গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের বলা কথা এবং তাঁর অপার্থিব প্রেম সংক্রান্ত কথাই এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো ! গুরুমহারাজ স্বয়ং ছিলেন মূর্তিমান প্রেমস্বরূপ ! তাঁর নয়নে একবার নয়ন দিতে পারলেই অতি বড় পাষণ্ডও গলে যেতে বাধ্য হোতো। প্রথমদিকে আশ্রমে কম দুষ্কৃতীরা আসে নি ! নানাভাবে তারা আশ্রম প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে নানারকম অসুবিধার সৃষ্টি করেছিল ! কিন্তু করুণাময় ভগবান পরমানন্দ ধীরে ধীরে তাদেরকে ঠিক বশীভূত করে নিয়েছিলেন।
আমাদের আগের আলোচনাও ছিল গুরুমহারাজের অপার্থিব প্রেম বিষয়েই। আমরা জিজ্ঞাসা তুলেছিলাম যে, সেই অপরূপ মানুষটি, সেই অপার্থিব প্রেমসম্পন্ন মানুষটির সান্নিধ্যে এসেও আমরা সহস্র সহস্র ব্যক্তিরা (যাঁরা গুরুমহারাজের কাছে আসার সুযোগ পেয়েছিলাম।) কেন সবাই পরমানন্দ সাগরে মিশে যেতে পারলাম না – কেন আমরা আবার সেই রূপ-রস-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শের বাঁধনে আটকা পড়ে গেলাম। আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো তাঁকে দেখে, তাঁর সান্নিধ্যে এসে গৃহ-সংসার ছেড়ে তাঁর পাকাপাকি কাছে চলে আসতে পেরেছিল – কিন্তু তাই বলে কি তারাও সবাই এক একটা পরমানন্দ হয়ে উঠতে পেরেছিল (যেটা গুরুমহারাজ খুবই বলতেন – ” আমি চাই তোরা প্রত্যেকে এক-একটা পরমানন্দ হয়ে ওঠ!”)? না – তা পারে নি। আর পরমানন্দ হয়ে ওঠা যায়ও না ! এটা পূর্ব পূর্ব মহাপুরুষদের ইতিহাস দেখলেই বোঝাও যায় ! ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, ভগবান রাম, ভগবান শ্রীচৈতন্য, ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ – এক এক যুগে ওই একজনই !
একই আকাশে তো দুটো সূর্য একসাথে প্রকাশিত হয় না ! এই মহাবিশ্বের অন্য কোনো সৌরমণ্ডলের কোনো গ্রহে এমনটা হওয়া সম্ভব হলেও পৃথিবী গ্রহে সেটা সম্ভব নয় ! এমনটা যদি কখনও হয় – তাহলে সেটা শেষের দিন। পৃথিবী গ্রহের বিলয়ের দিন বা মহাপ্রলয়ের দিন !
আমরা আগের দিনে আলোচনা করছিলাম গুরুমহারাজ নিজেই তাঁর অধিকাংশ ভক্তদেরকে – তাদের বাড়ির কথা মনে পাড়িয়ে তাদের বাড়ি পাঠাতেন ! কিন্তু সেটাই বা কেন ? উনি তো ইচ্ছা করলেই সকলের অন্তরে বৈরাগ্যের সঞ্চার ঘটিয়ে সকলকেই সন্ন্যাসী করে দিতে পারতেন – সবার চৈতন্যের উদয় ঘটিয়ে সকলকেই ভব-পারাবার থেকে মুক্ত করে দিতে পারতেন ! কিন্তু এমনটা তিনি কেন করলেন না ?
তিনি এমনটা করতে চান না বলেই করলেন না ! তিনি যে করতে পারেন না, তা নয় – কিন্তু তিনি এমনটা করতে চান না ! কেন চান না ? তার কারণ – মা মহামায়ার পাতা এই সংসাররূপ খেলা এখনো বহুদিন চলুক – এটাই তিনি চান !
এটাই তো সৃষ্টি ও স্থিতির রহস্য ! সেই এক ব্রহ্ম অস্ফুট অবস্থায় ছিল। সেখান থেকে প্রথমে “মহতী ইচ্ছা”-র সৃষ্টি হয়েছিল, যে ইচ্ছাটি ছিল – “আমি বহু হইব।” বহু হবার সাধটিই বা কেন ? আস্বাদনের নিমিত্ত ! একা একা আস্বাদন হয় না – কোনো কিছু আস্বাদন করতে হলে বহুর প্রয়োজন হয়। এক থেকে দুই, আর দুই থেকে বহু ! সেই মহতী ইচ্ছা থেকেই এই জগৎ-সংসারের সৃষ্টি এবং সৃষ্টির বিস্তার ! বিস্তার-ই ‘বিষ্ণু’ ! ভারতীয় শাস্ত্রে বলা হয়েছে সৃষ্টি, স্থিতি এবং শেষে প্রলয় ! সৃষ্টির দেবতা ব্রহ্মা, স্থিতির দেবতা বিষ্ণু, লয় বা প্রলয়ের দেবতা সংহারকর্তা রুদ্র ! রুদ্রকে আবার শিবও বলা হয়েছে ! শিব মানে শান্ত, কল্যাণকারী ! এটা শুনে মনে একটু ধন্দ সৃষ্টি হতেই পারে – কিন্তু ধন্দের কিছুই নাই ! এক থেকেই ওই তিন তত্ত্ব, আবার তিন তত্ত্বের মিলনেই এক তত্ত্ব ! যা ছিল, যা আছে – আবার যা থাকবে অর্থাৎ অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ এই তিনটিকে নিয়েই তো কাল, যাকে বিজ্ঞানীরা 4th dimention বলে ব্যাখ্যা করেছে।
কিন্তু যখন সৃষ্টি হয়নি – সৃষ্টি অস্ফুট অবস্থায় ছিল (big-bang-এর আগে) – তখন তো dimensionless অবস্থা ! তখন time-ও নাই, space-ও নাই ! Time এলেই space আসবে, space এলেই time-এর প্রয়োজনীয়তা !
যাইহোক, গুরুমহারাজের কথা যেটা বলা হচ্ছিলো – গুরুমহারাজ স্বয়ং ভগবান – কালাকালের কর্তা ! মহামায়ার স্বামী ! তাই তিনি জানেন তাঁর এই সৃষ্টির স্থায়িত্ব কত কাল ! কতদিন ধরে এবং কতরকমভাবে এই সৃষ্টিকে বজায় রাখতে হবে, বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তাইতো তিনি allow করেন __যে মানুষ যেভাবে থাকতে চায়, উনি তাকে সেইভাবেই রেখে দিতে চান। আর সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কুকর্ম-সুকর্ম-অকর্ম-বিকর্ম ইত্যাদি সবকিছুর মধ্য থেকে তিনি আনন্দের আস্বাদ গ্রহণ করেন ! যথার্থ অর্থে – তিনিই তো ভোগ করেন! আর যথার্থ ভোগের কৌশলটি তিনি জানেন বলেই তো তিনি ভগবান !!