গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে বা অন্যত্র বিভিন্ন সিটিং-এ বিভিন্ন মহাপুরুষদের নিয়ে আলোচনাকালে এমন এমন কথা হঠাৎ করে বলে বসতেন – যেগুলো শুনে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সত্যি সত্যিই ঘাবড়ে যেতাম ! তারপর যখন উনি ব্যাপারটাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে ব্যাখ্যা করে আমাদেরকে বলতেন – তখন আমাদেরও মনে হতো – গুরুমহারাজ তো ঠিকই বলেছেন – আমাদেরই বোঝার ভুল ছিল !
স্বামী নিগমানন্দের সন্ন্যাসী শিষ্যদের মধ্যে অনেকেই খুবই উন্নত ছিলেন এবং বিখ্যাতও হয়েছিলেন। এদের মধ্যে স্বামী শিবানন্দ, দূর্গাপ্রসন্ন পরমহংস, ঋষি অনির্বান প্রমুখরা তো মানুষের কাছে আজও স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন । একদিন স্বামী নিগমানন্দের কথা বলতে গিয়ে নানা কথা উঠলো। উঠলো ঋষি অনির্বাণের কথা। মহাপণ্ডিত ছিলেন উনি। প্রাশ্চাত্তের উন্নত দেশগুলিতে অনেক কাজ করেছেন উনি। ইংরেজিতে অনেক বইও লিখেছেন – যেগুলি গুণীসমাজে খুবই সমাদৃত ! তীব্র বৈরাগ্য ও সাধনার ফলে কিছু কিছু সিদ্ধি অর্জন করেছিলেন উনি ! কিন্তু হলো কি জানেন– ওনার মধ্যে একসময় চরম “অহংভাব” জেগে উঠলো ! একদিন প্রকাশ্যে অনির্বাণ গুরু নিগমানন্দের মনে আঘাত দিয়ে কথা বললেন ! গুরু আর কি করেন – সন্তানবৎ প্রিয় শিষ্যের দেওয়া আঘাত নিজেই হজম করে নিলেন – কোনোরূপ reaction করলেন না ৷ গুরুমহারাজ বললেন – ” দ্যাখ্, সদ্গুরু শিষ্যের কোন দোষ দেখে না, তার করা কোন অপরাধকেও গ্রহণ করে না ! গুরু যদি শিষ্যের দোষ দেখতো – তাহলে তোরা কি আমার কাছে আসতে পারতিস ? কিন্তু কি হয় জানিস – এই জগৎটা তো মহামায়ার জগৎ ! তাঁর জগতের একটা নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে ! সেই নিয়মের বাইরে যেতে পারে না মানুষ ! তাই গুরুর প্রতি গুরুস্থানীয়দের প্রতি কোনরূপ অন্যায় আচরণ করলে – তার punishment পেতেই হয় ! যদি গুরু শরীরে থেকে যান – তাহলে তিনি আবার মা মহামায়ার কাছে প্রার্থনা করে শিষ্যের কষ্টের লাঘব করতে পারেন – অন্যথায় ঐরূপ ঘোরতর অন্যায়ের ভোগান্তি ভোগ করতেই হয় !”
এক্ষেত্রেও হয়েছিল ! ঋষি অনির্বাণ প্রাশ্চাত্যের উন্নত দেশগুলিতে খুবই গ্রহণযোগ্য হয়েছিলেন – ওনার অনেক নামডাকও হয়েছিল । কিন্তু শেষের দিকে ওনার শরীরে গলিত কুষ্ঠরোগ দেখা দিয়েছিল এবং উনি পুনরায় ভারতবর্ষে ফিরে এসেছিলেন । গুরুর আশ্রমে গিয়ে নিজকৃত অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনাও করেছিলেন ।
স্বামী শিবানন্দ এবং তাঁর শিষ্যরাও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে ভারতীয় যোগ এবং বেদান্তের জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং ওইসব দেশে খুবই জনপ্রিয় হয়েছিলেন ।
গুরুমহারাজের কাছে এইসব ইতিহাস যখন শুনতাম, তখন মনে হোতো – লাইব্রেরীতে কত হাজার হাজার পুস্তক রয়েছে, কিন্তু আমাদের ওইসব পুস্তকপাঠের কোন প্রয়োজনই নাই ! আমরা জানতাম__ আমাদের পরমানন্দ রয়েছে, তাঁর পদপ্রান্তে বসে খানিকক্ষণ স্থিরভাবে সেই অপূর্ব শোভামণ্ডিত শ্রীমুখমন্ডলের দিকে তাকিয়ে থাকলেই – পৃথিবীর যাবতীয় জ্ঞান, যাবতীয় তথ্য বা তত্ত্ব হু-হু করে আমাদের মধ্যে প্রবেশ করে যেতো ! কত কথা – কত জ্ঞান যে আমাদের সমস্ত গুরু ভাইবোনেদের মধ্যে তিনি বিতরণ করেছেন – তার কিয়দংশই লেখা হচ্ছে বা প্রকাশিত হচ্ছে – এর ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এখনো অপ্রকাশিত রয়ে যাচ্ছে ! সমস্ত গুরু ভাই-বোনেদের সমস্ত কথা যদি আপনারা শুনতে পেতেন – তাহলে হয়তো তাঁর বলা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ কথা জানতে পারা যেতো। কিন্তু তা তো হবার নয় – তাই যুগে যুগে ঈশ্বরের অবতারদের বলা সবকথা সাধারণ মানুষ জানতে পারে নি ! যেটুকু জেনেছে – পরবর্তীতে সেগুলিও আবার বিকৃত হয়েছে – মানুষ নিজের মতো মহাপুরুষদের কথার মানে করে নিয়েছে, নতুন নতুন সম্প্রদায় করেছে ! আর এর ফলেই সমগ্র পৃথিবীজুড়ে ধর্ম নিয়ে, ধর্মমত নিয়ে এতো বিরোধ, এতো হিংসা-মারামারি !
গুরুমহারাজ বারবার-ই বলতেন – ” বিভিন্ন মহাপুরুষ যাঁদেরকে কেন্দ্র করে কোনো না কোনো ধর্মমত তৈরি হয়েছে – তাঁদের বলা কথাগুলিতো সঙ্গে সঙ্গে লেখা হয়নি – সেগুলি শিষ্যদের মুখে মুখে প্রচারিত হতে হতে হয়তো ৫০ বছর, ১০০ বছর, ১৫০ বছর পরে লিপিবদ্ধ হয়েছে ! যার জন্য প্রায় সমস্ত মহাপুরুষদের কথারই নানারকম বিকৃতি ঘটে গেছে, ধর্মগ্রন্থগুলোতে তাঁদের কথার অর্থই অন্যরকম হয়ে গেছে ! মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মাত্র ৫৫০ বছর আগে শরীর ধারণ করেছিলেন – কিন্তু তাও তাঁর স্বহস্তে লিখিত ” *শিক্ষাষ্টকম্* ” নামে মাত্র ৮টি শ্লোক পাওয়া যায় । তাঁর পার্ষদদের মধ্যে কয়েকজন খুবই অল্প কিছু “কড়চা” আকারে লিখে রেখেছিলেন ৷ কিন্তু গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের আকরগ্রন্থ ” চৈতন্যভাগবত_ ” রচিত হয়েছিল মহাপ্রভুর পর তৃতীয় প্রজন্মে, চৈতন্যচরিতামৃত আরও অনেক পরে । ঠিক এইরকমই হয়েছিল কোর-আন শরীফ বা বাইবেল রচনার ক্ষেত্রে ক্ষেত্রেও ! হাদীস শরীফের বর্তমান সংকলন তো কোর-আন শরীফেও অনেক পরে রচিত হয়েছিল ৷
সুতরাং ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোঝা যায় যে –সব ধর্মগ্রন্থেই কিছু না কিছু গোলমাল ঢুকে আছে – আর তা থাকাটাও স্বাভাবিক। সেইজন্যেই মহাপুরুষগণ বারবার শরীর ধারণ করে বিভিন্ন ধর্মমতের জীবন-বিরোধী কথাগুলোর সংশোধন করে যান, সকলকে জীবনমুখী শিক্ষা দিয়ে সকল ধর্মমতের অনুগামীদের “প্রকৃত মানুষ” হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন!