শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের মহিমা বর্ণনা করার সাধ্য সাধারণ জীবের নাই – একথা আগেই স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। তবু ‘বলা’-র জন্যেই ‘বলা’ ! আমি যখন প্রথম বনগ্রাম আশ্রমে গিয়ে গুরুমহারাজের বিভিন্ন ভাব-অবস্থার কথা শুনেছিলাম, তখন আমার ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কথাই মনে হয়েছিল! বনগ্রামের নগেন, ন’কাকা, তপিমা, অরুণা (তপিমার বোন), নগেনের কাকা রামখুড়ো, স্বপন গোস্বামী – প্রমুখ বনগ্রামের মানুষগুলোর সাথে যত বেশি বেশি আলাপ হোতে থাকলো – ততই গুরুমহারাজের অতিলৌকিক ব্যাপার সমূহের কথা জানতে পারছিলাম। আমি নগেন বা অন্য কারও কাছ থেকে যা শুনতাম, সেগুলো আবার ন’কাকার কাছে গিয়ে আর একবার যাচাই করে নিতাম ! বেশিরভাগ সময়েই ন’কাকা গুরুমহারাজের বিভিন্ন অবস্থার কথাগুলি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতেন ! অন্য সবার মুখে যা শুনেছিলাম – তার থেকেও আরও কিছু কথা যোগ করে উনি ব্যাপারটা clear করে দিতেন।
এইভাবেই গুরুমহারাজের বনগ্রামে আসার পর যে সমস্ত ভাব-সমাধির ঘটনা ঘটেছিল, আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আমার প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছিলো। তবে, ওই সব শুনে আমারও একটা ইচ্ছা ছিল যে, গুরুমহারাজের ঐরকম ভাবাবস্থা দেখার (শরীরটা খুব ভারী হয়ে গেল বা শোলার মতো হালকা ইত্যাদি) ! কিন্তু সে আশায় ছাই পড়লো, যখন গুরুমহারাজ একদিন বলে দিলেন – ” আমার এই শরীরে আর ঐসব ভাবসমাধি, সহজ সমাধি ইত্যাদি আর হবে না।” কেনো হবে না_তার ব্যাখাও দিলেন। উনি বললেন__ “যেহেতু, এই শরীরে নির্বিকল্প হয়ে গেছে – তাই আর ঐগুলি হবে না !”
ফলে আমরা আর গুরুমহারাজের শরীরকে কেন্দ্র করে ‘ভাবসমাধি’ হোক – তা চাইনি। পরে মনে হয়েছে – এমনটা স্বচক্ষে না দেখে ভালোই হয়েছে। কারণ, যেভাবে দিনের-পর-দিন গুরু মহারাজের ভক্তসংখ্যা হু-হু করে বেড়ে যাচ্ছিলো এবং গুরুমহারাজের মধ্যে ভগবানের ভাব – পুরুষোত্তম ভাবের প্রকাশ ঘটছিলো – সেই অতুলনীয় ভাবের মধ্যে ‘ভাবসমাধির বেসামাল’– অবস্থা প্রকাশিত হোতে থাকলে – ওনার বীরভাব বা ভগবৎভাবের মহিমায় হয়তো ক্ষুন্নতা আসতো ! সেটা আমাদেরও ভালো লাগতো না !
আমরা তো মনের মন্দিরে ভগবান পরমানন্দের সেই পুরুষোত্তম ভাবটাই পাকাপাকিভাবে বসিয়ে রেখেছিলাম – সেখান থেকে তাঁকে একটুও নামাই কি করে ? গুরুমহারাজের সেই সিংহবিক্রমে পদচারণা, দীপ্তভঙ্গিমায় বলা কথা, মধুর মহিমময় হাসি, পিতার স্নেহে কঠোর শাসন, মাতার মমতায় অনাবিল করুণার নির্ঝরিনী ধারায় প্রশয়দান, আর সর্বোপরি কল্পনার চোখে দেখা বৈদিক যুগের ঋষি তপোবনে উঁচু বেদীতে বসে থাকা পরমজ্ঞানে ঋদ্ধ ঋষির পরাবাক নিন্দিত মধুর কন্ঠের প্রবচন !! আহা ! কি মনোরম – কি মনোলোভা !!
এই যে আপনাদের কাছে বলতে গিয়ে সেই সব দিনের কথা স্মরণ হয়ে যাচ্ছে – তাতেই আমার মতো অনেকেরই যেন সেই স্বাদের কিঞ্চিৎমাত্র হোলেও অনুভূত হচ্ছে !
আপনারা যারা পরে আমাদের সাথী হয়েছেন – তারা যদি পুরোনো বনগ্রামের গুরুমহারাজের সান্নিধ্য-সুধা একটু হোলেও যারা পেয়েছে, তাদেরকে “গুরু মহারাজ”সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞাসা করেন – দেখবেন তারা প্রত্যেকেই ঐকথাই বলবে! ভগবানের এটাই মহিমা !
ভগবান পরমানন্দের স্থুল শরীরের “উপস্থিতি”-ই ছিল তাঁর মহিমাশক্তির প্রকাশ ! আমরা দেখেছি যখন গুরুমহারাজ বনগ্রাম আশ্রমে থাকতেন না – হয়তো উত্তরভারত বা দক্ষিণভারত সফরে যেতেন এক মাস, দু’ মাস বা তিন মাসের জন্য – তখন আশ্রমে (বনগ্রাম) গিয়ে দেখতাম, কেমন যেন সেখানে একটা বিরাট শূন্যতা বিরাজ করছে। আশ্রমে সবাই রয়েছে – ছেলেরা (অনাথ বালকেরা) রয়েছে, ব্রহ্মচারী-সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসীনীরা রয়েছেন, আশ্রমের গাছপালা, পুকুর-মাঠ-বাগান সবই রয়েছে – কিন্তু তবুও যেন ফাঁকা ! অথচ গুরুমহারাজ যতক্ষণ আশ্রমে থাকতেন – তখন কেমন যেন সবটাই পূর্ণ ! হয়তো আশ্রমে বেশি ভক্তেরা আসেনি – তবুও যেহেতু উনি স্বয়ং আশ্রমে রয়েছেন তাই সবকিছু পূর্ণ ! পূর্ণের উপস্থিতিতে সবই পূর্ণ !
এমনকি – আমাদের মতো সাধারণেরাও যখন গুরুমহারাজের সামনে বসে থাকতাম, ওনার শ্রীমুখের কথাগুলি শুনতাম – তখন আমাদের মনে হোতো – “আমরাও পূর্ণ !” পুরোটা পূর্ণ ভাবতে না পারলেও আমরা ভাবতাম – আমরাও “অনেকখানি পূর্ণ”! আমাদেরকেও যদি গুরুমহারাজ permission দেন – তাহলে আমরাও জগৎ-সংসারের বাকি মানুষদের জ্ঞানের বা সত্যের আলোকের সন্ধান দিতে পারি – আমরাও মরে যাওয়া অতৃপ্ত spirit-দেরকে মুক্তি দিয়ে দিতে পারি ! আমরা বুঝতে পারতাম দক্ষিণেশ্বরে হৃদয়ের সেই অবস্থার কথা – যেদিন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক স্পর্শ পেয়ে হৃদয়রাম হলে উঠেছিল – “ও মামা ! আমরা তো এখানকার লোক নই গো ! চলো আমরা জগৎ-উদ্ধার করি গে চলো !”
আর ১০০ বছর পরের এই নতুন শরীরে লীলাকারী ঠাকুর পরমানন্দের আলাদা করে স্পর্শ করার প্রয়োজন হয়নি – ওনার সান্নিধ্যে বসে থাকলেই আমাদের মধ্যে পূর্ণতার ভাব আসতো – মনে হোতো আমরা সবাই পৃথিবীগ্রহের সমস্ত মানুষের থেকে উন্নত ! আমরা জগৎ-জীবন এবং ঈশ্বর সম্বন্ধীয় পরম সত্যকে যতটা সহজভাবে বুঝেছি_পৃথিবীর কোনো ধর্মমতের মহা মহা সাধকেরা ও তার সন্ধান জানে না ! পৃথিবীর সমস্ত ধনী, সমস্ত জ্ঞানী, সমস্ত বিজ্ঞানী – ইত্যাদিরাও জানে না – যতটা আমরা জানি ! অবশ্য ওনার সান্নিধ্য থেকে দূরে সরে গেলেই আবার যে কে সেই!!
পরমানন্দের এই যে বিশেষ শক্তি – এটাও ছিল ভগবান পরমানন্দের মহিমা শক্তিরই প্রকাশ ! (ক্রমশঃ)
এইভাবেই গুরুমহারাজের বনগ্রামে আসার পর যে সমস্ত ভাব-সমাধির ঘটনা ঘটেছিল, আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আমার প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছিলো। তবে, ওই সব শুনে আমারও একটা ইচ্ছা ছিল যে, গুরুমহারাজের ঐরকম ভাবাবস্থা দেখার (শরীরটা খুব ভারী হয়ে গেল বা শোলার মতো হালকা ইত্যাদি) ! কিন্তু সে আশায় ছাই পড়লো, যখন গুরুমহারাজ একদিন বলে দিলেন – ” আমার এই শরীরে আর ঐসব ভাবসমাধি, সহজ সমাধি ইত্যাদি আর হবে না।” কেনো হবে না_তার ব্যাখাও দিলেন। উনি বললেন__ “যেহেতু, এই শরীরে নির্বিকল্প হয়ে গেছে – তাই আর ঐগুলি হবে না !”
ফলে আমরা আর গুরুমহারাজের শরীরকে কেন্দ্র করে ‘ভাবসমাধি’ হোক – তা চাইনি। পরে মনে হয়েছে – এমনটা স্বচক্ষে না দেখে ভালোই হয়েছে। কারণ, যেভাবে দিনের-পর-দিন গুরু মহারাজের ভক্তসংখ্যা হু-হু করে বেড়ে যাচ্ছিলো এবং গুরুমহারাজের মধ্যে ভগবানের ভাব – পুরুষোত্তম ভাবের প্রকাশ ঘটছিলো – সেই অতুলনীয় ভাবের মধ্যে ‘ভাবসমাধির বেসামাল’– অবস্থা প্রকাশিত হোতে থাকলে – ওনার বীরভাব বা ভগবৎভাবের মহিমায় হয়তো ক্ষুন্নতা আসতো ! সেটা আমাদেরও ভালো লাগতো না !
আমরা তো মনের মন্দিরে ভগবান পরমানন্দের সেই পুরুষোত্তম ভাবটাই পাকাপাকিভাবে বসিয়ে রেখেছিলাম – সেখান থেকে তাঁকে একটুও নামাই কি করে ? গুরুমহারাজের সেই সিংহবিক্রমে পদচারণা, দীপ্তভঙ্গিমায় বলা কথা, মধুর মহিমময় হাসি, পিতার স্নেহে কঠোর শাসন, মাতার মমতায় অনাবিল করুণার নির্ঝরিনী ধারায় প্রশয়দান, আর সর্বোপরি কল্পনার চোখে দেখা বৈদিক যুগের ঋষি তপোবনে উঁচু বেদীতে বসে থাকা পরমজ্ঞানে ঋদ্ধ ঋষির পরাবাক নিন্দিত মধুর কন্ঠের প্রবচন !! আহা ! কি মনোরম – কি মনোলোভা !!
এই যে আপনাদের কাছে বলতে গিয়ে সেই সব দিনের কথা স্মরণ হয়ে যাচ্ছে – তাতেই আমার মতো অনেকেরই যেন সেই স্বাদের কিঞ্চিৎমাত্র হোলেও অনুভূত হচ্ছে !
আপনারা যারা পরে আমাদের সাথী হয়েছেন – তারা যদি পুরোনো বনগ্রামের গুরুমহারাজের সান্নিধ্য-সুধা একটু হোলেও যারা পেয়েছে, তাদেরকে “গুরু মহারাজ”সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞাসা করেন – দেখবেন তারা প্রত্যেকেই ঐকথাই বলবে! ভগবানের এটাই মহিমা !
ভগবান পরমানন্দের স্থুল শরীরের “উপস্থিতি”-ই ছিল তাঁর মহিমাশক্তির প্রকাশ ! আমরা দেখেছি যখন গুরুমহারাজ বনগ্রাম আশ্রমে থাকতেন না – হয়তো উত্তরভারত বা দক্ষিণভারত সফরে যেতেন এক মাস, দু’ মাস বা তিন মাসের জন্য – তখন আশ্রমে (বনগ্রাম) গিয়ে দেখতাম, কেমন যেন সেখানে একটা বিরাট শূন্যতা বিরাজ করছে। আশ্রমে সবাই রয়েছে – ছেলেরা (অনাথ বালকেরা) রয়েছে, ব্রহ্মচারী-সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসীনীরা রয়েছেন, আশ্রমের গাছপালা, পুকুর-মাঠ-বাগান সবই রয়েছে – কিন্তু তবুও যেন ফাঁকা ! অথচ গুরুমহারাজ যতক্ষণ আশ্রমে থাকতেন – তখন কেমন যেন সবটাই পূর্ণ ! হয়তো আশ্রমে বেশি ভক্তেরা আসেনি – তবুও যেহেতু উনি স্বয়ং আশ্রমে রয়েছেন তাই সবকিছু পূর্ণ ! পূর্ণের উপস্থিতিতে সবই পূর্ণ !
এমনকি – আমাদের মতো সাধারণেরাও যখন গুরুমহারাজের সামনে বসে থাকতাম, ওনার শ্রীমুখের কথাগুলি শুনতাম – তখন আমাদের মনে হোতো – “আমরাও পূর্ণ !” পুরোটা পূর্ণ ভাবতে না পারলেও আমরা ভাবতাম – আমরাও “অনেকখানি পূর্ণ”! আমাদেরকেও যদি গুরুমহারাজ permission দেন – তাহলে আমরাও জগৎ-সংসারের বাকি মানুষদের জ্ঞানের বা সত্যের আলোকের সন্ধান দিতে পারি – আমরাও মরে যাওয়া অতৃপ্ত spirit-দেরকে মুক্তি দিয়ে দিতে পারি ! আমরা বুঝতে পারতাম দক্ষিণেশ্বরে হৃদয়ের সেই অবস্থার কথা – যেদিন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক স্পর্শ পেয়ে হৃদয়রাম হলে উঠেছিল – “ও মামা ! আমরা তো এখানকার লোক নই গো ! চলো আমরা জগৎ-উদ্ধার করি গে চলো !”
আর ১০০ বছর পরের এই নতুন শরীরে লীলাকারী ঠাকুর পরমানন্দের আলাদা করে স্পর্শ করার প্রয়োজন হয়নি – ওনার সান্নিধ্যে বসে থাকলেই আমাদের মধ্যে পূর্ণতার ভাব আসতো – মনে হোতো আমরা সবাই পৃথিবীগ্রহের সমস্ত মানুষের থেকে উন্নত ! আমরা জগৎ-জীবন এবং ঈশ্বর সম্বন্ধীয় পরম সত্যকে যতটা সহজভাবে বুঝেছি_পৃথিবীর কোনো ধর্মমতের মহা মহা সাধকেরা ও তার সন্ধান জানে না ! পৃথিবীর সমস্ত ধনী, সমস্ত জ্ঞানী, সমস্ত বিজ্ঞানী – ইত্যাদিরাও জানে না – যতটা আমরা জানি ! অবশ্য ওনার সান্নিধ্য থেকে দূরে সরে গেলেই আবার যে কে সেই!!
পরমানন্দের এই যে বিশেষ শক্তি – এটাও ছিল ভগবান পরমানন্দের মহিমা শক্তিরই প্রকাশ ! (ক্রমশঃ)
