[আগের জিজ্ঞাসার সূত্র ধরে অন্য একজন জিজ্ঞাসা করলো…..]
জিজ্ঞাসু : ~ এখন(বর্তমানে) তাহলে সন্ন্যাসীদের ভূমিকা কি ?
গুরু মহারাজ : ~ এখন তো সমাজে সন্ন্যাসীরাই প্রকৃত আচার্যের ভূমিকা পালন করছে ! ব্রাহ্মণকুল নীতিভ্রষ্ট হওয়ায় সন্ন্যাসীদেরকেই এই দায়িত্ব নিতে হয়েছে ! কি ভাবছো_ভারতবর্ষকে বোঝা অতো সহজ ! সাংঘাতিক দেশ এই ভারতবর্ষ ! ঈশ্বরের অনন্ত বিচিত্র লীলা – আর সেইসব লীলার মুখ্য ভূমিকায় ভারতবর্ষ ! ভারতবর্ষ যে গোটা বিশ্বের মাথা বা মস্তিষ্ক _ তাই যাবতীয় শিক্ষার জনক‌ও এই দেশ ! সমগ্র পৃথিবীতে যত ধরনের শিক্ষার ধারা রয়েছে, দেবগুরু বৃহস্পতি অথবা দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য – এই দুইয়ের শিক্ষানীতির বাইরে কেউ যেতে পারবে না । উভয়ের ই প্রতিটি শিক্ষা নিখুঁত – শুধু উপযুক্ত আচার্যের অভাবে আজকের ভারতীয় সমাজে তার প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না ৷ বৈদিক শিক্ষা বা উপনিষদের শিক্ষা হোল _”বিচার” ! জিজ্ঞাসা-উত্তরের মাধ্যমে ঐসব প্রতিটি বিচার__ সর্ব কালের সর্ব দেশের কাছেই গ্রহণযোগ্য ! যত দিন যাচ্ছে ততই গীতা , উপনিষদ আরো আরো বেশি করে গ্রহণ করছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উন্নত মানব সমাজ ! অথচ ভারতের দুর্গতি দ্যাখো !!
শান্ডিল্য ,কাশ্যপ , অঙ্গীরস ইত্যাদি ঋষির পরম্পরা হওয়া সত্ত্বেও ভারতের বা ভারতবাসীর এই দুর্গতি , এই দুর্দশা ! হিমালয়ে বা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে_ সাধু সমাজে ঘোরার সময় আমি অনেক সাধু-মহাত্মাদের কাছে এর কারণ জানতে চেয়েছিলাম ! আর এই দুর্গতির হাত থেকে ‘মুক্তির আর দেরি কতটা’_ তাও জানতে চেয়েছিলাম ! বেশিরভাগই আমার এই ধরনের জিজ্ঞাসা টাকেই এড়িয়ে গেছেন, নাহয় চুপ থেকেছেন ।
পরবর্তীতে আমার সন্ন্যাস হবার পর গুরুদেব রামানন্দ অবধূতকে জিজ্ঞাসা করায়, উনি বললেন “কাল (সময়) বহুৎ বলবান হোতা হ্যায় !” ভগবান শ্রীকৃষ্ণ-ও এই একই কথা ব্যাসদেবকে বলেছিলেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ঠিক আগে ! কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যখন নিশ্চিত হয়ে গেছে _সেই অবস্থায় ব্যাসদেব একবার উভয় পক্ষের মিলনের শেষ চেষ্টা করেছিলেন ৷ কৌরব ও পাণ্ডব এই দুই পক্ষ তো ব্যাসদেবের-ই বংশধর (কারণ বিচিত্রবীর্যের দুই স্ত্রী অম্বিকা এবং অম্বালিকা _ উভয়েরই গর্ভসঞ্চার করেছিলেন ব্যাসদেব।)। তাই উভয়পক্ষের রক্তপাত মানেই তাঁর ই আত্মজের রক্ত – তাছাড়া একজন জ্ঞানী ও মহান ব্যক্তি হিসাবে এটা করা তাঁর কর্তব্য-ও ছিল ৷ তিনি সরাসরি কৃষ্ণের কাছে পৌঁছে – যুদ্ধ বন্ধ করার জন্যে ভগবানকে সানুনয় অনুরোধ করলেন । ব্যাসদেব ভালোমতোই জানতেন যে, ভগবানের অসাধ্য আর কি আছে! তিনি ইচ্ছা করলে সব কিছুই করতে পারেন ! ‘হয়’-কে নয় অথবা ‘নয়’-কে হয় করাই তো তাঁর কাজ! তাই ব্যাসের এই শেষ চেষ্টা !
কিন্তু ভগবান চতুর চূড়ামণি ! তাঁকে চাতুর্যে কে কবে পরাস্ত করতে পেরেছে ! যখনই ব্যাসদেব বললেন – ” ভগবান ! তোমাকে আর কি বলবো – তুমি সবই জানো , তবু মনে করাচ্ছি , জানো তো যুদ্ধের পরিণতি !” এটা সত্যিই যে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে হিংসার চরম প্রকাশ ঘটেছিল । ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের , গুরুর সাথে শিষ্যের , পিতা বা পিতৃস্থানীয়দের সাথে পুত্রদের যুদ্ধে রক্তস্নাত হয়েছিল কুরুক্ষেত্রের ভূমি ! সেই পরিণতির কথাই ব্যাসদেব স্মরণ করালেন বাসুদেবকে ৷ ভগবান উত্তর দিয়েছিলেন , ” দ্যাখো , আমি যুদ্ধ হোক তাও চাইনা , যুদ্ধ বন্ধ হোক তাও চাই না ! আবার তোমার অনুরোধ মতো এই যুদ্ধ বন্ধ করতেও পারি না ! কারণ পরস্পর যুযুধান দুটি পক্ষের বিরোধী মনোভাব ,হিংসা-দ্বেষ , প্রতিহিংসা ,প্রতিশোধস্পৃহা থেকে যে field প্রকৃতির বাতাবরণে তৈরি হয়েছে – তার পরিণতিই এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধ ৷ মহাপ্রকৃতির নিয়ম লঙ্ঘন করা মানেই তার বিরুদ্ধে Reaction করা ! আর তা করলে সেটা অন্য কোনোভাবে আঘাত হানবে ! তাই জ্ঞানীরা , কালদ্রষ্টারা মহাপ্রকৃতির কোনো নিয়মকেই লঙ্ঘন করেন না ! তাঁরা কার্যকারণ সূত্রের এই রহস্যটি জানেন। তাই তারা এটি করেন না!” ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্যাসদেবকে আরো বললেন , ” সুতরাং এই যুদ্ধের ঘটনা ঘটতে দেওয়াটাই কাম্য । আমি , তুমি সবাই তো ‘কাল’-এর মধ্যেই রয়েছি , তাই ‘কাল’-কে অস্বীকার করব কি করে ?” ফলে ব্যাস‌ও অবশ্যাম্ভাবী যুদ্ধকে আটকাতে পারলো না।
ভারতবর্ষে ব্রাহ্মণ্য প্রথা আর রাজতন্ত্রের আঁতাতের সময়ে _সাধারণ মানুষের ওপর এতো অত্যাচার বা অনাচার হয়েছে যে, এখনও মহাপ্রকৃতি রুষ্ট ! সেই সময় মানুষকে তো ‘মানুষ’ বলেই জ্ঞান করা হয়নি ! প্রায় সব দেশেই অবশ্য এটাই হয়েছে _ দুর্বলের উপর সবলের নির্যাতন ! আফ্রিকাতে তো খুবই হয়েছে __বলতে গেলে এখনও এই ব্যাপারটা চলছে সেখানে ! খুব শীগগির আফ্রিকাতেও ঈশ্বরের অবতরণ হবে_এই দুরবস্থা থেকে মানুষকে আগিয়ে আনার জন্য !
বৈদিক যুগের ঠিক পরবর্তী সময়ে বা রাজতন্ত্রের সময়ে , বিশেষত যখন থেকে ব্রাহ্মণদের অধঃপতন ঘটলো এবং যখন থেকে রাজশক্তি ও ব্রাহ্মণ্যশক্তির মধ্যে নিজ নিজ স্বার্থ সিদ্ধির জন্য একটা অশুভ আঁতাত হোলো – তখন থেকেই সাধারণ মানুষ বা নিরীহ প্রজাবর্গের নিদারুন অবস্থাটা শুরু হয়েছিল ! অভাব-অনটন , নারীর সম্মানহীনতা , যথেচ্ছ অত্যাচার ,অবজ্ঞা ,অবহেলা,মানবতার চরম অপমান __হয়ে চলেছিল দীর্ঘকাল ধরে ! প্রকৃতির বাতাবরণে সেই ক্ষোভ-বিক্ষোভের field রয়ে গেছে ! এখন তারই জের হিসাবে যেন ভারতবর্ষের Punishment period চলছে ! এছাড়া এই দেশে একদল তথাকথিত উন্নাসিক পন্ডিতমহল রয়েছে, যারা দেশের যা কিছু ভালো তা দেখতে পায় না –বিদেশের রাংতায় মোড়ানো, দেখতে একটু চকচকে – তাকে নিয়েই মাতামাতি করে ৷ মহাপ্রকৃতিতে এটারও প্রভাব রয়েছে ! বাবাকে অপমান বা অবহেলা করে বাইরের কাউকে সম্মান জানানো – এটা ‘মা’ কখনো সহ্য করে না ! এমনটা কোরলে জননী সন্তানের প্রতি রুষ্ট হয় ,! এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে ৷ ভারতবর্ষের প্রতি মা এখন রুষ্ট –মোটেই তুষ্ট নন ।
আমাদের এখন প্রয়োজন সমবেত প্রার্থনায় মাকে তুষ্ট করা , তাহলেই এই দেশ ভারতবর্ষ আবার স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে , সমগ্র পৃথিবীতে প্রকৃত শিক্ষার আলো বা জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে পারবে ৷৷
আমি নিজে অনেক চিন্তা করে দেখেছি – খুব শীঘ্রই ভারতের পুনরায় সুদিন আসবে ৷ ঋষিদের দেওয়া চিরন্তন সত্যের সন্ধান , সমাজের জন্য নানা বিধান বা অনুশাসন , নীতিশিক্ষা __সবই গোটা বিশ্ব গ্রহণ করবে ! এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা !!(ক্রমশঃ)