[ আগের দিনে আমরা দেখেছিলাম, গুরু মহারাজ একজনের জিজ্ঞাসার উত্তরে বৈদিক যুগের নানা কথা, ব্রাহ্মণ্যপ্রথা থেকে সন্ন্যাসী পরম্পরার কথা_ইত্যাদি আলোচনা করছিলেন। আজ তার পরবর্ত্তী অংশ!]
যাইহোক, ব্রাহ্মণেরা যখন থেকে নীতিভ্রষ্ট হোল, তখন থেকেই শুরু হলো সন্ন্যাসী পরম্পরার ৷ বৈদিক যুগের সন্ন্যাস এখনকার মতো ছিল না । তখন ছিল চতুরাশ্রম প্রথা — ব্রহ্মচর্য , গার্হস্থ্য , বানপ্রস্থ , সন্ন্যাস । এ প্রথা আপামর জনগণ বা সমাজের সকলেই পালন করবে তা নয় । উন্নত উপযুক্ত ছাত্ররা প্রথমে গুরুকুলে গিয়ে ছাত্র হিসাবে যোগদান করতো , তারপর তাদের উপবীত-সংস্কার করে দেওয়া হোত অর্থাৎ যজ্ঞের দ্বারা এবং বিভিন্ন ক্রিয়ার মাধ্যমে ও দেহ শুদ্ধি ইত্যাদি করে উপবীত-সংস্কার বা ব্রহ্মচর্য পালনের ব্রত গ্রহণের সংকল্প করতে হোত । (তবে সব ছাত্রেরই যে এই ধরনের সংস্কার বাধ্যতামূলক ছিল_ এমনও নয় ৷)
এরপর পাঠান্তে ওই ছাত্ররা সমাজে বা সংসারে ফিরে গিয়ে বিবাহ করে গার্হস্থ্য জীবন পালন কোরতো । গুরুগৃহে ন্যুনপক্ষে দ্বাদশ বর্ষ ব্রহ্মচর্য পালনের পর বুদ্ধিদীপ্ত , জ্ঞানদীপ্ত , স্বাস্থবান , চরিত্রবান ঝকঝকে ছেলেরা যখন সংসার জীবনে ফিরে যেতো, তখন তারা কখনোই সংসারের স্রোতে হারিয়ে যেতো না – নিজেদের আপন আপন বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতো । এই ভাবেই সমাজ এক ঝাঁক শিক্ষিত , রুচিবান , স্বাস্থ্যবান , বিবেকবান যুবক যুবতীদের লাভ কোরতো ! দ্যাখো, এমন সব ছেলে মেয়ে কোথাও কোনো সমাজ যদি উপহার পায়__ তাহলে সে সমাজ তো উন্নত হবেই ! স্বাস্থ্যবান , বিবেকবান , চরিত্রবান , সুশিক্ষিত যুবক যুবতীরাই তো যে কোনো উন্নত সমাজের পরিচায়ক ।
যে যুগে , যে দেশে এই ধরনের ঝাঁক ঝাঁক মহান মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে সেই দেশেই রেনেসাঁস ঘটেছে ! আর বৈদিক যুগে বর্ষে বর্ষে ঋষি আশ্রম থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে এইরূপ যুবক-যুবতীদের আগমন ঘটতো ভারতীয় সমাজে । ফলে বুঝতেই পারছো তৎকালীন সমাজ কত উন্নত ছিল । তবে তখন দেবগুরু বৃহস্পতির শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের শিক্ষাও চালু ছিল ! ফলে সমাজে অসুর বা দৈত্য(অর্থাৎ শক্তিশালী negative শক্তি)-দের সংখ্যাও কম কিছু ছিল না !
তখনকার দিনে এখনকার মতো পুস্তকের চল ছিলনা । পুঁথি-পত্র ব্যাপারটা অনেক পরে এসেছে । ‘বেদ’ কে বলা হয়েছে শ্রুতি ৷ শুনে শুনে শিখতে হোত তাই “শ্রুতি” ৷ গুরু বলতেন – শিষ্যরা বা ছাত্ররা শুনতো । তখনকার পাঠ কেমন ছিল জানো তো ! শ্রবণ , মনন , নিদিধ্যাসন ৷ প্রতিদিন প্রত্যুষে ছাত্ররা শয্যা ত্যাগ , প্রাতকৃত্য সেরে আহ্নিক , জপ , ধ্যান , প্রার্থনাদি সেরে গুরুর কাছে পাঠ গ্রহণের উদ্দেশ্যে সমবেত হোত । গুরুদেব যেকোনো একটি সূত্র (ব্রহ্মসূত্র) অর্থাৎ একটি শ্লোক তাদের সকলকে পাঠ দিতেন , শব্দার্থও করে দিতেন ৷ এরপর বলতেন , “তোমরা এই সূত্র বা শ্লোকের কি ব্যাখ্যা হোতে পারে, তা নিজে নিজে নির্ণয় করো । যাও_ নিজ নিজ কর্তব্য কর্মে নিযুক্ত হও, আর সদা সর্বদা মনন করো ! আর শ্লোকটির অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁজে বের করো ৷” ছাত্রগণ পাঠ কক্ষ থেকে বের হয়ে তাদের উপর আশ্রম পরিচালনা যার যা দায়িত্ব অর্থাৎ কারো ঝর্ণা থেকে জল আনা , কারো যজ্ঞের কাঠ বা রন্ধনের কাঠ জোগাড় করা , কারো ফুল বেলপাতা তুলে দেবার্চনায় সহযোগিতা করা , কারো আশ্রমের ফুল বাগান বা সবজি বাগান পরিচর্যা করা – ইত্যাদি কাজে লেগে যেতো ৷ কিন্তু অন্তরে গুরুর দেওয়া পাঠের মনন চলছে , এইভাবে সারাদিন এবং রাত্রিতে ঘুম আসার আগে পর্যন্ত পুনঃ পুনঃ মনন বা নিদিধ্যাসনের ফলে প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ বুদ্ধির level- অনুযায়ী কোনো না কোনো ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে রাখতো ।
পরদিন প্রাতে পাঠশালায় গিয়ে ছাত্ররা গুরুদেবের কাছে প্রত্যেকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী নিজ নিজ ব্যাখ্যা প্রকাশ করতো । আচার্য সকলের বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শুনে কার intellect power কতখানি __সেটিও যেমন Judge করতে পারতেন , তেমনি সকলের বক্তব্য শোনার পর তিনি সবার উত্তরের সাথে নিজের ব্যাখা যোগ করে একটা Synthesis করে দিতেন ! সঠিক ভাবটি কি তা বুঝিয়ে দিতেন ! তারপর আবার নতুন পাঠ দিতেন ৷
এইভাবে প্রাক-বৈদিক যুগে মুখে মুখে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু ছিল ৷ কোনো বই খাতার প্রয়োজন ছিল না ৷
রাজ-কার্যে বা হিসাব নিকাশের জন্য সংখ্যা বা লিপির প্রয়োজন ছিল, তাই লিপি বা সংখ্যা আবিষ্কার জরুরি হয়ে পড়েছিল । লিপির বিবর্তন হয়েছিল চিত্র থেকে ৷ আদিম মানুষ প্রথমে_নতুন কোনোকিছু অপরকে বোঝাতে চিত্র এঁকে বোঝাতো! বহু প্রাচীন গুহায় এই ধরনের অঙ্কিত চিত্র পাওয়া গেছে! এই ব্যাপারটিই বিবর্তিত হয়ে লিপিতে পরিণত হয়েছে ৷ ‘ব্রাহ্মী লিপি’ আর ‘খরোষ্ঠী লিপি’-র মধ্যে পার্থক্য হয়েছিল যে কারণে, তা হচ্ছে __ব্রাহ্মী লিপিকার (আর্য)-রা সরু মুখ বিশিষ্ট কলম (হাঁসের পাখা , সরু করে ছোলা সরকাঠির কলম ইত্যাদি) ব্যবহার কোরতো, ফলে এদের লিপিগুলি সরু, সরলরেখা যুক্ত এবং একটামাত্র লাইন টেনে গোলাকার আঁকা বা বৃত্ত আঁকা সহজ । আর খরোষ্ঠী লিপিকার (দ্রাবিড়)-রা ভোঁতা বা চওড়া ছোট খোন্তার মতো কলম ব্যবহার কোরতো । ফলে লিপিগুলি নির্দিষ্ট জ্যামিতিক আকার না পেয়ে কেমন যেন একাধিক দাগবিশিষ্ট ও গোল গোল হয়ে গেছে ! সরলরেখা গুলিও সরু না হয়ে একটু মোটা এবং একাধিক হয়ে গেছে ।
যাইহোক , চতুরাশ্রমের মধ্যে ব্রহ্মচর্য , গার্হস্থ্যের কথা বলা হোল , বানপ্রস্থীদের কথাও আগে কিছুটা বলেছি ৷ বানপ্রস্থে কিন্তু সস্ত্রীক সংসার ত্যাগের কথা বলা হয়েছে ৷ অবশ্য এক্ষেত্রে স্ত্রীর ইচ্ছার উপরও জোর দেওয়া হোত । কারণ দেখা যায় যাজ্ঞবল্ক্য যখন সংসার তাঁর পুত্রদের হাতে দিয়ে বানপ্রস্থী হবার বাসনা __তাঁর দুজন স্ত্রীর কাছে ব্যক্ত করলেন , তখন তাঁদের মধ্যে মৈত্রেয়ী তাঁর সঙ্গী হলেন কিন্তু অন্যজন সংসারেই থেকে যেতে চাইলেন এবং থাকলেনও । বানপ্রস্থীরা শিক্ষাদান ছাড়াও নিজেদের অধ্যাত্ম উন্নতির জন্য ধ্যান-জপ , সাধন-ভজনের ব্যাপারেও সচেষ্ট হোতেন ৷ এইবার যখন কর্মসংস্কারও ছিন্ন হয়ে যেতো _ তখন তিনি বানপ্রস্থ আশ্রম ত্যাগ করে আরো নির্জন কোনো স্থানে আত্মজ্ঞান লাভের জন্য একনিষ্ঠ ব্রতী হয়ে যেতেন ! আর আত্মজ্ঞান লাভ করার পর অনেকে ‘ঋষি’ হিসাবে সমাজে মানব কল্যাণের নিমিত্ত কাজ করতেন ।
তবে বর্তমানের সন্ন্যাসী পরম্পরা – ভগবান বুদ্ধের পর থেকে ৷ আচার্য শঙ্কর তাঁর একটু পরিমার্জন করেছেন মাত্র । ‘সাধু’ যে কোনো মানুষই হতে পারে কিন্তু সন্ন্যাসী তারাই যাদের সম্যক রূপে ন্যাস্ হয়েছে , যিনি তার কামনা-বাসনা সম্পূর্ণরূপে জয় করেছেন ,আত্মসুখের তিলমাত্র ইচ্ছা না রেখে জগৎহিতায় নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন অর্থাৎ নিজেকে সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি-ই সন্ন্যাসী ৷ নিজেকে জ্বালিয়ে ধূপের মত পুড়ে পুড়ে পরিবেশে সুগন্ধ ছড়ানোই সন্ন্যাসীর জীবন ৷
তুমি বিবর্তনের কথা বলছিলে — কত বিবর্তন ! এখনকার জীববিজ্ঞানীরাই বলছে যে, বিবর্তনে কুড়ি লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে মানুষের সৃষ্টি বা আগমন ঘটেছিল ৷
আর বৈদিক যুগের কথা বলছো , সে তো মাত্র কয়েক হাজার বছর আগের কথা ! তার আগে কত লক্ষ বছরের বিবর্তনের ইতিহাস কি রয়েছে _বলো ? কত সভ্যতা এসেছে আবার ধ্বংস হয়ে গেছে । এখন মানব সমাজকে যেমন দেখছো __সেটাকে ধরেই বিজ্ঞানীরা বিবর্তনের ধারাকে খোঁজার চেষ্টা করছে । কিন্তু যা দেখা যাচ্ছে না – যা কালের গর্ভে লুপ্ত তার খোঁজ কে রাখবে ? তার খোঁজ রাখেন একমাত্র কালদ্রষ্টা মহামানবেরা ৷ শাস্ত্রে এই জন্যই বলা হয়েছে , “মহাজন’ যেন গতা স: পন্থা শ্রেয়:”। মহাজ্ঞানী ,মহাজন’ , কালদ্রষ্টা , মহামানবরা যা বলেন তাই সত্য ৷ এইরূপ মহাজনের পদপ্রান্তে বসে সশ্রদ্ধ জিজ্ঞাসার দ্বারা হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস জানা যায় ৷ যুগে যুগে যুগমানবরা মানব কল্যাণে শরীর ধারণ করে আসেন – কিন্তু সমকালীন মানুষেরা তাঁকে ঠিকমতো গ্রহণ করতে পারে না বরং অনেক সময় বিরোধ করে , ফলে তাঁর কাছে যা পাওয়া যেতো তা আর পাওয়া যায় না ! তাঁরা যেন সমাজের অপ্রস্তুততার কারণে, আরব্ধ কাজ অসমাপ্ত করেই চলে যান ! সেইজন্যই পরে তাঁকে আবার আসতে হয় সেই কাজগুলি সম্পন্ন করার জন্য ৷৷(ক্রমশঃ)
যাইহোক, ব্রাহ্মণেরা যখন থেকে নীতিভ্রষ্ট হোল, তখন থেকেই শুরু হলো সন্ন্যাসী পরম্পরার ৷ বৈদিক যুগের সন্ন্যাস এখনকার মতো ছিল না । তখন ছিল চতুরাশ্রম প্রথা — ব্রহ্মচর্য , গার্হস্থ্য , বানপ্রস্থ , সন্ন্যাস । এ প্রথা আপামর জনগণ বা সমাজের সকলেই পালন করবে তা নয় । উন্নত উপযুক্ত ছাত্ররা প্রথমে গুরুকুলে গিয়ে ছাত্র হিসাবে যোগদান করতো , তারপর তাদের উপবীত-সংস্কার করে দেওয়া হোত অর্থাৎ যজ্ঞের দ্বারা এবং বিভিন্ন ক্রিয়ার মাধ্যমে ও দেহ শুদ্ধি ইত্যাদি করে উপবীত-সংস্কার বা ব্রহ্মচর্য পালনের ব্রত গ্রহণের সংকল্প করতে হোত । (তবে সব ছাত্রেরই যে এই ধরনের সংস্কার বাধ্যতামূলক ছিল_ এমনও নয় ৷)
এরপর পাঠান্তে ওই ছাত্ররা সমাজে বা সংসারে ফিরে গিয়ে বিবাহ করে গার্হস্থ্য জীবন পালন কোরতো । গুরুগৃহে ন্যুনপক্ষে দ্বাদশ বর্ষ ব্রহ্মচর্য পালনের পর বুদ্ধিদীপ্ত , জ্ঞানদীপ্ত , স্বাস্থবান , চরিত্রবান ঝকঝকে ছেলেরা যখন সংসার জীবনে ফিরে যেতো, তখন তারা কখনোই সংসারের স্রোতে হারিয়ে যেতো না – নিজেদের আপন আপন বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতো । এই ভাবেই সমাজ এক ঝাঁক শিক্ষিত , রুচিবান , স্বাস্থ্যবান , বিবেকবান যুবক যুবতীদের লাভ কোরতো ! দ্যাখো, এমন সব ছেলে মেয়ে কোথাও কোনো সমাজ যদি উপহার পায়__ তাহলে সে সমাজ তো উন্নত হবেই ! স্বাস্থ্যবান , বিবেকবান , চরিত্রবান , সুশিক্ষিত যুবক যুবতীরাই তো যে কোনো উন্নত সমাজের পরিচায়ক ।
যে যুগে , যে দেশে এই ধরনের ঝাঁক ঝাঁক মহান মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে সেই দেশেই রেনেসাঁস ঘটেছে ! আর বৈদিক যুগে বর্ষে বর্ষে ঋষি আশ্রম থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে এইরূপ যুবক-যুবতীদের আগমন ঘটতো ভারতীয় সমাজে । ফলে বুঝতেই পারছো তৎকালীন সমাজ কত উন্নত ছিল । তবে তখন দেবগুরু বৃহস্পতির শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের শিক্ষাও চালু ছিল ! ফলে সমাজে অসুর বা দৈত্য(অর্থাৎ শক্তিশালী negative শক্তি)-দের সংখ্যাও কম কিছু ছিল না !
তখনকার দিনে এখনকার মতো পুস্তকের চল ছিলনা । পুঁথি-পত্র ব্যাপারটা অনেক পরে এসেছে । ‘বেদ’ কে বলা হয়েছে শ্রুতি ৷ শুনে শুনে শিখতে হোত তাই “শ্রুতি” ৷ গুরু বলতেন – শিষ্যরা বা ছাত্ররা শুনতো । তখনকার পাঠ কেমন ছিল জানো তো ! শ্রবণ , মনন , নিদিধ্যাসন ৷ প্রতিদিন প্রত্যুষে ছাত্ররা শয্যা ত্যাগ , প্রাতকৃত্য সেরে আহ্নিক , জপ , ধ্যান , প্রার্থনাদি সেরে গুরুর কাছে পাঠ গ্রহণের উদ্দেশ্যে সমবেত হোত । গুরুদেব যেকোনো একটি সূত্র (ব্রহ্মসূত্র) অর্থাৎ একটি শ্লোক তাদের সকলকে পাঠ দিতেন , শব্দার্থও করে দিতেন ৷ এরপর বলতেন , “তোমরা এই সূত্র বা শ্লোকের কি ব্যাখ্যা হোতে পারে, তা নিজে নিজে নির্ণয় করো । যাও_ নিজ নিজ কর্তব্য কর্মে নিযুক্ত হও, আর সদা সর্বদা মনন করো ! আর শ্লোকটির অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁজে বের করো ৷” ছাত্রগণ পাঠ কক্ষ থেকে বের হয়ে তাদের উপর আশ্রম পরিচালনা যার যা দায়িত্ব অর্থাৎ কারো ঝর্ণা থেকে জল আনা , কারো যজ্ঞের কাঠ বা রন্ধনের কাঠ জোগাড় করা , কারো ফুল বেলপাতা তুলে দেবার্চনায় সহযোগিতা করা , কারো আশ্রমের ফুল বাগান বা সবজি বাগান পরিচর্যা করা – ইত্যাদি কাজে লেগে যেতো ৷ কিন্তু অন্তরে গুরুর দেওয়া পাঠের মনন চলছে , এইভাবে সারাদিন এবং রাত্রিতে ঘুম আসার আগে পর্যন্ত পুনঃ পুনঃ মনন বা নিদিধ্যাসনের ফলে প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ বুদ্ধির level- অনুযায়ী কোনো না কোনো ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে রাখতো ।
পরদিন প্রাতে পাঠশালায় গিয়ে ছাত্ররা গুরুদেবের কাছে প্রত্যেকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী নিজ নিজ ব্যাখ্যা প্রকাশ করতো । আচার্য সকলের বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শুনে কার intellect power কতখানি __সেটিও যেমন Judge করতে পারতেন , তেমনি সকলের বক্তব্য শোনার পর তিনি সবার উত্তরের সাথে নিজের ব্যাখা যোগ করে একটা Synthesis করে দিতেন ! সঠিক ভাবটি কি তা বুঝিয়ে দিতেন ! তারপর আবার নতুন পাঠ দিতেন ৷
এইভাবে প্রাক-বৈদিক যুগে মুখে মুখে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু ছিল ৷ কোনো বই খাতার প্রয়োজন ছিল না ৷
রাজ-কার্যে বা হিসাব নিকাশের জন্য সংখ্যা বা লিপির প্রয়োজন ছিল, তাই লিপি বা সংখ্যা আবিষ্কার জরুরি হয়ে পড়েছিল । লিপির বিবর্তন হয়েছিল চিত্র থেকে ৷ আদিম মানুষ প্রথমে_নতুন কোনোকিছু অপরকে বোঝাতে চিত্র এঁকে বোঝাতো! বহু প্রাচীন গুহায় এই ধরনের অঙ্কিত চিত্র পাওয়া গেছে! এই ব্যাপারটিই বিবর্তিত হয়ে লিপিতে পরিণত হয়েছে ৷ ‘ব্রাহ্মী লিপি’ আর ‘খরোষ্ঠী লিপি’-র মধ্যে পার্থক্য হয়েছিল যে কারণে, তা হচ্ছে __ব্রাহ্মী লিপিকার (আর্য)-রা সরু মুখ বিশিষ্ট কলম (হাঁসের পাখা , সরু করে ছোলা সরকাঠির কলম ইত্যাদি) ব্যবহার কোরতো, ফলে এদের লিপিগুলি সরু, সরলরেখা যুক্ত এবং একটামাত্র লাইন টেনে গোলাকার আঁকা বা বৃত্ত আঁকা সহজ । আর খরোষ্ঠী লিপিকার (দ্রাবিড়)-রা ভোঁতা বা চওড়া ছোট খোন্তার মতো কলম ব্যবহার কোরতো । ফলে লিপিগুলি নির্দিষ্ট জ্যামিতিক আকার না পেয়ে কেমন যেন একাধিক দাগবিশিষ্ট ও গোল গোল হয়ে গেছে ! সরলরেখা গুলিও সরু না হয়ে একটু মোটা এবং একাধিক হয়ে গেছে ।
যাইহোক , চতুরাশ্রমের মধ্যে ব্রহ্মচর্য , গার্হস্থ্যের কথা বলা হোল , বানপ্রস্থীদের কথাও আগে কিছুটা বলেছি ৷ বানপ্রস্থে কিন্তু সস্ত্রীক সংসার ত্যাগের কথা বলা হয়েছে ৷ অবশ্য এক্ষেত্রে স্ত্রীর ইচ্ছার উপরও জোর দেওয়া হোত । কারণ দেখা যায় যাজ্ঞবল্ক্য যখন সংসার তাঁর পুত্রদের হাতে দিয়ে বানপ্রস্থী হবার বাসনা __তাঁর দুজন স্ত্রীর কাছে ব্যক্ত করলেন , তখন তাঁদের মধ্যে মৈত্রেয়ী তাঁর সঙ্গী হলেন কিন্তু অন্যজন সংসারেই থেকে যেতে চাইলেন এবং থাকলেনও । বানপ্রস্থীরা শিক্ষাদান ছাড়াও নিজেদের অধ্যাত্ম উন্নতির জন্য ধ্যান-জপ , সাধন-ভজনের ব্যাপারেও সচেষ্ট হোতেন ৷ এইবার যখন কর্মসংস্কারও ছিন্ন হয়ে যেতো _ তখন তিনি বানপ্রস্থ আশ্রম ত্যাগ করে আরো নির্জন কোনো স্থানে আত্মজ্ঞান লাভের জন্য একনিষ্ঠ ব্রতী হয়ে যেতেন ! আর আত্মজ্ঞান লাভ করার পর অনেকে ‘ঋষি’ হিসাবে সমাজে মানব কল্যাণের নিমিত্ত কাজ করতেন ।
তবে বর্তমানের সন্ন্যাসী পরম্পরা – ভগবান বুদ্ধের পর থেকে ৷ আচার্য শঙ্কর তাঁর একটু পরিমার্জন করেছেন মাত্র । ‘সাধু’ যে কোনো মানুষই হতে পারে কিন্তু সন্ন্যাসী তারাই যাদের সম্যক রূপে ন্যাস্ হয়েছে , যিনি তার কামনা-বাসনা সম্পূর্ণরূপে জয় করেছেন ,আত্মসুখের তিলমাত্র ইচ্ছা না রেখে জগৎহিতায় নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন অর্থাৎ নিজেকে সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি-ই সন্ন্যাসী ৷ নিজেকে জ্বালিয়ে ধূপের মত পুড়ে পুড়ে পরিবেশে সুগন্ধ ছড়ানোই সন্ন্যাসীর জীবন ৷
তুমি বিবর্তনের কথা বলছিলে — কত বিবর্তন ! এখনকার জীববিজ্ঞানীরাই বলছে যে, বিবর্তনে কুড়ি লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে মানুষের সৃষ্টি বা আগমন ঘটেছিল ৷
আর বৈদিক যুগের কথা বলছো , সে তো মাত্র কয়েক হাজার বছর আগের কথা ! তার আগে কত লক্ষ বছরের বিবর্তনের ইতিহাস কি রয়েছে _বলো ? কত সভ্যতা এসেছে আবার ধ্বংস হয়ে গেছে । এখন মানব সমাজকে যেমন দেখছো __সেটাকে ধরেই বিজ্ঞানীরা বিবর্তনের ধারাকে খোঁজার চেষ্টা করছে । কিন্তু যা দেখা যাচ্ছে না – যা কালের গর্ভে লুপ্ত তার খোঁজ কে রাখবে ? তার খোঁজ রাখেন একমাত্র কালদ্রষ্টা মহামানবেরা ৷ শাস্ত্রে এই জন্যই বলা হয়েছে , “মহাজন’ যেন গতা স: পন্থা শ্রেয়:”। মহাজ্ঞানী ,মহাজন’ , কালদ্রষ্টা , মহামানবরা যা বলেন তাই সত্য ৷ এইরূপ মহাজনের পদপ্রান্তে বসে সশ্রদ্ধ জিজ্ঞাসার দ্বারা হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস জানা যায় ৷ যুগে যুগে যুগমানবরা মানব কল্যাণে শরীর ধারণ করে আসেন – কিন্তু সমকালীন মানুষেরা তাঁকে ঠিকমতো গ্রহণ করতে পারে না বরং অনেক সময় বিরোধ করে , ফলে তাঁর কাছে যা পাওয়া যেতো তা আর পাওয়া যায় না ! তাঁরা যেন সমাজের অপ্রস্তুততার কারণে, আরব্ধ কাজ অসমাপ্ত করেই চলে যান ! সেইজন্যই পরে তাঁকে আবার আসতে হয় সেই কাজগুলি সম্পন্ন করার জন্য ৷৷(ক্রমশঃ)
