গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ বনগ্রাম আশ্রমে বা অন্যত্র যে সমস্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন – সেই সমস্ত কথাই এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা আগের দিন আলোচনা করছিলাম গুরুমহারাজের বলা মূল চারটি জীবনাদর্শের অর্থাৎ সত্য, ত্যাগ, প্রেম ও শান্তির কথা ! সেইসব কথা বলতে গিয়ে আমরা এসে পৌঁছেছিলাম ‘প্রেম’ বিষয়ক আলোচনায় ! প্রকৃতপক্ষে আমরা সাধারন মানুষেরা যেটাকে ‘প্রেম’ বলে জানি, বৈষ্ণব মহাজন বর্ণিত প্রেম কিন্তু তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ! সেই অর্থে – সাধারণ মানুষেরা কখনোই ‘প্রকৃত প্রেমের’ সন্ধান পায় না বা সেই সম্বন্ধে কোনো ধারণাও করতে পারে না !
এ কথা কেন বলা হলো, সেই সম্বন্ধেই এখন আলোচনা করা যাক্ ! বৈষ্ণবশাস্ত্রে রয়েছে – কাম ও প্রেমের তুলনার কথা ! আত্মেন্দ্রিয় প্রীতিজনিত যা কিছু যাচ্ঞা – তাই কাম এবং কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি জনিত যে যাচ্ঞা – তাকে বলা হয়েছে প্রেম। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, আমরা সাধারন মানুষেরা এই জগতে যা কিছু যাচ্ঞা করি – সেগুলি যেহেতু আত্মসুখের নিমিত্ত_ সুতরাং অবশ্যই তার কোনোটাই ‘প্রেম’ পদবাচ্য নয় ! আমরা ভাবি, আমাদের অর্থের প্রতি প্রেম রয়েছে, বিষয়ের প্রতি প্রেম রয়েছে, নর হলে নারীর প্রতি বা নারী হলে নরের প্রতি প্রেম রয়েছে – কিন্তু এগুলো সবই ভুল ! এগুলো কোনটাই প্রকৃত অর্থে ‘প্রেম’ নয়। এগুলি মায়াজনিত, মোহজনিত, কামজনিত যাচ্ঞা !
বৈষ্ণবশাস্ত্র অনুযায়ী অনিত্যের প্রতি মোহ-ই কাম, আর শাশ্বত নিত্যের প্রতি যে নিত্য আকর্ষণ তাই প্রেম ! অর্থ, নারী বা পুরুষ, বিষয় ইত্যাদি সবকিছুই অনিত্য বা বিনাশশীল – সুতরাং এইগুলির প্রতি আকর্ষণও নিত্য নয় – তা ক্ষণিক, তা পরিবর্তনশীল। এইজন্যেই আমাদের এই যাচ্ঞা বা আকর্ষণ প্রতিনিয়ত বদলে বদলে যায় ! এই জগত সংসারে একমাত্র ঈশ্বরই নিত্য বস্তু – তাই নিত্যের প্রতি বা ঈশ্বরের প্রতি যে আকর্ষণ তার কোনো পরিবর্তন হয় না। সেইজন্য ঈশ্বর-প্রেম‌ই যথার্থ প্রেম। ‘আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা’–বলতে নিজের ইন্দ্রিয়াদির চরিতার্থ পূরণ ! রূপের প্রতি আকর্ষণ বা তৃষ্ণা, বিষয়তৃষ্ণা, রসতৃষ্ণা, সংগীত-নৃত্য ইত্যাদি কলাবিদ্যার প্রতি আকর্ষণ বা তৃষ্ণা, তাছাড়া সর্বোপরি নর-নারীর দৈহিক মিলনের প্রতি আকর্ষণ – এর কোনোটাই আর যাই হোক ‘প্রেম’ হোতেই পারে না !
কমবয়সী ছেলেমেয়েরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি যে তীব্র আকর্ষণ অনুভব করে – সেটা ‘প্রেম’ নয়, শুধুমাত্র চিরন্তন প্রাকৃতিক জৈব একটা নিয়মের প্রতি আকর্ষণ, যা বাঁচা বা বাড়ার ধর্ম বা বংশবিস্তারের ধর্ম ছাড়া আর কিছুই নয় ! কমবয়সী ছেলেমেয়েরা এটা বুঝতে পারে না_তাদের বয়সের দোষে ! কিন্তু একটু বেশি বয়স হলেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই এর সত্যতা বুঝতে পারে। নারী-পুরুষের সম্পর্ক যদি চিরন্তন প্রেমের সম্পর্কই হোত – তাহলে এই জগতের প্রতিটি নারী-পুরুষের তথাকথিত ভালোবাসা __রাধাকৃষ্ণের অমর প্রেমকাহিনীর মর্যাদা পেতো ! কিন্তু তা পায় কি ? _ পায় না ! প্রতিটি দম্পতির প্রথম জীবনের ভালবাসা-পূর্ণ সম্পর্ক, একে অপরের অদর্শনে পাগলপারা ভাব, একে অপরের অভাবে বাঁচতে না পারার অবস্থা __কি বিবাহের দু-পাঁচ বছর পরেও বজায় থাকে ? থাকে না ! তা কমতে কমতে তলানিতে পৌঁছায় – তারপর শুধুই Adjustment করে কোনক্রমে জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া !
মানুষের সম্পর্ক তো শুধু চাওয়া-পাওয়ার সম্পর্ক ! ‘চাওয়া’ অনুযায়ী ‘পাওয়া’ না হলেই “তেরে কেটে তাক্” লেগে যায় ! আর সেটা লেগেই থাকে ৷ তাই বলে কি happy-couple একেবারেই হয় না ? হয় বই কি ! মানুষের মধ্যে যারা উন্নত চেতনার হয়, তারা অল্পেই সন্তুষ্ট হয়। কপালক্রমে বা পূর্ব পূর্ব জীবনের সংস্কার অনুযায়ী এইরূপ দুটি নর-নারী যদি কাছাকাছি আসে অথবা দাম্পত্যজীবনে প্রবেশ করে – তাহলে যেহেতু তাদের পরস্পরের প্রতি চাহিদা কম – তাই তাদের জীবনে অশান্তিও অপেক্ষাকৃত কম থাকে।এইরকম couple-দের আমরা happy couple বলে থাকি(তাও প্রকৃত অর্থে নয়)। আর যাদের জীবনে এই ধরনের চাহিদা যত বেশি – তাদের জীবনে অ-সুখ এবং অশান্তি তত বেশি।
যাইহোক, এটা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়, এইসব আলোচনা থেকে আমরা এটাই বুঝতে চাইলাম যে, অল্প বয়সের ছেলেমেয়েদের যে আকর্ষণ এটা একটা আবেশ, এটা একটা নিছক চিরন্তন জৈবিক আকর্ষণ (যার প্রকৃত উদ্দেশ্য বংশবিস্তার)– ছাড়া আর কিছুই নয় !
আমরা শুনেছিলাম প্রকৃত ‘প্রেমের’ স্বাদ একমাত্র দিতে পারেন ঈশ্বরের অবতারেরা এবং খানিকটা অন্যান্য মহাত্মা-মহাপুরুষেরা ! চৈতন্য মহাপ্রভুর সময়ের ইতিহাস থেকে পাওয়া যায় যে, মহাপ্রভুর ‘অকৈতব প্রেম’ শুধুমাত্র স্পর্শ দ্বারাই হতো_ তাই নয়, উনি যে পথ দিয়ে হেঁটে(ছুটে) যেতেন – সেই পথের দু’ধারের যে কোনো প্রাণীরাও প্রেমোন্মত্ত হয়ে নৃত্য করতো, উদ্ভিদেরাও রোমাঞ্চিত হয়ে থাকতো ! এছাড়াও আমরা জানি, কোনো অবতার পুরুষের কাছে সহস্র সহস্র নরনারী পাগলের মতো ছুটে ছুটে যায় (সাধারণ নর-নারীর তথাকথিত প্রেমে একটা নারীর টানে সাধারণত একজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষের টানে একটা নারী ছুটে ছুটে যায়)। এও দেখা যায় যে, তারা ঘর-সংসার, স্ত্রী-পুত্রাদির আকর্ষণ (নারীর ক্ষেত্রে উল্টোটা) উপেক্ষা করে, আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি, সামাজিক মান-মর্যাদা অগ্রাহ্য করেই মহাপুরুষের কাছে যেতে চায় ! এই যে আকর্ষণ বা টান – এটা কিসের টান ? এটাই সেই “প্রকৃত প্রেম” বা “অপার্থিব প্রেম”-এর টান ! অপরপক্ষে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ভালবাসা বা তথাকথিত প্রেম হোল নিতান্তই “পার্থিব প্রেম”! যা ক্ষণস্থায়ী, কখনোই চিরস্থায়ী নয়!(ক্রমশঃ)