গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বিভিন্ন সিটিং-এ “জন্মান্তর বিজ্ঞান” নিয়ে যেসব আলোচনা করেছিলেন – সেইগুলোই এখানে সবার সাথে শেয়ার করা হচ্ছিলো। গুরুমহারাজ বিভিন্ন উদাহরণ সহযোগে “জন্মান্তর” ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। উনি বলেছিলেন ___’একটা পরিবারে একই পিতা-মাতার হয়তো দুই-তিনজন বা তার অধিক সন্তান থাকলে দেখা যায় প্রত্যেকটি সন্তান অপরজনের থেকে আলাদা ! তারা দেখতে অনেক সময় প্রায় একইরকম হোতে পারে, কিন্তু স্বভাব বা প্রকৃতিতে সম্পূর্ণ আলাদা ! এমনটাও দেখা গেছে – একই পিতামাতার একটি সন্তান সাধু প্রকৃতির এবং অন্য একজন হয় দুর্দান্ত প্রকৃতির ! কোনো সন্তান সত্ত্বঃপ্রধান, কোনো সন্তান রজঃপ্রধান, আবার কেউ হয়তো তমোপ্রধান ‘!
গুরুমহারাজ বলেছিলেন এমনটা হওয়ার কি কারন _তা কোনো জীববিজ্ঞানী ব্যাখ্যা দিতে পারবে না ! স্থূল শরীরের রক্ত কেন আলাদা, গঠন কেন আলাদা ইত্যাদি সব ব্যাখ্যা দিতে পারবে, কিন্তু স্বভাব বা প্রকৃতি কেন ভিন্ন-ভিন্ন -তার কারণ কোনো জড়বিজ্ঞানী বা জীববিজ্ঞানীরা জানেই না – ফলে বলবে কি করে ? মানুষের স্বভাব বা প্রকৃতি আসে জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার থেকে ! মানুষের এক একটা জীবন যেন এক একটা অভিজ্ঞতার সিঁড়ি ! যে সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে মানুষ এগিয়ে চলে পূর্ণত্বের দিকে। নিম্নতর জীব থেকে বিবর্তনে এগিয়ে এসে যখন জীবের “মানব শরীর” লাভ হয় – তখন থেকেই সে এই গ্রহের সর্বোন্নত শরীর লাভ করে “উন্নত জীবে” উন্নীত হয় ! এইবার শুরু হয় তার ‘উন্নত জীব’ হিসাবে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পালা ! এক একটা জন্মের অভিজ্ঞতা – তার পরের জন্মের শরীরের এবং চেতনাকে আরও সমৃদ্ধ করে !
এইভাবে সমাজের যে মানুষ যত বেশি জন্মান্তর কাটিয়ে এসেছে, সে তত বেশি অভিজ্ঞতাপুষ্ট, সে এই জগৎসংসারের সমস্ত বিষয় সম্বন্ধে আরো অনেক বেশী ওয়াকিবহাল। ফলে, এরা যৌবনপ্রাপ্ত হবার পর থেকেই জাগতিক সুখ, ঐশ্বর্য, বিদ্যা, জনবল ইত্যাদি খুব সহজেই লাভ করতে পারে এবং ফলস্বরূপ এরা ‘সদ্য মানুষ শরীরে আসা’_ সমাজের নিম্নচেতনার মানুষদের উপর প্রভুত্ব বা কর্তৃত্ব করে ! আর এই কর্তৃত্ব বা প্রভূত্ব করার নেশায় অভিজ্ঞতাপুষ্ট মানুষেরা বারবার জন্মগ্রহণ করতে থাকে। “পুনরপি জনমং, পুনরপি মরণং – পুনরপি জননী জঠরে শয়নম্”! এইভাবে জীব থেকে ব্রহ্মে বা পূর্ণত্বে উপনীত হবার যে ক্রম – সেই ক্রমে বা flow তে একটা stagnancy এসে যায়। মনুষ্যশরীরের একমাত্র উদ্দেশ্য ঈশ্বরলাভ বা পূর্ণত্বপ্রাপ্ত হওয়া !
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – মানুষের জীবনের তিনটি চাহিদা (১) need of life (২) necessity of life এবং (৩) purpose of life ! need of life বলতে food, clothing and shelter, necessity of life বলতে বোঝায় health, education and security, এছাড়া শেষেরটা হোলো purpose of life ! purpose of life হোলো “পূর্ণতাপ্রাপ্তি” বা ঈশ্বরলাভ অথবা বলা যায় “ঈশ্বরত্বলাভ”! কিন্তু মানুষ need of life এবং necessity of life নিয়েই এত মত্ত রয়েছে যে, purpose of life নিয়ে কোনো উদ্যোগই নাই ! এইভাবেই এই মানবজগতে senior বা উন্নত চেতনার মানুষ এবং junior বা অনুন্নত চেতনার মানুষ রয়েছে ! একদল সমাজের বেশিরভাগ সুযোগ-সুবিধা, ধন-ঐশ্বর্য, বিদ্যা -তাদের অভিজ্ঞতাযুক্ত বুদ্ধি দিয়ে কুক্ষিগত করে রাখছে এবং অপরদলের মানুষেরা চিরকাল ধরে নির্যাতিত, অবহেলিত, শোষিত, শাসিত হয়ে আসছে । গুরুমহারাজ একটা কবিতায় লিখেছিলেন – “একদল চুষে খাচ্ছে, আর অন্যদল চুপসে যাচ্ছে !” আর এই দুটোর মধ্যবর্তীরা মধ্যবিত্ত হয়ে থেকে যাচ্ছে !
এইখানেই মহাপুরুষদের, অবতারপুরুষদের ভূমিকা ! তাঁরা এই পৃথিবীতে মানুষের শরীর ধারণ করে আবির্ভূত হ’ন এবং ঐ যে জন্ম-জন্মান্তরের অভিজ্ঞতাপুষ্ট মানুষগুলো ধন-ঐশ্বর্য, ভোগ-বাসনা, মায়া-মোহ ইত্যাদির বাঁধনে আটকা পড়ে গেছে, এদেরকে টেনে টেনে চেতনায় উন্নত কোরে আবার উর্ধ্বগতির স্রোতে ফেলে দেন ৷ কিছু মানুষকে সঙ্গে করে নিয়েই চলে যান, কিছু মানুষকে এগিয়ে চলার মূলমন্ত্রটি শিখিয়ে দিয়ে যান ! আর বাকিদের জন্য তাঁর সঙ্গে করে নিয়ে আসা পার্ষদদের রেখে যান – যাতে করে তাঁরাই এদের এগিয়ে চলার পথ দেখাতে পারেন । [ ক্রমশঃ]