গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের বলা কথা নিয়ে এখানে আলোচনা হচ্ছিলো ! উনি বলেছিলেন – নর-নারীর যে পার্থিব ‘প্রেম’ – এটা বৈষ্ণব শাস্ত্রোক্ত “অপ্রাকৃত প্রেম”– এর থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। পার্থিব ‘প্রেম’ আসে কাম ও কামনা থেকে ৷ নর-নারীর ভালবাসা সম্বন্ধে গুরুজী বলেছিলেন – এটিকে ‘প্রীতি’ বলা যায়৷ এই প্রীতি আবার তিনপ্রকার – সঙ্গজ প্রীতি, গুণজ প্রীতি এবং নৈসর্গিক প্রীতি। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে নর-নারীর পার্থিব প্রেমের সূচনা হয় সঙ্গজ প্রীতির মাধ্যমে। যৌবনকালে নর এবং নারী যখনই পরস্পর পরস্পরের কাছে আসে তখনই একটা অনুরাগ তৈরী হয়৷ এই অনুরক্তি থেকেই একে অপরের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। এই আকর্ষণ তীব্র থেকে তীব্রতর হয় মিলনেচ্ছার তাগিদে ! এটি জীবের এক চিরন্তন অবশ্যম্ভাবী তাগিদ ! কারণ এর মাধ্যমেই জীব তার বংশগতির ধারাকে অব্যাহত রাখে !
মনুষ্যেতর প্রাণীরা মনপ্রধান নয় বলে _তাদের এই আকর্ষণ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মিলনের পরেই নারী-পুরুষ আবার আলাদা আলাদা হয়ে যায় (তবে অনেক পাখি বা অন্যান্য মেরুদন্ডী প্রাণীরা একে অপরের সঙ্গে সারাজীবনই থেকে যায়, ঘর বাঁধে, পরিবার সৃষ্টি করে।)। কিন্তু মানব মনপ্রধান, তাই মানুষের মনে সুখ-দুঃখের অনুভূতি, মিলনের উচ্ছ্বাস, বিরহের বেদনা – ইত্যাদি যাবতীয় মনের বিষয়-সমূহ মানুষের জীবনকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। মানুষ সুখে যেমন আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, গভীর দুঃখে, বেদনায় ঠিক ততটাই ভেঙে পড়ে। কমবয়সী বা অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি এইসব বেদনার আঘাতে অনেক সময় আত্মহত্যাও করে বসে !
নর-নারী প্রীতির আর একটি মুখ্য কারণ ‘গুণজ’! কোনো না কোনো গুণের জন্য নর বা নারী পরস্পরের প্রতি আকর্ষিত হতে পারে ! এই গুণগুলির (যেমন – গীত, বাদ্য, নৃত্য, কলা, সাহিত্য, অভিনয় – ইত্যাদি আরও অনেক কিছু হতে পারে) যে কোনো একটির প্রতি আকর্ষণ থাকলে নারী বা পুরুষের বিপরীত লিঙ্গের (সাধারণতঃ) সংশ্লিষ্ট কলাকারের প্রতি একটা প্রীতি তৈরি হয়ে যায় – এর ফলে নর-নারী একে অপরের কাছে আসতে চায়। তবে নৈসর্গিক প্রীতি — সঙ্গজ বা গুণজ প্রীতি থেকে আলাদা ! নৈসর্গিক প্রীতি মানুষকে আধ্যাত্মিক পথে নিয়ে যায়, অপরপক্ষে সঙ্গজ প্রীতি এবং গুণজ প্রীতি নর-নারীকে নানান মায়া-মোহের বাঁধনে আবদ্ধ করে ফেলে। কিন্তু আমরা যে প্রেমের কথা বলতে চাইছিলাম – সেটা হল অকৈতব প্রেম, অপার্থিব প্রেম।
রাধাকৃষ্ণের বা মহাপ্রভুর অপার্থিব প্রেমের কথা আমরা তো দেখিনি – তাই মহাজনের লিখিত ‘পদে’ _যা পাওয়া যায় তাই থেকেই ধারণাটুকু করতে পারি। কিন্তু আমরা স্বামী পরমানন্দকে দেখলাম, স্বচক্ষে দেখলাম সেই পরম প্রেমিককে! যে তত্ত্ব একদিন রাম রূপে, কৃষ্ণ রূপে, প্রেমাবতার মহাপ্রভু রূপে অথবা দক্ষিণেশ্বরের ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ রূপে লীলা করেছিলেন – সেই একই তত্ত্ব স্বামী পরমানন্দ রূপে এবার বর্ধমানের বনগ্রামে লীলা করে গেলেন!! সেই একই মোহনবাঁশি(অপার্থিব আকর্ষণ), সেই একই মধুর হাসি, সেই একই প্রেমের দুর্নিবার টান – সেই একইভাবে অসংখ্য মানুষের ছুটে ছুটে তাঁর কাছে আসা !
পার্থিব যে সমস্ত বিষয়ের (অর্থ-সম্পত্তি, স্ত্রী-পুত্র-পরিবার ইত্যাদি) জন্য মানুষ পাগল, যে পার্থিব বিষয়গুলিতে মানুষ পার্থিব প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খায় – পরমানন্দের অপার্থিব প্রেমের আকর্ষণে ওই সমস্ত পার্থিব প্রেম তুচ্ছ হয়ে যেতে দেখেছি আমরা! হয়তো আপনারা বলতে পারেন – তা তো সাময়িক, সেই প্রেমে তো আমরা হাজার হাজার ভক্তরা তো একেবারে পাগল/পাগলিনী হইনি !__ না হই নি ! কোনো কালে, কোনো যুগেই এটা হয় না !ব্রজের গোপীনীরাও শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুরেই মাতাল হয়ে ছুটে যেত কুঞ্জবনে। কুঞ্জলীলা, জলকেলিলীলা, রাসলীলা এসব মিটে গেলেই তারাও কিন্তু আবার তাদের নিজ নিজ গৃহে ফিরে যেতো – যেখানে তাদের স্বামী-পুত্র-কন্যা বা পরিবার রয়েছে ! কৃষ্ণের মথুরা গমনের পরে একমাত্র রাধাই সম্পূর্ণরূপে কৃষ্ণময় হয়ে গিয়েছিলেন – এমনটা শাস্ত্রে পাওয়া যায়! বাকি ব্রজগোপ-গোপীনীরা কেউ হয়েছিল কিনা _তা কিন্তু জানা যায় না ! যদিও বা হয়, হয়তো দু-এক জন!
সুতরাং ভগবানের লীলায় এমনটাই হয়! সাধারণ মানুষ সেই অপার্থিব প্রেমের স্পর্শটুকুই পায় – যেটা আমরাও অর্থাৎ পরমানন্দ ভক্তেরা অল্পবিস্তর পেয়েছি ! দেখেছি তাঁর মহাপ্রেমিক রূপের মহিমা ! তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে নববিবাহিতা কনে’ তার বরের কথা ভুলে যেতো, নববিবাহিত বর ভুলে যেতো তার নবপরিণীতাকে ! অর্থপিপাসু ব্যবসায়ী ভুলে যেত তার ব্যবসার কথা ! ধনী ব্যক্তিরা, তাদের বাড়ির আলমারিতে কয়েক তাড়া নগদ টাকা পড়ে থাকা সত্ত্বেও – তালা দিতে ভুলে গিয়ে বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে এসে গুরুজীর পদপ্রান্তে এসে বসে থাকতো ! স্বামী পরমানন্দ-ই সকলকে সব মনে পাড়াতেন। উনিই পিতার স্নেহে সকলকে দুই-একদিন আশ্রমে কাটানোর পরই বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন। কেন পাঠাতেন ? সেটা পরের দিন ! (ক্রমশঃ)
মনুষ্যেতর প্রাণীরা মনপ্রধান নয় বলে _তাদের এই আকর্ষণ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মিলনের পরেই নারী-পুরুষ আবার আলাদা আলাদা হয়ে যায় (তবে অনেক পাখি বা অন্যান্য মেরুদন্ডী প্রাণীরা একে অপরের সঙ্গে সারাজীবনই থেকে যায়, ঘর বাঁধে, পরিবার সৃষ্টি করে।)। কিন্তু মানব মনপ্রধান, তাই মানুষের মনে সুখ-দুঃখের অনুভূতি, মিলনের উচ্ছ্বাস, বিরহের বেদনা – ইত্যাদি যাবতীয় মনের বিষয়-সমূহ মানুষের জীবনকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। মানুষ সুখে যেমন আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, গভীর দুঃখে, বেদনায় ঠিক ততটাই ভেঙে পড়ে। কমবয়সী বা অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি এইসব বেদনার আঘাতে অনেক সময় আত্মহত্যাও করে বসে !
নর-নারী প্রীতির আর একটি মুখ্য কারণ ‘গুণজ’! কোনো না কোনো গুণের জন্য নর বা নারী পরস্পরের প্রতি আকর্ষিত হতে পারে ! এই গুণগুলির (যেমন – গীত, বাদ্য, নৃত্য, কলা, সাহিত্য, অভিনয় – ইত্যাদি আরও অনেক কিছু হতে পারে) যে কোনো একটির প্রতি আকর্ষণ থাকলে নারী বা পুরুষের বিপরীত লিঙ্গের (সাধারণতঃ) সংশ্লিষ্ট কলাকারের প্রতি একটা প্রীতি তৈরি হয়ে যায় – এর ফলে নর-নারী একে অপরের কাছে আসতে চায়। তবে নৈসর্গিক প্রীতি — সঙ্গজ বা গুণজ প্রীতি থেকে আলাদা ! নৈসর্গিক প্রীতি মানুষকে আধ্যাত্মিক পথে নিয়ে যায়, অপরপক্ষে সঙ্গজ প্রীতি এবং গুণজ প্রীতি নর-নারীকে নানান মায়া-মোহের বাঁধনে আবদ্ধ করে ফেলে। কিন্তু আমরা যে প্রেমের কথা বলতে চাইছিলাম – সেটা হল অকৈতব প্রেম, অপার্থিব প্রেম।
রাধাকৃষ্ণের বা মহাপ্রভুর অপার্থিব প্রেমের কথা আমরা তো দেখিনি – তাই মহাজনের লিখিত ‘পদে’ _যা পাওয়া যায় তাই থেকেই ধারণাটুকু করতে পারি। কিন্তু আমরা স্বামী পরমানন্দকে দেখলাম, স্বচক্ষে দেখলাম সেই পরম প্রেমিককে! যে তত্ত্ব একদিন রাম রূপে, কৃষ্ণ রূপে, প্রেমাবতার মহাপ্রভু রূপে অথবা দক্ষিণেশ্বরের ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ রূপে লীলা করেছিলেন – সেই একই তত্ত্ব স্বামী পরমানন্দ রূপে এবার বর্ধমানের বনগ্রামে লীলা করে গেলেন!! সেই একই মোহনবাঁশি(অপার্থিব আকর্ষণ), সেই একই মধুর হাসি, সেই একই প্রেমের দুর্নিবার টান – সেই একইভাবে অসংখ্য মানুষের ছুটে ছুটে তাঁর কাছে আসা !
পার্থিব যে সমস্ত বিষয়ের (অর্থ-সম্পত্তি, স্ত্রী-পুত্র-পরিবার ইত্যাদি) জন্য মানুষ পাগল, যে পার্থিব বিষয়গুলিতে মানুষ পার্থিব প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খায় – পরমানন্দের অপার্থিব প্রেমের আকর্ষণে ওই সমস্ত পার্থিব প্রেম তুচ্ছ হয়ে যেতে দেখেছি আমরা! হয়তো আপনারা বলতে পারেন – তা তো সাময়িক, সেই প্রেমে তো আমরা হাজার হাজার ভক্তরা তো একেবারে পাগল/পাগলিনী হইনি !__ না হই নি ! কোনো কালে, কোনো যুগেই এটা হয় না !ব্রজের গোপীনীরাও শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুরেই মাতাল হয়ে ছুটে যেত কুঞ্জবনে। কুঞ্জলীলা, জলকেলিলীলা, রাসলীলা এসব মিটে গেলেই তারাও কিন্তু আবার তাদের নিজ নিজ গৃহে ফিরে যেতো – যেখানে তাদের স্বামী-পুত্র-কন্যা বা পরিবার রয়েছে ! কৃষ্ণের মথুরা গমনের পরে একমাত্র রাধাই সম্পূর্ণরূপে কৃষ্ণময় হয়ে গিয়েছিলেন – এমনটা শাস্ত্রে পাওয়া যায়! বাকি ব্রজগোপ-গোপীনীরা কেউ হয়েছিল কিনা _তা কিন্তু জানা যায় না ! যদিও বা হয়, হয়তো দু-এক জন!
সুতরাং ভগবানের লীলায় এমনটাই হয়! সাধারণ মানুষ সেই অপার্থিব প্রেমের স্পর্শটুকুই পায় – যেটা আমরাও অর্থাৎ পরমানন্দ ভক্তেরা অল্পবিস্তর পেয়েছি ! দেখেছি তাঁর মহাপ্রেমিক রূপের মহিমা ! তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে নববিবাহিতা কনে’ তার বরের কথা ভুলে যেতো, নববিবাহিত বর ভুলে যেতো তার নবপরিণীতাকে ! অর্থপিপাসু ব্যবসায়ী ভুলে যেত তার ব্যবসার কথা ! ধনী ব্যক্তিরা, তাদের বাড়ির আলমারিতে কয়েক তাড়া নগদ টাকা পড়ে থাকা সত্ত্বেও – তালা দিতে ভুলে গিয়ে বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে এসে গুরুজীর পদপ্রান্তে এসে বসে থাকতো ! স্বামী পরমানন্দ-ই সকলকে সব মনে পাড়াতেন। উনিই পিতার স্নেহে সকলকে দুই-একদিন আশ্রমে কাটানোর পরই বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন। কেন পাঠাতেন ? সেটা পরের দিন ! (ক্রমশঃ)
