১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট ভারতবর্ষ স্বাধীন হল। নিজাম সরকারকে বলা হল—ইচ্ছা করলে এই রাজ্য ভারত বা পাকিস্থান-এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে অথবা স্বাধীন রাজ্য হিসাবে থাকতে পারে। নিজাম রাজ্যের যিনি প্রধান তিনি ছিলেন মুসলমান। তার ইচ্ছা ছিল এই রাজ্য পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হোক । কিন্তু ভৌগােলিক সীমানার দিক দিয়ে বিচার করলে এটা পাকিস্তান হতে অনেক দূরে। স্বাধীন রাজ্য হিসাবে চলাও এর পক্ষে মুস্কিল, কারণ চারদিক দিয়ে এটা আবদ্ধ রাজ্য। আবার মুসলিম বৈশিষ্ট্য বজায় রাখাও এর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এই রাজ্যে বসবাসকারী বেশীর ভাগ লােকই হিন্দু এবং তারা রাজনীতি সম্বন্ধে সচেতন। এর একমাত্র বিকল্প হল ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। কিন্তু নিজাম রাজ্যের প্রধানের তা ইচ্ছা নয়। তিনি স্বাধীন মুসলমান সম্রাট হয়ে থাকতে চাইলেন। এই উদ্দেশ্যে মুসলিম রাজ্য গড়ার জন্য তিনি মুসলমানের সংখ্যা বাড়াতে চাইলেন।
কাসিম রাজভি দলনেতা। তার সঙ্গে দলে দলে গুণ্ডারা যােগ দিল । এই গুণ্ডারা ভয় দেখিয়ে হিন্দুদেরকে ধর্মান্তরিত করে মুসলমান করতে চাইল। রাজাকাররা গ্রাম আক্রমণ করে ধনীদের ধন দৌলত লুণ্ঠন এবং অন্যান্য গ্রামবাসীদের নানাভাবে হয়রাণ করতে লাগল। হিন্দুদের মুখে জোর করে গাে-মাংস পুরে দিল। স্বামীর সামনে স্ত্রীর শ্লীলতাহানি করল । এইভাবে অনেক হিন্দুকে মুসলমান করা হল। রাজাকারদের ভয়ে রাজ্যের বাইরে যেতে সক্ষম ব্যক্তিরা ভারতের শহর বা গ্রামে প্রবেশ করতে লাগল। অনেক লােক বন্দী হল । কেউ কেউ তাদের ধন-দৌলত বজায় রাখার জন্য ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়ে গেল । আবার কেউ কেউ মুসলমান গুণ্ডাদের দাসত্ব গ্রহণ করল । বাড়ী ঘর দেখিয়ে দিয়ে তারা গুণ্ডাদের অর্থ সংগ্রহ করতে সাহায্য করত। এইভাবে তারা নিজেদের ধনসম্পত্তি রক্ষা করল এবং নিজেদের পরিবারের মান-সম্মান বজায় রাখার চেষ্টা করল।
গুণ্ডাদের অত্যাচার চরম সীমায় পৌছাল ৷ এমন কেউ ছিল না যে এই অত্যাচার বন্ধ করতে পারত। এই তাণ্ডব উপজাতি অধ্যুষিত গ্রামকেও বাদ দিল না।
মুসলমানদের ধারণা ছিল উপজাতিদের কোন ধর্ম নেই। হেমেনডরফও এই ধারণা পােষণ করতেন। তিনি কৃত্রিম ভালবাসার লােভ দেখিয়ে তাদের খ্রীষ্টান করতে চেয়েছিলেন। তিনি এক সময় স্বামীজীর ( স্বামী বাউলানন্দের) নিকট মন্তব্য করেছিলেন যে, এই সব লােকের মধ্যে কোন কৃতজ্ঞতা নেই। স্বামীজী এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন, “কারও নিকট হতে কৃতজ্ঞতা পাওয়ার অাশা করা ভুল। যারা ভাল কাজ করে তারা সেই কাজের মধ্যে আনন্দ পায়, তাই কর্মফলের অাশা করবেন না। মেঘের কাজ হল বর্ষণ করা। যে সমস্ত স্থান এই জল সিক্ত হল, তাদের কৃতজ্ঞতার জন্য মেঘ কখনই অপেক্ষা করে না—বর্ষণ করেই যায় । কেবল তাই নয়, এই গিরিজানরা অনভিজ্ঞ মানুষ । কৃতজ্ঞতার মত অনুভূতি এদের মধ্যে আসতে সময় লাগবে।” (ক্রমশঃ)