গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বিভিন্ন সিটিং-এ জন্মান্তর প্রসঙ্গে অনেক কথা বলতেন ! সেইগুলিকেই সাজিয়ে সাজিয়ে একজায়গা করে সবার সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করা হচ্ছে । কদিন আগে টিভিতে কলকাতার এক সিনেমাভিনেতা (যার সম্প্রতি মৃত্যু হয়েছে,dec-2020)-র একটা ইন্টারভিউ (পুরোনো) দেখছিলাম । সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞাসা করল – “আপনি তো জন্মান্তর, জাতিস্মর এইসব সংক্রান্ত flim করেছেন ! আপনি কি এইগুলি বিশ্বাস করেন ?” এখন তো বঙ্গদেশে ‘বুদ্ধিজীবী’ বলতে অভিনেতা, লেখক, শিল্পীদেরকেই বোঝায় – তাই ঐ প্রসিদ্ধ অভিনেতা (উনিও লেখেন, ছবি আঁকেন, আবৃত্তি করেন – ফলে জোরদার বুদ্ধিজীবী) সোজাসুজি বলে দিলেন – ” না – না ! জন্মান্তরে আমি বিশ্বাসী নই !”
আমার একথা শুনে মনে হয়েছিল – গুরুমহারাজ ঠিকই বলতেন – “এরা এক ধরনের মানসিকভাবে handicapped !” ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করে – ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন না করাটাকে বাহাদুরি মনে করতে গিয়ে – ‘সত্য’ থেকে ক্রমশঃ দূরে সরে থাকছে এইসব মানুষেরা ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” এরা বুদ্ধিমান ! এরা বুদ্ধিকে জীবিকা করে, তাই এদের বলা হয় বুদ্ধিজীবী !” উনি আরও বলেছিলেন – ” বুদ্ধিমানরা পৃথিবীতে মঙ্গলের থেকে অমঙ্গলই বেশি করেছে ! পৃথিবীর প্রকৃত কল্যাণ করেছে বিবেকবানেরা ! তাই তোরা বিবেকাশ্রিত বুদ্ধি নিয়ে চলবি ! বিবেকবর্জিত বুদ্ধিই মানুষের জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনে ।”
জগৎ__ প্রতিভাবানদের খুবই কদর করে ! কিন্তু গুরুমহারাজ এই ব্যাপারেও আমাদের সতর্ক করেছিলেন ৷ উনি বলেছিলেন, ” ‘প্রতিভার বিকাশ’ নিশ্চয়ই কোনো মানবের জীবনে বিশেষ গুণের পরিচায়ক ! কিন্তু জানিস তো – চরিত্রের দোষজনিত কারণে কত প্রতিভাবানকে দেখা যায় ড্রেনের ধারে পড়ে রয়েছে, আর কম প্রতিভাধর অথচ বিবেকবান কোনো ব্যক্তি – তাকে হাত ধরে তুলে নিয়ে গিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসছে ৷”
এইভাবে জগতের রহস্য, জীবনের রহস্য ইঞ্চি ইঞ্চি করে বুঝিয়ে বলতেন গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ ! উনি শেখাতেন বহির্মুখীনতা নয় – অন্তর্মুখীনতাতেই যথার্থ বিকাশ সাধিত হয় ! বাইরের যতকিছু চাকচিক্য, সৌন্দর্য, ঐশ্বর্য বা সম্পদ, শিক্ষা – এগুলির থেকেও অন্তরের সৌন্দর্য, অন্তরের ঐশ্বর্য লাখোগুণে দামী ! উনি একথা বারবার বলেছেন – ” এইজন্যেই বারেবারে পৃথিবীতে সম্রাটের রাজমুকুট কোন বনবাসী, কুটির নিবাসী সন্ন্যাসীর পদতলে লুণ্ঠিত হয়েছে !”
যাইহোক, আমরা মূল আলোচনায় ফিরে আসি । তার আগে আমরা প্রার্থনা করি, যাতে ঐসব সাধারণ‌ ও অসাধারণ শিক্ষিতদের সুবুদ্ধি হয়, তারাও মনেপ্রাণে তাদের নিজেদের দেশের প্রাচীন সভ্যতা-সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে উঠতে পারে ।
কথা হচ্ছিল “জন্মান্তর” প্রসঙ্গে ! কারণ গুরুমহারাজ বললেন – ” জন্মান্তরবাদ তো নয় – কথাটা হবে জন্মান্তর বিজ্ঞান !” প্রথমবার ওনার শ্রীমুখ থেকে কথাটা শুনে সত্যিই চমকে উঠেছিলাম – ‘উনি এটা আবার কি বললেন? উনি যে কথা বলছেন – সেই কথাটা প্রমাণ করতে পারবেন তো?’ আমরাও তো ছাড়ার পাত্র নয় – ফলে শুরু হল জিজ্ঞাসার পর জিজ্ঞাসা! আর উনি অপার্থিব অলৌকিক সেই স্মিত হাসির রেখা মুখে রেখে সাবলীল সারল্যে অবলীলায় আমাদের সমস্ত জিজ্ঞাসার অবসান ঘটাতে শুরু করলেন !
আমাদের জিজ্ঞাসার উত্তরে উনি প্রথমেই বলেছিলেন – ” ‘বিজ্ঞান’ বলতে কি বুঝিস বল্ তো ? ‘বিজ্ঞান’ কথাটার অর্থ হল ‘বিশেষ জ্ঞান’! ফলে ‘জন্মান্তর বিজ্ঞান’ কথার অর্থ হবে – ‘জন্মান্তর’ বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান – তাইতো ! সেই অর্থে, বলতে গেলে – আমার তো পূর্ব পূর্ব জীবনের, পূর্ব পূর্ব শরীরের সমস্ত ঘটনাই মনে রয়েছে ! এই শরীরের গর্ভকালীন অবস্থার কথাও আমার মনে রয়েছে, তার পূর্বের অবস্থার কথাও আমার জানা ! ফলে আমি তো ‘জন্মান্তর বিজ্ঞান’ ব্যাপারটা জানি ! এবার কথা হচ্ছে তোরা বুঝবি কি করে_তাইতো ? তোরাও জানতে পারবি – একটু অন্তর্মুখী হ, – শান্ত, নিরালা-নির্জনে বসে মনঃসংযোগ অভ্যাস কর্ ! কিছুদিনের মধ্যেই তোর ‘আত্মবিস্মৃতি’ ভাবটা কেটে যাবে ! আর বিস্মৃতি কেটে গেলেই দেখবি – তখন শুধুই স্মৃতি – স্মৃতি আর স্মৃতি !
তোদের তো গতকালের সব কথাই মনে থাকে না, গতবছরের এই দিনের ঘটনা কি ঘটেছিল_জানতে চাইলে একটা কথাও বলতে পারবি না ! তাহলে গতজন্মের কথা কি করে মনে রাখবি ! কিন্তু সাধন-ভজন করতে করতে এমন অবস্থা লাভ করা যায়, যাতে করে এইজন্মের ফেলে আসা দিনগুলোর সমস্ত স্মৃতি একেবারে জ্বলজ্বল করে। এমনকি ১০ বছর-২০ বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলিও__ মনে হবে যেন সদ্য গতকাল ঘটেছিল ! এইভাবে ‘বিস্মৃতি’ কাটলেই পূর্ব পূর্ব জীবনের সমস্ত স্মৃতি জাগরুক হয়ে যায় !” [ক্রমশঃ]