গুরুমহারাজ শ্রী শ্রী পরমানন্দ স্বামীর বলা কথা নিয়ে এখানে আলোচনা হচ্ছিলো। আমরা আগের দিন নেপালের মৎস্যপুছ্ এলাকার একজন বৃদ্ধ সাধুর জীবনের বিড়ম্বনার কাহিনী বর্ণনা করছিলাম। ঐ বৃদ্ধ শৈব সাধুটি যোগসাধনা করতে করতে বিভিন্ন সিদ্ধি অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্ত্তীতে তাঁর সাধনশক্তি নিয়ে experiment করতে গিয়ে অপ্সরা-সিদ্ধিতে এমনভাবে ফেঁসে গিয়েছিলেন যে, তিনি সেই সিদ্ধি থেকে আর চেষ্টা করেও বেরোতে পারছিলেন না। এদিকে তাঁর পূর্ব পূর্ব সাধনশক্তিও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, ফলে তিনি জীবনের অন্তিম দ্বারপ্রান্তে এসে একজন সাধারণ পরানুগৃহিত(অপ্সারাটির অধীন) মানুষের ন্যায় জীবন-যাপন করছিলেন ! হিমালয়ের ঐ অঞ্চলের সাধুরাও তাঁকে প্রায় ব্রাত্য করে রেখেছিল, শেষের দিকে বড় একটা কেউ ওনার আশ্রমে আর যেতেও চাইতো না। এককথায় সাধুটি শেষ বয়সে ঐ অপ্সরার কবলে পড়ে শুধু ঐ সিদ্ধিটি ছাড়া প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিলেন।
এখানে দুটো ব্যাপার একটু আশ্চর্য্যজনক, প্রথমটা হোল _ঐ বৃদ্ধ সাধুটিকে সর্বস্বান্ত (সমগ্র জীবনের সাধন-শক্তি রূপ মহাধন হরণ, লোকমান্যতা নষ্ট ইত্যাদি) করেও ঐ অপ্সরা-মা কিন্তু সাধুটিকে ত্যাগ করেনি। আর দ্বিতীয়ত – সাধুটি যৌবনকালে এই সিদ্ধি অর্জন করেছিলেন, কালের নিয়মে সাধুটি বৃদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু ঐ আপ্সরা মা-টি প্রথমে যেমন তরুণী-যুবতী-লাবণ্যময়ী অবস্থায় ছিলেন – ৩০/৪০ বছর পরেও অবিকল ঠিক একই চেহারায় বিরাজমানা ছিলেন।
সাধুটি ঐ সিদ্ধি অর্জন করার বেশ কয়েক বছর ধরে তাঁর এই অলৌকিক সিদ্ধি প্রদর্শন করে হিমালয়ের সাধুসমাজে বেশ আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলেন। প্রথম প্রথম বহু সাধু-সন্ত, ব্রহ্মচারীরা এই অলৌকিক ঘটনা স্বচক্ষে একটিবার দেখার জন্য ঐ আশ্রমে ভিড় জমাতো। অপ্সরা-মা তার সিদ্ধি প্রয়োগ করে সবার জন্য গরম-গরম টাটকা খাদ্য-পানীয় পরিবেশন করে তাঁদেরকে দারুণভাবে আপ্যায়ন করতো ! সাধুরাও এটা enjoy কোরতো। এইভাবে বেশ কিছুদিন চলার পর এই ব্যাপারটায় ভাটা এসে গেল। আর বড় একটা লোকজন ওই সাধুর আশ্রমে আসতো না। সিনিয়র সাধুরা যাঁরা ওখানে আসতেন তাঁরা এই ব্যাপারটাকে খুবই গর্হিত কাজ বলে ব্যাখ্যা করতেন। এই ব্যাপারটা ওই সাধুটিও বেশ বুঝতে পারছিলেন। আর যখন থেকে এটা তিনি বুঝলেন, তখন থেকেই শুরু হলো তাঁর আত্মগ্লানি ! উনি নিজের মনে মনেই বলতেন – ” হায় – হায়, আমি কি ভুল করেছি ! কি করে আমি এর হাত থেকে মুক্ত হবো !”
কিন্তু ওই সাধুটি কিছুতেই মুক্তি পাচ্ছিলেন না। অপ্সরা মা-টি তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল। তাহলে সাধুটির তখন আর কি করার থাকে – একমাত্র গতি সেই “অগতির গতি”! সাধুটি চোখের জলে তার ইষ্ট, তার আরাধ্য শিবজীর কাছে চোখের জল ফেলে একান্তভাবে নিবেদন করতেন, যাতে এই সিদ্ধির হাত থেকে তিনি মুক্তি পান ! তাঁর দীর্ঘদিনের এই আকুল প্রার্থনায় কাজ হয়েছিল ! সাক্ষাৎ শিবরূপী বালক রবীন(গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ) স্বয়ং সশরীরে একদিন গিয়ে হাজির হয়েছিলেন ঐ সাধুটির কুটিরে !
তখন গুরু মহারাজের ছোট বয়স। একজন নাথযোগীর সঙ্গে তখন উনি হিমালয়ের নেপাল সংলগ্ন এলাকা ঘুরছিলেন। দীর্ঘদিন পাহাড়-পর্বতে ঘোরার ফলে, ভালো খাওয়া হয়নি। ওই নাথযোগীটিই একদিন গুরুজীকে বলেছিলেন – ” চলো তোমাকে অপ্সরা দেখিয়ে নিয়ে আসি, আর ওখানে ভালো কিছু খেয়ে আসি!” এই কথা বলে ওই নাথযোগীটি বালক গুরুজীকে বৃদ্ধ সাধুটির কুটিরে নিয়ে যান। বহুদিন পরে দুজন অতিথিকে পেয়ে বৃদ্ধ সাধুটি খুব খুশি। উনি কুটিরের বাইরেই বসেছিলেন – ওখান থেকেই উনি অতিথিদের অভ্যর্থনা জানালেন এবং অপ্সরা মা-কে পাদ্যঅর্ঘ্য দেবার জন্য বা কিছু জলযোগের ব্যবস্থা করার জন্য আহ্বান জানালেন। কিন্তু কি আশ্চর্য ! এই প্রথম অপ্সরা-মা বৃদ্ধ সাধুটির কথার মর্যাদা রাখলো না। বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে যাচ্ছে, বৃদ্ধ সাধুটি নবাগত অতিথিদের সামনে লজ্জায় পড়ে যাচ্ছেন ! এমন তো কখনো হয়না – তাহলে এখন হোলোটা কি ? গুরুমহারাজের সঙ্গে যাওয়া নাথযোগীটি ওই বৃদ্ধ সাধুর পূর্বপরিচিত ছিলেন। তিনি বৃদ্ধ সাধুর অনুমতি নিয়ে ভিতরে গিয়ে দেখলেন যে, অপ্সরা মা ঘরের এক কোণে ভয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছে – আর বলছে, “ওকে চলে যেতে বলো, ওকে আমি সহ্য করতে পারছি না !”
নাথযোগীটি দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে এই কথা নিবেদন করতেই – বৃদ্ধ সাধুটি খপ্ করে বালক গুরুমহারাজের শ্রীচরণ দুটি ধরে ফেললেন ! উনি বুঝে গেলেন যে, এই বালকই তাঁর ওই সিদ্ধাই-এর হাত থেকে রক্ষার একমাত্র উপায়! তিনি হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, ” আমি বুঝতে পেরেছি, আপনি বালকবেশী আমার আরাধ্য স্বয়ং দেবাদিদেব ! আপনি আমাকে রক্ষা করতেই এখানে এসেছেন ! আপনি দয়া করে আমায় এই অপ্সরার হাত থেকে মুক্ত করুন !” বৃদ্ধের এই কাতর প্রার্থনার ফল হোল কিন্তু অন্যরকম__কুটীরের ভিতর থেকে আর্তনাদ ভেসে আসতে লাগলো ! নাথযোগীটি আবার দৌড়ে ভেতরে গিয়ে দেখল যে, সেই অপূর্ব লাস্যময়ী পরমাসুন্দরী অপ্সরাটি ধীরে ধীরে জরাগ্রস্ত কালোরঙের বৃদ্ধায় রূপান্তরিত হয়েছে ! সে আবার দৌড়ে বেরিয়ে এসে এই খবর দিতেই বৃদ্ধ সাধুটি বালক গুরুজীকে আরো সুদৃঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরলেন – আরো নিবিড়ভাবে প্রার্থনা জানাতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাথযোগীটি খবর দিল যে, ঘরের মধ্যের বৃদ্ধা অপ্সরা ধীরে ধীরে ছোট হোতে হোতে কালো রঙের কাকের মতো শরীর নিয়ে আকাশমার্গ অবলম্বন করে বেরিয়ে গেল !!!! (ক্রমশঃ)