মুরলী কৃষ্ণ
একবার আশ্রমে খুব জাঁকজমকের সঙ্গে মহাশিবরাত্রি উৎসব পালিত হচ্ছিল। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা হতে ভক্তরা আশ্রমে এসেছিল। মেয়েপুরুষের খুব ভীড়। হারমােনিয়াম, খােল, করতাল বাজিয়ে ভজন চলছিল। তীব্র আবেগে পরমেশ্বরের নামকীর্তন হচ্ছিল। যজ্ঞশালায় ( রান্নাঘরকে যজ্ঞশালা বলা হত) বস্তা বস্তা চাল রান্না হচ্ছিল।
ঐদিন কুনাভরমের ডঃ সি, ভি, শ্রীনিবাসন আশ্রমে এলেন। এই আশ্রমে তিনি প্রথমবার এলেন। তিনি সরকারী হাসপাতালের সহকারী সার্জন। প্রথম দেখাতেই তাঁর মনে হল যে আশ্রমটি তাঁর নিজের। আসামাত্রই স্বামী বাউলানন্দের সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল। তিনি পেরেন্টাপল্লীর চর্মরােগীদের ইনজেকসন দেওয়া শুরু করলেন। শ্ৰীনিবাসনকে স্বামীজী ‘হরি’ বলে ডাকতেন । খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ল। এমনকি অফিস মহলেও তিনি হরি বলে পরিচিত হলেন।
সকলের বেশ আনন্দে কাটছিল। স্বামীজীর মানসিক অবস্থা কিছুটা অস্বাভাবিক ছিল। তাঁর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল যেন তিনি তীব্র মনস্তাপে ভুগছেন । দিনের পর দিন গত হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রভুর আদেশ অনুযায়ী উপজাতিদের প্রতি সেবার যথােপযুক্ত কাজ তখনও বাস্তবে রূপ নিল না । এ সম্বন্ধে বিশেষভাবে চিন্তা করা হয় নাই। কোন প্রস্তাবও গ্রহণ করা হয় নাই।
প্রভুর আদেশ ছিল উপজাতিদের হাড়ে যেন মাংস গজায়। অর্থাৎ তারা যেন ঠিকমত খেতে পায় । মাঝে মাঝে কিছু খাবার দিয়ে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যায় না। এতে সমস্যার বিন্দুমাত্র সুরাহা হয় না। কি করা হবে ? কেমন করেই বা করা হবে ? এই ছিল তাঁর সমস্যা। সর্বত্রই তিনি অনিষ্ট এবং প্রতারণা দেখতে পাচ্ছেন। কাজ করে উপজাতিরা যাতে উপযুক্ত মজুরী পায় এবং অজিত অর্থ তাড়ির দোকানে না গিয়ে যেন পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দের জন্য সদ্ব্যয় হয় – উপজাতিদের সাহায্যের জন্য এ কাজগুলি অবশ্যই করতে হবে ।
কোনদিক থেকে কোন রকম সাহায্যের উপায় না দেখে স্বামীজী হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ঐরাত্রে মন্দিরে ভজন হচ্ছিল। কিছু কিছু ভক্ত যারা সারাদিন কাজকর্ম করে অথবা ভজন গেয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল তারা যেখানে জায়গা পেল সেখানেই শুয়ে পড়ল। স্বামীজী তাঁর কুটীরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তিনি ঘুমান নাই। হারমােনিয়াম, খােল-করতালএর শব্দ এবং ভক্তদের গান—সবই শুনতে পাচ্ছিলেন। মন্দিরের গান-বাজনার শব্দ তাঁর মনে রেখাপাত করে নাই। কিন্তু বাঁশীর একটা সুস্পষ্ট অথচ ভিন্ন ধরণের সুর তাঁর কানে বাজছিল। এই সুর খুবই আকর্ষণীয়। প্রথম প্রথম তিনি এতে কর্ণপাত করলেন না। কিন্তু পবিত্র বাঁশীর দিব্যসুর তাঁর কর্ণে বাজতে লাগল। বাঁশীর মধুর সুরে তাঁর কান জুড়িয়ে গেল । এই সুরে তাঁর মনে পরমানন্দের সৃষ্টি হল। তাঁর চুল খাড়া হয়ে গেল । দিব্য অনুভূতিতে মন ভরে গেল । একটা অজানা উচ্ছ্বাস তাঁর শরীরকে কাঁপিয়ে তুলছিল।
স্বামীজী উঠে মন্দিরে চলে গেলেন। মন্দিরে গিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন মুরলীর দিব্য সুরের সঙ্গে ভজনের শব্দের কোন সম্পর্ক নাই। একটা সম্পূর্ণ আলাদা রকমের শব্দ। ঝর্ণার দিক থেকে বাঁশীর শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তিনি ওদিকে গিয়ে ঝর্ণার জলে অনুসন্ধান করতে লাগলেন। শব্দ ঝর্ণার মধ্যস্থল হতে আসতে লাগল । দুর্ভেদ্য অন্ধকারে তিনি সেইদিক নিরীক্ষণ করলেন। তিনি দেখতে পেলেন সেখানে এক জন দাঁড়িয়ে রয়েছে। কি রূপ! এই মোহিনী রূপ শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া আর কারও হতে পারে না। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজে পৃথিবীতে নেমে এসে ঝর্ণায় দাঁড়িয়ে আছেন । তাঁর গায়ের রঙ নীলাভ। গায়ে তাঁর সিল্কের হলুদ কাপড়। মাথায় হীরক খচিত মুকুট। মুখে স্মিত হাসি । পবিত্র পা দুখানি ঝর্ণার জলে ধুয়ে যাচ্ছে । মৃদু বাতাসে ময়ূরপুচ্ছ উড়ছিল। শ্রীকৃষ্ণের দিব্য বাঁশি হতে একটা দিব্য সুর নির্গত হচ্ছে। এই সুর পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। স্বামীজীর মানসিক অবস্থার পরিবর্তন হল। বাঁশির মনমাতানাে সুরে তাঁর মনের ঊর্ধ্বগতি হল । … [ক্রমশঃ]
