স্বামী বাউলানন্দজীর পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন সময়ের কথা বলা হচ্ছিলো। সহুকার বা বণিক স্বামীজীকে প্রাণে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করছিল।
সাহুকার সমস্ত রকম পরিকল্পনা কোরলো।সে কিছু লোক ঠিক করলো স্বামীজীকে হত্যা করার জন্য ! যদি এরা কিছু করতে পারে, তাহলে কোনো লোক স্বামীজীকে সাহায্য করতে পারবে না, অভিযোগ করবার বা সাক্ষী দেওয়ার কেউ থাকবেনা ! সহুকারের এই অভিসন্ধির কথা স্বামীজী বিন্দুমাত্র টের পেলেন না! তিনি আশ্রমে একাই ছিলেন এবং রুটিন মাফিক কাজকর্ম করছিলেন । তিনি কুটিরে‌ই শুতেন।
একদিন রাতে বাপি রেড্ডি নামে একজন গ্রামবাসী তার কাঁধে একটা কুরুল(কুঠার) নিয়ে আশ্রমে ঢুকলো। কুটিরের নিকট গিয়ে কুটিরের এর ভিতরে উঁকি মারলো ! উঁকি দিয়ে ঘরের সর্বত্র দেখলো যেন কাউকে খুঁজছে কিন্তু ইপ্সিত ব্যক্তিকে দেখতে পেল না _সে ফিরে গেল! যখন সে কুটিরের ভিতরে উঁকি মারছিল, তখন স্বামীজী জেগেই ছিলেন কিন্তু তিনি কথা বললেন না, লোকটি চলে গেল। দশ দিন ধরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোতে লাগলো। শেষে সে আশ্রমে আসা বন্ধ করে দিলো ।
বাপি রেড্ডির স্থলাভিষিক্ত হলো কাস্টমস করণিক। জাতিতে সে ব্রাহ্মণ । রাত্রে সে একটা বড় ছুরি নিয়ে আশ্রমের এলো এবং কুটিরের ভেতর উঁকি মারলো! স্বামীজী শুয়ে শুয়ে সমস্ত ঘটনা দেখছিলেন, কেবলমাত্র তিনি করণিকের সঙ্গে কোনো কথা বললেন না! সে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল। পরদিন সকালে করণিক আশ্রমে এলো । সে কখনো কখনো আশ্রম দেবতাকে উপাসনা করতে আসতো ! সে স্বামীকে জিজ্ঞাসা করল _গতরাত্রে আপনি কোথায় শুয়েছিলেন ? স্বামীজী উত্তরে বললেন _”কেন,ঐ কুটিরেই !”
“ওই কুটিরে ? না স্বামীজী_ আপনি রাত্রে কুটিরে ঘুমান না ! এখানে এসে আপনাকে খোঁজ করার জন্য একজন আমাকে বলেছিল, আমি গতরাত্রে এখানে এসেছিলাম ! আপনি কোথায় ছিলেন ? বলুন না, রাত্রে আপনি কোথায় ছিলেন?”
স্বামীজীর তখন বাপি রেড্ডির কাঁধে বড় কুড়ুল নিয়ে আসার কথা মনে পড়লো ! ঐদিন‌ই একটু পরে বাপির সঙ্গে স্বামীজীর দেখা হোল। স্বামীজী তাকে জিজ্ঞাসা করলেন _”প্রতিদিন তুমি কুটিরে আসো কেন ? উত্তরে বাপি রেড্ডি বলল _” আপনাকে কে বললো?” স্বামীজী বললেন _”আমি দেখেছি, তুমি আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে !” সে বললো _”কিন্তু আমি তো দেখি নাই!”
স্বামীজী সমস্ত ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন এবং জগদম্বার অদ্ভুত লীলা দেখে অবাক হয়ে গেলেন!
স্বামীজীর আনন্দাশ্রু ঝরে পড়লো! ঈশ্বরের কি অদ্ভুত মহিমা ! হত্যা করার মনোভাব নিয়ে দুজন লোক কুটিরের নিকট এসেও স্বামীজীকে কুটিরের ভিতর দেখতে পেল না ! কাস্টমস্ করণিক এবং বাপি রেড্ডি প্রকৃতপক্ষে ভালো লোক! ভয়ঙ্কর পাপ করার হাত থেকে ঈশ্বর তাদের রক্ষা করলেন ! সহুকার তাদেরকে পাঠিয়েছিল এবং বলেছিল _”স্বামীজীকে হত্যা করতে না পারলে, তাদেরকেই হত্যা করা হবে!” _ এই কথাগুলো বলে তাদেরকে ভয় দেখানো হয়েছিল !
এই ঘটনার অল্প কয়েকদিন পরেই বাপি রেড্ডি মারা যায় ! কিন্তু এইজন্য_ তার পরিবারে কোনো অসুবিধা হয়নি! স্বামীজীর রক্ষণাবেক্ষণে তাদের পরিবার ভালোভাবেই দিন কাটাতো ! কাস্টমস করণিক __চাকরিতে জবাব দিয়ে স্বামীজীর কাজে যোগ দিয়েছিল! পরে সে বিজয়ওয়াড়ায় চলে যায়।
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
………………………………………………………………..
[প্রকৃতির ভারসাম্য]
জিজ্ঞাসা:- -যাঁরা বারবার শরীর নিচ্ছেন(অভিজ্ঞরা), তাঁদের কিভাবে পুনরায় শরীর নেওয়া থেকে বিরত করা যায় এবং যাঁরা প্রথম শরীর নিয়েছেন(নবীনেরা) তাঁদের কিভাবে নতুন শরীর নেওয়ার বাসনা থেকে মুক্ত করা যায়?
মীমাংসা:– জনস্ফীতির সমস্যা যে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে, তার সমাধান যে প্রয়োজন এবং কি উপায়ে সেই সমাধান সম্ভব এ ব্যাপারে উভয় কেই সঠিক শিক্ষা দেওয়া উচিত।
সমস্যাটার দুটো দিক আছে । প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে মনুষ্যেতর প্রাণীরা সময় হলে মানব শরীর পাচ্ছে। বাকিরা এক বা একাধিকবার মানব শরীর পেয়েও তৃপ্ত হচ্ছেনা এবং বারবার শরীর নিচ্ছে অধরা তৃপ্তির অন্বেষণে! এই অবস্থার পুনরাবৃত্তি চলছে বলেই সমস্যাটা আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এর সমাধান কেন প্রয়োজন? প্রয়োজন এই কারণে নয় যে, অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের অভাব দেখা দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এগুলো যোগানো অসম্ভব হয়ে উঠবে! কারণটা আধ্যাত্মিক! কি উপায়ে এর সমাধান সম্ভব?_ আধ্যাত্মিক উপায়ে! মানুষকে তার প্রথম শরীরেই পূর্ণ তৃপ্তি পেতে হবে ! মানুষের শরীরে প্রথম থেকেই এই সম্ভাবনা বিদ্যমান।
অভিজ্ঞরা বারবার শরীর নেন বলেই, তাঁদের জাগতিক অভিজ্ঞতা বাড়ে। কিভাবে আধিপত্য বিস্তার করতে হবে, সম্পদ সংগ্রহ করতে হবে, উৎপাদন ক্ষমতা তৈরি করতে হবে, সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে_ এসব ক্ষেত্রে তাদের সহজাত দক্ষতা এসে যায় । যেহেতু তাঁরা অতৃপ্ত তাই তাঁদের বস্তুর প্রতি লোভ যেতে চায় না। অতি সঞ্চয় করতে করতে অতি লোভী হয়ে ওঠেন তাঁরা! জগত সম্বন্ধে নবীনদের কোন অভিজ্ঞতা নেই, তাই নিজেদের ন্যূনতম প্রয়োজনের জন্য তাদের নির্ভর করতে হয় অভিজ্ঞদের উপর। পরিণামে এরা কোনোমতে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করেন_ প্রগতির সুযোগ পান না । অভিজ্ঞরা যে প্রগতির সুযোগ পান সেটা তারা কাজে লাগান অমানবিক বা স্বার্থপর কাজে। এই বহির্মুখী স্বার্থকেন্দ্রিক প্রগতিকে উন্নতি মনে করতে শেখেন নবীনেরাও এবং পরবর্তীকালে অগ্রজদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন।
বনস্পতি বা প্রাণী অবস্থায় যে গতি স্বাভাবিকভাবেই ঊর্ধ্বমুখী ছিল, মানুষ অবস্থায় সেই গতি হয়ে যাচ্ছে বহির্মুখী। মানুষের সংখ্যা বাড়ছে যা ক্রমশই দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে। স্থূল পরিসংখ্যানের সাহায্যে মানুষকে ভয় দেখালে হবে না, সমস্যাটার তাৎপর্য বুঝিয়ে সাধারণকে আধ্যাত্মিকভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে _যাতে পুরো পৃথিবীতে এক সময়ে সমস্ত মানুষ এ ব্যাপারে সচেতন হয়। কিন্তু তা হচ্ছে না, কারণ নেতা বা সমাজবিজ্ঞানীদের পরিকল্পনায় অনেক ত্রুটি থেকেই যাছে। [ক্রমশঃ]