিন্তু হঠাৎ তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন ! আমার ভাগ্য ভালো যে শুকনো পাতার গাদায় পড়েছিলাম ! যদি পাথরের উপর পড়তাম তাহলে আমার মাথা ফেটে যেত!’__ সহুকার এইরূপ ভাবতে লাগলো !
তাছাড়া সে রেড্ডি উপজাতিদের সামনে অপদস্ত হয়েছিল, ‘রেগে গিয়ে চোখ রাঙালে এই রেড্ডিরাই তাকে সাধারণত ভয় পায় ! স্বামীজীর মান পর্বতশিখরে উঠলো, যেখানে তার আত্মসম্মান গভীর উপত্যকায় ঢুকে গেল ! অতঃপর তারা আর তার কথা গ্রাহ্য নাও করতে পারে ! কিন্তু কোথায় যাবে ? কিই বা করবে ? তার কাছে হিসাবের খাতা আছে না? যতদিন হিসাবের খাতা তার কাছে থাকবে, ততদিন এই সমস্ত লোক তার শাসনে থাকতে বাধ্য! কোনো দেবতা তাদেরকে রক্ষা করতে পারবেনা! আশ্চর্যের বিষয় হোল যে, এই হতভাগ্য অকৃতজ্ঞদের কেউ_ তার হয়ে স্বামীজীর বিরুদ্ধে দাঁড়ালো না ! যে লোকগুলো তার সঙ্গে এসেছিল, তারাও কিছু করতে পারলো না ! তারা তার পয়সা খাচ্ছে এবং দিনে দিনে অকৃতজ্ঞ হচ্ছে!’__ সময় পেলে তাদের প্রত্যেককে শিক্ষা দেওয়া উচিত __সহুকারের এ রকমই সব চিন্তা হোতে লাগলো!
মানসম্মান বজায় রাখতে হোলে একজন রেড্ডিও যাতে স্বামীজীর কাছে যেতে না পারে_ সেদিকে নজর রাখতে হবে! সে যে কি,__ তা স্বামীজীকে দেখাবে এবং শীঘ্রই স্বামীজীকে তার পায়ে ধরে ক্ষমা চাওয়া করাবে ! তাঁর (স্বামীজীর) কি ক্ষমতা? আর কিসের ভরসাতেই বা তিনি লাফাচ্ছেন ? ঐ রেড্ডিগুলোকেই উত্তেজিত করে তার পিছনে সে লাগাবে ! পুনঃ পুনঃ এই ভাবে চিন্তা করে সে ভাবলো যে, স্বামীজীর আশ্রমের অবস্থান‌ই তার আত্মসম্মানের পক্ষে আঘাতস্বরূপ ! সে প্রতিশোধ নিতে চাইলো এবং দৃঢ় সংকল্প কোরলো,কারণ প্রতিশোধ নেওয়া ছাড়া সে মাথা তুলে চলাফেরা করতে পারবে না !
লোকে সাধারণত তাদের গণ্ডির মধ্যে পরিস্থিতি বিচার বিবেচনা করে । নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে চিন্তা করতে পারেনা। এই ঘটনায় আমরা দেখতে পাই _সহুকার (বণিক) অনাহূত অতিথি হিসেবে আশ্রম গিয়েছিল । ভক্ত হিসেবে বা উপাসনার জন্য নয় ! সে তার ক্ষমতা কতখানি __তা দেখাতে চেয়েছিল ! অনুষ্ঠানে বাধা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল এবং তার ফলেই সে অপসারিত হয়েছিল ! যদি বিষয়টা সে ঠিক ঠিক দেখতো এবং বিচার কোরতো __তাহলে সে নিজেকে সংশোধন করতে পারতো ! তা না করে সে স্বামীজীর উপর প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল । স্বামীজী তার আক্রমণাত্মক মনোভাবকে গুরুতরভাবে গ্রহণ করেন নাই । যখন সে বাধাস্বরূপ হয়ে দাঁড়ালো, তখন তিনি বাধা সরিয়ে দিলেন এবং পরে তা ভুলেও গিয়েছিলেন!
যারা অপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে চিন্তা করে তাদের বিরুদ্ধে স্বামীজীর কোন আক্রোশ ছিল না। যদি সে তার পথ পরিবর্তন করতো অথবা অন্ততপক্ষে বাধা সৃষ্টি না করতো __তাহলে স্বামীজী তাঁর কথা চিন্তাই করতেন না ! এইসব ক্ষুদ্র ব্যক্তিদের সম্বন্ধে চিন্তা করার সময়‌ই বা তাঁর কোথায় ? পরের দিনই তিনি ঘটনাটা ভুলে গিয়েছিলেন।।
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
………………………………………………………………….
(পরবর্তী অংশ) … উদ্ভিদ এবং অমানবীয় শরীর প্রজননের জন্য সৃজন শক্তিকে কাজে লাগায়। ওরা এইভাবে বংশ বৃদ্ধি করে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এর মহৎ উদ্দেশ্য আছে। সাধারণত অনেকেই এই শক্তিকে বংশ বৃদ্ধির কাজে লাগায়। কিন্তু যদি মানব একে যৌনবৃত্তিতে নষ্ট না করে বেশ কিছুকাল সংরক্ষণ করে, তাহলে এটা সূক্ষ্ম শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং সুপ্ত আধ্যাত্মিক চেতনাকে জাগ্রত করে। সূক্ষ্ম চেতনার তেজস্ক্রিয়তার ফলে ব্যক্তিজীবনে নূতন অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়। সূক্ষ্ম চেতনা কার্যকরী হওয়ায় ব্যক্তি সূক্ষ্ম বিচার দ্বারা সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়। ভাল-মন্দ, সৎ-অসৎ প্রভৃতি সঠিকভাবে বিচার করতে পারে। কাণ্ডজ্ঞান যথার্থ বস্তুকে বুঝিয়ে দেয়। কিন্তু প্রায়শ মানব ব্যক্তিঅহং-এর দ্বারা পরিচালিত হয়ে কাণ্ডজ্ঞানকে উপেক্ষা করে এবং তার কার্য হয় স্বার্থযুক্ত। যদি সূক্ষ্মশক্তি ক্রিয়াশীল হয় তাহলে মানুষ অবশ্যই কাণ্ডজ্ঞানকে উপেক্ষা না করে ওর দ্বারা পরিচালিত হবে।
যদি কোন যুবক ৩০ বছরের পূর্বে এবং কোন যুবতী ২০ বছরের পূর্বে বিয়ে না করে তাহলে খুবই সুন্দর হয়। একবার রূপান্তর শুরু হলে যদি পরে সামান্য পরিমাণে সৃজনীশক্তি নষ্ট হয় তাতে কিছু ক্ষতি হয় না। এর পরে দম্পতিকে দায়িত্বশীল গৃহস্থরূপে বসবাস করতে হবে। যৌনজীবনের একটা উদ্দেশ্য আছে। তা হল প্রজনন। দু-তিনটে সন্তান হওয়ার পর আর সৃজনশক্তির ক্ষয় করা উচিত নয়।
যৌন-জীবনকে পাশবিকভাবে প্রজননের ক্ষেত্রে কাজে লাগানাে ঠিক নয়। যখন দম্পতি এই বিষয়ে সচেতন হয় এবং এটা বিশ্বাস করে, তখন উদ্দেশ্য-সাধন হয়ে গেলেই তারা সন্তুষ্ট হয়। তারা পরিবারের সমস্ত দায়-দায়িত্ব পালন করতে করতে সন্তানসহ স্বচ্ছন্দে জীবন-যাপন করতে থাকে। কিন্তু দম্পতি যদি উদ্দেশ্য হারিয়ে যৌনজীবন ভােগ করতে থাকে তাহলে তাদের জীবনে সন্তুষ্টি আসে না। যেখানে উদ্দেশ্য নেই সেখানে সন্তুষ্টি নেই। ক্রমাগত ইন্দ্রিয় চরিতার্থতার ফলে মূল্যবান শক্তির অপচয় হয়। শেষ বয়সে এই ক্ষতি সম্বন্ধে সচেতন হলেও তখন আর কোন কাজে লাগে না।”
স্বামীজী অর্থাৎ স্বামী বাউলানন্দজী এই মহৎ শক্তি সম্বন্ধে মানুষকে সর্বদা উপদেশ দিতেন।