শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বিভিন্ন সিটিং-এ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন – এখানে সেইসব নিয়েই কথা হচ্ছিলো। বিভিন্ন মহাপুরুষ বা মহাত্মা-মহাজনদের অনেক কথাই already বিভিন্ন গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়ে রয়েছে, অথচ গুরুমহারাজ যখন তাঁদের সম্বন্ধে আলোচনা করতেন – তখন মনে হোতো যেন নতুন কিছু শুনছি ! এমনটা তো কোনো বইয়ে পড়িনি ! প্রথম প্রথম মনে হোতো – গুরুমহারাজ বোধহয় ঐসব মহাত্মা-মহাজনদের সম্বন্ধে লিখিত বইগুলি পড়েন নি – বলেই হয়তো এমনটা বলছেন ! পরে পরে বুঝেছি – কি মহামূর্খ আমরা, আর কি ভীষণ ছেলেমানুষী আমাদের ভাবনার বহর ! যাঁর জগৎ, সব শরীর-ই যাঁর শরীর – তাঁর কাছে আবার কোনটা গোপন, কোনটা অপ্রকাশিত ! তিনি যখন যা বলছেন – উনি তো দেখে দেখে বলছেন ! তা সে পঞ্চাশ বছর আগের ঘটনাই হোক বা ৫০০ বছর অথবা ৫/১০/২০ হাজার বছর আগের ঘটনা ! কালের প্রবাহের দ্রুততম তরণী বেয়ে উজান পথে উনি যখন যা বলতে চান – সেখানে পৌঁছে যেতেন এবং সেই ঘটনাটা দেখে দেখে নিখুঁতভাবে বলে দিতেন। আর এইজন্যেই আমাদের মনে হোতো – উনি বোধহয় ওনার কথাই বলছেন, যাঁর কথা বলছেন_সেই শরীরটাও বোধহয় ওনারই পূর্ব শরীর ! তাই বোধহয় জ্ঞানীরা বলেছেন – “তিনি-ই সব হয়েছেন।”
এছাড়াও ছিল তাঁর(গুরু মহারাজের) নিখুঁত বিচার ও বিশ্লেষণ। তাঁর সিটিং-এ উপস্থিত শিক্ষিত, বুদ্ধিমানদেরকে দেখেছি – তাদের দীর্ঘদিনের লালিত বিচারধারা, concept – কেমন করে গুরুমহারাজের একটা কথায় ভেঙে চুরমার হয়ে যেতো ! অনেককেই বলতে শুনেছি, ” ছিঃ ছিঃ ! আমরা নিজেদেরকে কতো শিক্ষিত, কতো বুদ্ধিমান ভাবতাম – এখন দেখছি আমরা তো বিশেষ কিছুই জানি না ! আমরা তো কিছুই তেমন শিখিনি ! এনার (গুরুজীর) পদপ্রান্তে বসে এখন আমাদের জীবনের পাঠ গ্রহণ করতে হবে – তবে যদি কিছুটা হলেও শেখা যায় !”
অনেক সময় আমরা দেখেছি – যে কোনো পরম্পরার অনুসারী ভক্তদের সাথে অথবা অন্য কোন আদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পরই___ হয় তারা খুবই রেগে যায়, অথবা গালাগালি দিয়ে স্থান ত্যাগ করে !
আসলে আমরা যখনই গুরুমহারাজের বলা কথাগুলো তাদেরকে বলি, তখন তারা একেবারেই নিতে পারে না – reaction করে ফেলে ! কেন করে জানেন তো – মানুষের সেই পুরনো অভ্যাস ! পুরাতনকে আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকার প্রয়াস – একতাল গোবর মুখে পুরে মধুর স্বাদ পেতে চাওয়া ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলে গেছেন – ” বাদশাহী আমলের মুদ্রা নবাবী (কোম্পানী) আমলে চলে না !” কিন্তু ঠাকুরের অনুগামীরাও কি কম গোঁড়া ? গুরুমহারাজ এই গোঁড়াদেরকে বলেছিলেন – “রামকৃষ্ণাইট” (Ramkirshnait) ! বলেছিলেন – “এখন তো সব ‘Regimental religion’! ”
যাইহোক, আমরা মূল কথায় আসি ! একবার বনগ্রাম আশ্রমে ‘গোঁসাইজী’ অর্থাৎ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীকে নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা হচ্ছিলো। হঠাৎ করে গুরুমহারাজ বলে উঠলেন – ” জানিস তো ! তোদের ঐ বিজয় গোঁসাই-এর থেকেও ওর ব্রহ্মচারী শিষ্য কুলদানন্দ ভালো ছিল !” আমরা অনেকেই একেবারে হৈ-হৈ করে উঠলাম – “এটা কি রকম কথা বলছেন গুরুজী !” গুরুজী হাসতে হাসতে বললেন – ” সেই অর্থে বলিনি__ জানিস, ঐ কুলদানন্দ যখন প্রথম গোঁসাইজীর কাছে এসে ব্রহ্মচর্য্য গ্রহণ করেছিল, তখন ওর নিজের সাধন-ভজন ও ব্রহ্মচারী হিসাবে জীবনযাত্রার ব্যাপারে সে খুবই নিষ্ঠাবান ছিল। সেইসময় বিজয়কৃষ্ণের ছোট মেয়ে ‘কুতুবুড়ি’ বিবাহযোগ্যা (তখনকার দিনে ১০/১২ বছর বয়স হলেই বিয়ে দিতে হোত) হয়ে উঠেছিল ! কুলদানন্দও ছিল গোঁসাইজীদের পালটি ঘর ! সেই হিসাবে গোঁসাইজীর স্ত্রী যোগমায়া দেবী এবং তাঁর মা ঐ ছেলেটির সাথেই ‘কুতুবুড়ি’র বিবাহের প্রস্তাব করেছিলেন ! গোঁসাইজী সব জেনেও ব্যাপারটা একপ্রকার মেনে নিয়েছিলেন ! নেহাত ছেলেটা (কুলদানন্দ) নিজের ব্রহ্মচর্য সাধনের ব্যাপারে একদম strict ছিল – তাই বিয়েটা হয়নি ! ছেলেটা একটু দুর্বল স্বভাবের হলে – কি হোতো বল্ তো ? শিষ্য তো ফাঁসতোই – গুরুর-ও পশ্চাৎগতি হতো !”
দেখুন__মহাপুরুষদের এই এক মুশকিল ! তাঁরা নিজেরা নিজেদেরকেই (সব শরীরই তো তাঁদেরই শরীর, যে কোনো মহাপুরুষই তো ঈশ্বরের শক্তির প্রকাশ ! আর অবতারগণ সরাসরি ঈশ্বরীয় শক্তির অবতারিত রূপ !) বিচার করেন, বিশ্লেষণ করেন। যুগের বিবর্তনের সাথে সাথে মহাপুরুষগণ, এমনকি অবতারগণও নতুন নতুন সাজে সজ্জিত হয়ে শরীর গ্রহণ করেন । ফলে তিনি – তাঁর পূর্বশরীরের কথা, বা সেই সময়কার অন্যান্য মহাপুরুষদের নানান কথা ও কাজকে নতুন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করেন । এইটা শুনে পুরাতনপন্থীরা ‘গেল-গেল’ রব তুলে ফেলেন ! কিন্তু নতুন প্রজন্ম ঠিকই সত্যকে গ্রহণ করে নেন। এইভাবেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে মহামানবদের লীলা । স্বামী বিবেকানন্দ একবার অন্তরঙ্গ গুরুভাইদের নিয়ে কথা বলতে বলতে বলে ফেলেছিলেন – “নিতাই এনেছে নাম — নিতাই এনেছে না–!” ব্যস্ ! গোঁসাই-বোষ্টমরা আজও স্বামীজীকে ক্ষমা করতে পারলোনা – ওনার নাম শুনলেই একেবারে ক্ষেপে ওঠে।।(ক্রমশঃ)