গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের বিভিন্ন সিটিং-এ বলা কথা নিয়ে এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো এবং তার সাথে সাথে স্বামী পরমানন্দ “জীবনচর্যা” সম্বন্ধে যে সব কথা বলতেন, সেগুলিও বলা হচ্ছিলো। স্বামী পরমানন্দ কিন্তু বিশেষ নতুন কথা কিছুই বলেন নি, উনি চিরকালীন সত্যকে, ভারতীয় প্রাচীন পরম্পরার শিক্ষাকে-ই নতুন আঙ্গিকে পরিবেশন করেছেন৷ আর যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে শরীর গ্রহণ করে মহাপুরুষগণ এটাই করে থাকেন। সেই চরম বা পরম সত্যকে, ঋষিদের উপলব্ধ সত্যকে যুগোপযোগী করে, স্থান-কাল-পাত্রের উপযুক্ত করে, নতুন নতুন আঙ্গিকে বলেন – এইমাত্র ! কিন্তু পৃথিবী গ্রহের মানুষ এখনো যেহেতু খুবই অনুন্নত চেতনায় রয়েছে, পৃথিবীর মানুষের মানসিকতা এখনো যেন শিশু অবস্থায় রয়েছে (গুরুমহারাজ বলেছেন) – তাই সাধারণ মানুষেরা পূর্বে পূর্বের যুগপ্রয়োজনে অবতরিত মহাপুরুষদের বলে যাওয়া একই সত্য বা একই তত্ত্বের ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকের (ভিন্ন ভাষায়, ভিন্ন style-এ, ভিন্ন ভিন্ন শব্দ প্রয়োগ করে বলা) প্রকাশকে ঠিকমত বুঝতে না পেরে, মনে করে আমাদের প্রবর্তকের শিক্ষা আলাদা, আর ওদেরটা আলাদা ! এইভাবে গোটা বিশ্বজুড়ে সহস্র সহস্র ধর্মীয় মতবাদ, সহস্র সহস্র ধর্মীয় নেতার অনুগামীর দল, সহস্র সহস্র ধর্মস্থান সৃষ্টি হয়েছে !
আর এই ভিন্নতার ফলেই সৃষ্টি হয়েছে ভেদদৃষ্টি, শুরু হয়েছে বিরোধ, হানাহানি, মারামারি, কাটাকাটি! প্রায় সব ধর্মমতের মানুষেরাই চাইছে __বাকিরা তার ধর্মমতে শামিল হোক, সবাই একমতে আসুক ! আর এইটা করতে গিয়েই শুরু হয়েছিল জোর-জবরদস্তির প্রয়োগ। আর এরই ফলস্বরূপ ঐ যে বলা হোল __মারামারি, খুনোখুনি, হিংসা, রক্তপাতের ছড়াছড়ি ! অপরিণামদর্শী ধর্মনেতাদের সাথে অবিমৃষ্যকারী রাজনেতারা জোট বেঁধেছিল যখন থেকে – তখন থেকে এই হিংসা, এই রক্তপাত শুধুমাত্র ছোট ছোট ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি – তা ছোট এলাকার সীমানা ছাড়িয়ে এক দেশের সাথে অন্য দেশের যুদ্ধে বা হয়তো বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। পৃথিবী দেখেছে ধ্বংসের বীভৎসতা, লক্ষ লক্ষ নরনারীর বুকফাটা আর্তনাদ, মানবতার চরম লাঞ্ছনা ও অপমান ! কিন্তু তাতে কি ! কিছুদিন চুপচাপ থাকার পর – এই পৃথিবীর শিশুমনষ্ক মানুষ আবার নতুন নতুন বাহানা নিয়ে ঝগড়া, মারামারি, কাটাকাটি শুরু করে দিয়েছে!
তাহলে বারবার মহাপুরুষগণ শরীর নিয়ে করছেন টা কি ? তারা প্রত্যেকেই এই পৃথিবীতে শরীর ধারণ করে তাঁর সংস্পর্শে আসা মানুষদেরকে উদ্দেশ্য করে একটা কথাই বলেন, তা হল – তারা যেন সাধন-ভজন করে নিজেদের চেতনাকে উন্নত করে, তারা যেন তাদের আচরণের দ্বারা ঈশ্বরের প্রিয় হয়ে উঠতে পারে। তার জন্য মহাপুরুষেরা স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী কিছু কিছু বিশেষ শিক্ষা দেন, ক্রিয়া দেন ! এবার সেই মহাপুরুষের দেহান্ত হবার পর থেকেই শুরু হয় গন্ডগোল ! পরবর্তী প্রজন্মের অনুসারীরা তো আর পূর্ণতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি নন। অবতারিত মহাপুরুষের থাকে বিশ্বমন(Universal mind), বিশ্বঅহং(Universal ego) আর পরবর্তী অনুসারীদের থাকে ব্যক্তিমন(individual mind), ব্যক্তিঅহং(individual ego)। ফলে প্রথম প্রজন্ম থেকেই মূল আদর্শ থেকে সামান্য সামান্য বিচ্যুতি ঘটতে শুরু করে। এইটাই প্রজন্মের পর প্রজন্মে কমতে কমতে শুধু শূন্যই(O) হয় না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল ভাব বা ভাবনার সম্পূর্ণ উল্টো ধারায় বইতে থাকে।
গুরুমহারাজ বলেছিলেন,- “যে কোনো অবতরিত মহাপুরুষের পরম্পরায় আধ্যাত্মিকতা “তিন জেনারেশন্”(generation) পর্যন্ত থাকে।” তারপর ওই পরম্পরা থেকে সামাজিক কাজ, সেবামূলক কাজ – ইত্যাদি হতে পারে – কিন্তু আর ওই পরম্পরার অনুগামীদের আধ্যাত্মিক উন্নতি বিশেষ হয় না৷ বরং যতদিন যায় – দেখা যায় ওই পরম্পরার মূল শাখা ভেঙে ভিন্ন ভিন্ন শাখা তৈরি হয় এবং বহু মানুষ পৃথক পৃথক শাখায় যুক্ত হয়ে পরস্পরের সাথে বিবাদে-কলহে লিপ্ত হয়ে পড়ে, একে অপরের দোষও অন্বেষণ করতে শুরু করে। এটাই চলছে – গোটা পৃথিবীর দিকে যদি দৃষ্টিপাত করা যায়, তাহলে দেখা যাবে এইটাই চিত্র !
এরমধ্যে আবার কিছু মানুষ রয়েছে যারা শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ, সংস্কারবাদী, যুক্তিবাদী – ইত্যাদি নানান নাম নিয়ে বিভিন্ন মহাত্মা, মহাপুরুষ, প্রাচীন পরম্পরা – ইত্যাদির সমালোচনা করে থাকেন, তাঁদের ভুল ধরেন – তাঁদের কি বলা উচিৎ ছিল, কি করা উচিৎ ছিল বা কী বলা বা করা উচিৎ ছিল – সেইসব নিয়ে বক্তৃতা করেন, তাঁদের কুৎসা করে Article লেখেন, কেউ কেউ বই-ও লিখে ফেলেন ! সমাজের পক্ষে এরা আরো ক্ষতিকারক ! এরা বুদ্ধিমান – এরা জানে যে, মানুষ এমনিতে এদের পাত্তা দেবে না, এদের মৃত্যুর পর এদেরকে কেউ মনে রাখবে না ! তাই এরা কায়দা করে কোনো-না-কোনো মহাপুরুষদের নামের সঙ্গে নিজের নামকে কোনভাবে জুড়ে দেবার চেষ্টা করেন – যাতে করে ঐ মহাপুরুষের সঙ্গে তাদের নামটাও বেশ কিছুদিন মানুষের সমাজে থেকে যায় !
কিন্তু এটা চালাকি!আর চালাক ব্যক্তিকে কে মনে রাখে! গুরুমহারাজ বলেছিলেন – “কাল জানেন কালী !” ‘কাল’ যার উপর প্রসন্ন, মা জগদম্বা বা ‘কালী’ যার উপর প্রসন্ন – তাকেই উত্তরকাল মনে রাখে ! বাকীরা কোথায় হারিয়ে যায় – কেউ তাদের কথা মনে রাখে না ! স্বামী বিবেকানন্দও বলেছিলেন – ” চালাকির দ্বারা কোন মহৎ কার্য সিদ্ধ হয় না।” গুরুমহারাজ _বাঙালি কিছু লেখকের নাম উল্লেখ করেছিলেন, যারা সারাজীবন রগরগে প্রেমের উপন্যাস লিখে পয়সা কামিয়ে, জীবনের দ্বারপ্রান্তে এসে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বা স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে দু-একটা গ্রন্থ লিখেছিলেন ! সমকালীন কিছু শিক্ষিত মানুষ এই গ্রন্থগুলির মর্যাদা দিলেও মহাকালের বুকে এদের ঠাঁই হবে না [ক্রমশঃ]
আর এই ভিন্নতার ফলেই সৃষ্টি হয়েছে ভেদদৃষ্টি, শুরু হয়েছে বিরোধ, হানাহানি, মারামারি, কাটাকাটি! প্রায় সব ধর্মমতের মানুষেরাই চাইছে __বাকিরা তার ধর্মমতে শামিল হোক, সবাই একমতে আসুক ! আর এইটা করতে গিয়েই শুরু হয়েছিল জোর-জবরদস্তির প্রয়োগ। আর এরই ফলস্বরূপ ঐ যে বলা হোল __মারামারি, খুনোখুনি, হিংসা, রক্তপাতের ছড়াছড়ি ! অপরিণামদর্শী ধর্মনেতাদের সাথে অবিমৃষ্যকারী রাজনেতারা জোট বেঁধেছিল যখন থেকে – তখন থেকে এই হিংসা, এই রক্তপাত শুধুমাত্র ছোট ছোট ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি – তা ছোট এলাকার সীমানা ছাড়িয়ে এক দেশের সাথে অন্য দেশের যুদ্ধে বা হয়তো বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। পৃথিবী দেখেছে ধ্বংসের বীভৎসতা, লক্ষ লক্ষ নরনারীর বুকফাটা আর্তনাদ, মানবতার চরম লাঞ্ছনা ও অপমান ! কিন্তু তাতে কি ! কিছুদিন চুপচাপ থাকার পর – এই পৃথিবীর শিশুমনষ্ক মানুষ আবার নতুন নতুন বাহানা নিয়ে ঝগড়া, মারামারি, কাটাকাটি শুরু করে দিয়েছে!
তাহলে বারবার মহাপুরুষগণ শরীর নিয়ে করছেন টা কি ? তারা প্রত্যেকেই এই পৃথিবীতে শরীর ধারণ করে তাঁর সংস্পর্শে আসা মানুষদেরকে উদ্দেশ্য করে একটা কথাই বলেন, তা হল – তারা যেন সাধন-ভজন করে নিজেদের চেতনাকে উন্নত করে, তারা যেন তাদের আচরণের দ্বারা ঈশ্বরের প্রিয় হয়ে উঠতে পারে। তার জন্য মহাপুরুষেরা স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী কিছু কিছু বিশেষ শিক্ষা দেন, ক্রিয়া দেন ! এবার সেই মহাপুরুষের দেহান্ত হবার পর থেকেই শুরু হয় গন্ডগোল ! পরবর্তী প্রজন্মের অনুসারীরা তো আর পূর্ণতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি নন। অবতারিত মহাপুরুষের থাকে বিশ্বমন(Universal mind), বিশ্বঅহং(Universal ego) আর পরবর্তী অনুসারীদের থাকে ব্যক্তিমন(individual mind), ব্যক্তিঅহং(individual ego)। ফলে প্রথম প্রজন্ম থেকেই মূল আদর্শ থেকে সামান্য সামান্য বিচ্যুতি ঘটতে শুরু করে। এইটাই প্রজন্মের পর প্রজন্মে কমতে কমতে শুধু শূন্যই(O) হয় না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল ভাব বা ভাবনার সম্পূর্ণ উল্টো ধারায় বইতে থাকে।
গুরুমহারাজ বলেছিলেন,- “যে কোনো অবতরিত মহাপুরুষের পরম্পরায় আধ্যাত্মিকতা “তিন জেনারেশন্”(generation) পর্যন্ত থাকে।” তারপর ওই পরম্পরা থেকে সামাজিক কাজ, সেবামূলক কাজ – ইত্যাদি হতে পারে – কিন্তু আর ওই পরম্পরার অনুগামীদের আধ্যাত্মিক উন্নতি বিশেষ হয় না৷ বরং যতদিন যায় – দেখা যায় ওই পরম্পরার মূল শাখা ভেঙে ভিন্ন ভিন্ন শাখা তৈরি হয় এবং বহু মানুষ পৃথক পৃথক শাখায় যুক্ত হয়ে পরস্পরের সাথে বিবাদে-কলহে লিপ্ত হয়ে পড়ে, একে অপরের দোষও অন্বেষণ করতে শুরু করে। এটাই চলছে – গোটা পৃথিবীর দিকে যদি দৃষ্টিপাত করা যায়, তাহলে দেখা যাবে এইটাই চিত্র !
এরমধ্যে আবার কিছু মানুষ রয়েছে যারা শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ, সংস্কারবাদী, যুক্তিবাদী – ইত্যাদি নানান নাম নিয়ে বিভিন্ন মহাত্মা, মহাপুরুষ, প্রাচীন পরম্পরা – ইত্যাদির সমালোচনা করে থাকেন, তাঁদের ভুল ধরেন – তাঁদের কি বলা উচিৎ ছিল, কি করা উচিৎ ছিল বা কী বলা বা করা উচিৎ ছিল – সেইসব নিয়ে বক্তৃতা করেন, তাঁদের কুৎসা করে Article লেখেন, কেউ কেউ বই-ও লিখে ফেলেন ! সমাজের পক্ষে এরা আরো ক্ষতিকারক ! এরা বুদ্ধিমান – এরা জানে যে, মানুষ এমনিতে এদের পাত্তা দেবে না, এদের মৃত্যুর পর এদেরকে কেউ মনে রাখবে না ! তাই এরা কায়দা করে কোনো-না-কোনো মহাপুরুষদের নামের সঙ্গে নিজের নামকে কোনভাবে জুড়ে দেবার চেষ্টা করেন – যাতে করে ঐ মহাপুরুষের সঙ্গে তাদের নামটাও বেশ কিছুদিন মানুষের সমাজে থেকে যায় !
কিন্তু এটা চালাকি!আর চালাক ব্যক্তিকে কে মনে রাখে! গুরুমহারাজ বলেছিলেন – “কাল জানেন কালী !” ‘কাল’ যার উপর প্রসন্ন, মা জগদম্বা বা ‘কালী’ যার উপর প্রসন্ন – তাকেই উত্তরকাল মনে রাখে ! বাকীরা কোথায় হারিয়ে যায় – কেউ তাদের কথা মনে রাখে না ! স্বামী বিবেকানন্দও বলেছিলেন – ” চালাকির দ্বারা কোন মহৎ কার্য সিদ্ধ হয় না।” গুরুমহারাজ _বাঙালি কিছু লেখকের নাম উল্লেখ করেছিলেন, যারা সারাজীবন রগরগে প্রেমের উপন্যাস লিখে পয়সা কামিয়ে, জীবনের দ্বারপ্রান্তে এসে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বা স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে দু-একটা গ্রন্থ লিখেছিলেন ! সমকালীন কিছু শিক্ষিত মানুষ এই গ্রন্থগুলির মর্যাদা দিলেও মহাকালের বুকে এদের ঠাঁই হবে না [ক্রমশঃ]
