শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের বিভিন্ন সিটিং-এ বলা নানা কথা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো। এখন কথা হচ্ছিল মানবের জীবনের অন্যতম গুণ ‘চরিত্র’ নিয়ে। গুরুমহারাজ বলেছিলেন বেশিরভাগ মানুষ-ই ‘ব্রহ্মচর্য্য রক্ষা’ বলতে ‘চরিত্র’ বোঝায়, আর ব্রহ্মচর্য্য বলতে বোঝে পুরুষের ক্ষেত্রে বীর্যধারণ ! নারীর ক্ষেত্রেও সংসার-জীবনে প্রবেশ না করা ! কিন্তু সেটাই সব নয় ! ব্রহ্মচারী পুরুষের বীর্যধারণ বা ব্রহ্মচারিনীর পুরুষ সংসর্গমুক্ত জীবনচর্যা ব্রহ্মচর্য্যের অন্যতম শর্ত – এটা ঠিকই, কিন্তু ব্রহ্মচর্য্য গ্রহণকারী (নারী-পুরুষ নির্বিশেষে)-র স্থূল আচরনে এই ধরণের কার্য্য প্রকাশ না পেলেও যদি সূক্ষ্মভাবে মনে থেকে যায় – তা হলেও তা ব্রহ্মচর্যের স্খলন ! কারন মন থেকে ‘কাম’ বা ‘কামনা’ যায়নি, অথচ জোর করে বিভিন্ন নিয়ম-কানুনের মধ্যে থেকে বা নানান কর্মবন্ধনের মধ্যে থেকে ওই ব্যাপারটাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হচ্ছে ! কিন্তু যেকোনো সময় মনের ঐ সুপ্ত ইচ্ছা প্রবল আকার ধারণ করে সাধককে ভাসিয়ে নিয়ে চলে যেতে পারে।
তাছাড়া শ্রীমদ্ভাগবতগীতায় রয়েছে – ‘”কাম বিকৃতি হয়ে ক্রোধ হয় !” সুতরাং অধ্যাত্ম পথে এসে যদি কেউ কোনো ব্যাপারে ক্রোধ প্রকাশ করে – তাহলে জানতে হবে তার মধ্যেও সুপ্ত অবস্থায় ‘কামপ্রবৃত্তি’ রয়েছে। সেইজন্য মহাত্মা-মহাজনদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁরা তাঁদের সমগ্র জীবদ্দশায় কখনও ‘ক্রোধ’ প্রদর্শন করেন নি। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন “ফোঁস” করার কথা। “ফোঁস” করা অর্থে কৃত্রিম রাগ প্রদর্শন করা। সাধু ব্যক্তি (গৃহী, ব্রহ্মচারী বা সন্ন্যাসী)-কে “ফোঁস” করতেই হবে – না হলে সমাজ তাকে বাঁচতেই দেবে না, সমাজের তমোভাবাপন্ন মানুষেরা (এরাই সংখ্যায় বেশী) তাদেরকে একেবারে কোণঠাসা করে ফেলবে। বিশেষতঃ যে সমস্ত সাধুব্যক্তিরা সমাজে থেকে কাজ করতে চায় – তাদেরকে তো এটা করতেই হবে। তবে যারা গিরি, গুহা, অরণ্যে একাকী ‘আত্মনোমোক্ষার্থং’ কোনো না কোনো যোগসাধনায় নিমগ্ন রয়েছেন – তাঁদের ফোঁস্ করার‌ও প্রয়োজন নেই!
যাইহোক যে কথা হচ্ছিলো – সেখানে ফিরে যাই। চরিত্র বলতে শুধুই ব্রহ্মচর্য্য পালন নয়। চরিত্রবান মানুষ যেন সমাজের ‘অলংকার’! তাঁর কাছে অন্য যেকোনো মানুষ কতটা নিরাপদ ! চরিত্রবান পুরুষের কাছে একটা নারী নিরাপদ আবার একজন চরিত্রবতী নারীর কাছে তার চতুর্পার্শ্বস্থ সকলেই নিরাপদ – তা তিনি পরিবারেই থাকুন বা সমাজের অন্য কোন প্রান্তে।
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংস (বাবামনি, যিনি ওঙ্কার-এর উপাসক) একজন উন্নত অবস্থার মহাপুরুষই শুধু ছিলেন না, তিনি একজন অন্যতম সমাজ সংস্কারক‌ও ছিলেন। স্বামী স্বরূপানন্দ তরুণ-তরুণীদের জীবনচর্যা কিরূপ হওয়া প্রয়োজন, ব্রহ্মচর্য্য রক্ষার কেন প্রয়োজন, অল্প বয়সের নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হবার কুফল – এইসব বিভিন্ন ব্যাপারে বিস্তৃতভাবে শিক্ষা প্রদান করেছেন। যে কোনো বাবা-মা যদি তার ছেলেমেয়েদের ছোট থেকেই ওনার শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারে – তাহলে তাদের খুবই কল্যাণ হতে পারে। পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমেও ছাত্র-ছাত্রীদের ছোট থেকেই এইসব জীবনমুখী শিক্ষা দেওয়া যায়। কিন্তু এখনও ভারতবর্ষে সরকারিভাবে এই ধরনের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়নি। ছোট ছোট আকারে বিভিন্ন মঠ-মিশনে এই ধরণের প্রচেষ্টা হয়ে চলেছে এবং তুলনামূলকভাবে সেখান থেকে ভালো ফলও পাওয়া যায়। কিন্তু তবুও মানুষের এমন স্বভাব – যা ভালো, যা জীবনমুখী – তা গ্রহণ করার মতো মানসিকতা এখনও পৃথিবীর মানুষের হয়নি ! বরং মানুষ সহজেই জীবন বিরোধী যা কিছু তা গ্রহণ করে ফেলে। আর তারফলেই সমাজের এই বর্তমান চিত্র – যা দেখা যাচ্ছে !
‘ভারতবর্ষের কেন এই দুর্দশা’– এই ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে গুরুমহারাজ বারবার বলতেন – ” ভারতবর্ষের মানুষ যতদিন ভারতের ঋষি-মহাত্মা-মহাপুরুষের শিক্ষা, বেদ-বেদান্তে শিক্ষাকে উপেক্ষা করে বিদেশাগত শিক্ষাকে প্রাধান্য দেবে এবং প্রাচীন ভারতের মনীষীদেরকে অগ্রাহ্য করে বা অপমান করে ভারতের বাইরের কিছু দার্শনিকদেরকে মাথায় করে নাচবে – ততদিন ভারতবর্ষের দুর্গতি কমবে না।” প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয়দের গৌরব করার বিষয় ছিল “ব্যক্তির চরিত্র”! ইউরোপীয় নবজাগরণের যুগে ‘নাইট’ নামে একদল বিশেষ সৈন্যরা থাকতো যারা বিপন্নকে রক্ষা করা, নারীদেরকে রক্ষা করা(শিভালরি)-র জন্য শপথ গ্রহণ করতো ! কিন্তু ভারতীয়দের পরম্পরাগতভাবে এই শিক্ষা ছিল। বিদেশী আক্রমণের আগে ভারতবর্ষের নারীরা স্বাধীন ছিল, সুরক্ষিত ছিল। নারীরা অবাধে একস্থান থেকে অন্যস্থানে একা বা দলবেঁধে যাতায়াত করতেও পারতো। ভারতীয়দের অধিকাংশের মধ্যেই আত্মসম্মানবোধ এবং তার সাথে অপরকে সম্মান দেওয়ার রীতি ছিল। ভারতবর্ষের প্রাচীন শাস্ত্রাদিতে এইজন্যেই দেখা যায় যে – শত্রুপক্ষের লোক হোলেও গুরুজনদেরকে, নারীদেরকে সম্মানের সঙ্গে এবং সম্ভ্রমের সঙ্গে সম্বোধন করা হোতো। মহাভারতের দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের ঐ ব্যতিক্রমী ঘটনা ছাড়া ওই মহাকাব্যে কোথাও সেভাবে নারীর অমর্যাদার ঘটনা চোখে পড়ে না বরং মহাভারতেই রয়েছে – মহামতি ভীষ্মের দ্বারা অপহৃত কাশীরাজের তিন কন্যার মধ্যে জ্যেষ্ঠ কন্যা ‘অম্বা’ ভরা রাজসভায়_সেই রাজ্যের রাজপূত্র বীরশ্রেষ্ঠ দেবব্রত ভীষ্মকে ভৎর্সনা করেছেন, তাকে challange জানাচ্ছেন, ভীষ্মের শর্তকে অগ্রাহ্য করছেন ! উপনিষদে পাওয়া যায়, বিদূষী গার্গী ঋষিশ্রেষ্ঠ যাজ্ঞবল্ককে পন্ডিতসমাজে দাঁড়িয়ে challange জানাচ্ছেন ! প্রাচীন ভারতবর্ষের নারীদের এরকমটাই মর্যাদা ছিল।৷