[ আগের দিন আমরা দেখেছি__’কেন বাংলায় অনেক মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করেছিলেন’__এই জিজ্ঞাসার উত্তর দিচ্ছিলেন গুরুজী! সেই বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে উনি ঐ প্রসঙ্গ থেকে অন্য অনেক প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছিলেন । আলোচনার পরবর্তী অংশ_আজ…..]
বুঝলে বাবা ! মানব বিশ্লেষণ বা সমাজ বিশ্লেষণ করাটা কি এতোই সোজা ! সাধারণ বাঙালিদের মানসিকতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ , বঙ্কিমচন্দ্র থেকে বিভিন্ন লেখকেরা কলম ধরেছে , বিচার বিশ্লেষণ করেছে _কিন্তু তা কি ষোলআনা হয়েছে ? সবার সবটা বলতে পেরেছে কি? পারা সম্ভব‌ও নয় !
আমি যেটা দেখি__ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ভারতবর্ষের সব প্রদেশেই প্রায় একইরকম জীবন যাপন করে ৷ শিক্ষার উন্নতি ছাড়া এই জীবনযাত্রার মান পাল্টানোও যাবে না । এদের ঐ যে মানসিকতা _’দিন আনি, দিন খাই’ , ভবিষ্যতের কথা মাথাতেই আনে না __এটাই মারাত্মক ! অবশ্য এখন এই বনগ্রামে এসে দেখছি খেটে খাওয়া মানুষদের মধ্যেও অনেক পরিবর্তন আসছে – এটা বামপন্থীদের ক্ষমতায় আসার একটা সুফল । আর বাঙালি M.I.G group বা শিক্ষিত নিম্নমধ্যবিত্তদের বেশিরভাগের _আয়ের থেকে ব্যয় বেশি করার মানসিকতা রয়েছে। দুটো পয়সা হোলেই এখানে ওখানে বেড়াতে যায় ! এরা একটু ভ্রমণপ্রিয় , ভালো ভালো খাবার কিনে আনে – ভোজনবিলাসীও! আর এইসব করতে গিয়ে এরা অর্থনৈতিক সমস্যা মেটাতে পারেনা । বাংলা ছাড়া অন্য প্রদেশের M.I.G. group কিন্তু এরকমটা নয় । বিহার , উত্তর প্রদেশ , রাজস্থানের মানুষ যদি লাখপতিও হয় (এখন অবশ্য লাখপতিটা কোটিপতি হবে) তাদের জীবনযাত্রা বা খাওয়া-দাওয়া দেখে বুঝতে পারবে না । অর্থনৈতিকভাবে একটু উন্নত মাড়োয়ারিরা সাধারণতঃ বাড়িতে কি খায় জানো — ” দো গো পরাটা , লসুন কা চাটনি ” – ব্যস্ । তবে একটা কথা অনেকেরই মাথায় থাকে না_সেটা হোলো রাজস্থানের মারওয়ার প্রদেশের মানুষ মাত্রই — সবাই মাড়োয়ারি ! কিন্তু ঐ অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষই গরীব ! যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করে অন্যত্র settled হয়েছে – তারাই শুধু ধনী । আমাদের এখানে অনেক ব্যবসাদার মারওয়ার থেকে এসে ব্যবসা করে ধনী হয়েছে তাই আমরা মনে করি “মারোয়ারি” মানেই ধনী – প্রকৃতপক্ষে তা নয় ৷ মারওয়ার প্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জ আমি ঘুরে দেখেছি ! সেখানে সাধারণ মানুষের কি কষ্ট ! বিশেষতঃ জলকষ্ট । কোনো কোনো স্থানে 5 কিমি , কোথাও 10 কিমি দূর থেকে জল আনতে হয়(এগুলো ১৯৯১/৯২_সালের কথা) ৷ একটা গ্রামে দেখেছিলাম, সেখানকার ব্যক্তিদের 27 কিমি দূর থেকে জল আনতে হয় । সম্প্রতি ওখানকার রাজ্য সরকার এই সব মানুষের জন্য কিছু ব্যবস্থা করেছে কিনা কে জানে !
যাইহোক , কথা হচ্ছিলো মানুষের মানসিকতা নিয়ে — বাঙালি মানসিকতা উন্নত কি না ? প্রকৃতপক্ষে, মানুষের মানসিকতা উন্নত হয় সদ্-গুরুর সান্নিধ্যে এলে । তাঁর কাছে আধ্যাত্মিকতার পাঠ গ্রহণ করে সঠিক পথে সাধন ভজন করলেই মানসিকতার উন্নতি হয় ৷ আর , তখন থেকেই চেতনার জাগরণ হয় এবং আত্মিক উত্তরণ ঘটতে থাকে ৷ ধীরে ধীরে মানুষ প্রথমে ঠিক ঠিক “মান-হুঁশ” যুক্ত মানুষ হয়ে ওঠে ৷ এরপরেও সাধনার ধারা ঠিকমত চলতে থাকলে এবং গুরু ও ইষ্টে ঠিক ঠিক মতি থাকলে মানুষ হয়ে ওঠে “দেবতা” ! যে মানুষ একদিন “দাও- দাও” করছিল এবার তার মধ্যেই ‘দেবার বাসনা’ জন্মায় ৷ সাধনার ক্রম ঠিক ঠিক থাকলে এরপর সেই দেবমানব “ঋষি মানবে” পরিনত হতে পারে । এটাই সিদ্ধাবস্থা ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন – আলু-পটল যেমন সিদ্ধ হলে নরম হয়ে যায় — তেমনি এটাও একটা দ্রবিত-গলিত অবস্থা । এই অবস্থায় আর কোনো কিছুর প্রতি ‘আঁট’ (আকর্ষণ)থাকে না , জাগতিক ভোগ-বাসনাদি কোনো কিছুই আর তার অন্তঃকরণকে স্পর্শ করতে পারে না – পিছলে বেরিয়ে যায় । এই অবস্থায় একবার পৌঁছাতে পারলে সাধককে আর প্রচলিত জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে বারবার ফিরে ফিরে আসতে হয় না ! কারণ যার বাসনা মুক্তি ঘটেছে তার তো ভোগ-রূপ শরীর নষ্ট হয়ে গেছে ! এবার যেটা রয়েছে_সেটা শুধু ত্যাগ-রূপ শরীর ! পরবর্তীতে যখন পুনরায় শরীর ধারণ হবে, তখন ঐ শরীরকে কেন্দ্র করে যে কাজ‌ই হবে,তা শুধুই পরার্থে !
এটাই একটু আগে বলছিলাম __ ত্যাগীর জীবন শুধু ধূপের মতো পুড়ে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, আর সকলকে সুগন্ধ ছড়িয়ে যাওয়া ! এই জন্যেই বলা হয় প্রকৃত সাধু চিনবে শেষে ৷ “পুড়বে সাধু উড়বে ছাই , তবেই সাধুর গুন গাই ।”
সাধারণ মানুষ কামনা-বাসনায় আবদ্ধ ৷ এখানে বাঙালি , বিহারী , এদেশী-বিদেশী বলে কোনো পার্থক্য নাই ৷ যে মানুষের চেতনা রয়েছে _ সে-ই ভালো-মন্দ বেশ বোঝে । কেউ ভালোটা গ্রহণ করে, কেউ মন্দকে গ্রহণ করে ৷ সাধারণতঃ মানুষ কামিনী-কাঞ্চন বা কাম-কাঞ্চনে অধিক আসক্ত ! এই দুটোর প্রতি আসক্তিবশত: জগতে অনেক বড় বড় আদর্শ আটকে গিয়ে জন-অরণ্যে মিশে গেছে ! জগতের ভালোমন্দ নিয়ন্ত্রনকারী গুরুকুল __কোনো উন্নত মানবের কার্যকলাপ বা উন্নত আদর্শ-যুক্ত মানবকে লক্ষ্য রাখে ! তাদেরকে অলক্ষ্য থেকে সাহায্য করে ! কিন্তু যখন তাঁরা দেখেন যে, সে এই দুটোর মোহে পড়ে গেছে — তখন দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন ৷ আর সেই জন্যই ওই সব ব্যক্তিরা লোক সমাজে একটু জ্বলে উঠেও আবার হারিয়ে যায় !
কিন্তু সবাই কি এই দলে পড়ে ? না _ না তা পড়েনা ! বিশ্বামিত্র মেনকার নৃত্যে মুগ্ধ হোলো , কিন্তু বশিষ্ট হোলো না । আমেরিকায় প্রথমবার স্বামী বিবেকানন্দ যখন গেলেন এবং তাঁর জনমোহিনী ব্যক্তিত্বে যখন ওখানকার মানুষ মুগ্ধ হয়ে গেল __তখন এক ঝাঁক ধনী , সুন্দরী , যুবতী মহিলা স্বামীজীকে নিয়ে একেবারে ঝাঁপাঝাঁপি করতে লাগলো ! সব সময় তারা স্বামীজীকে ঘিরে থাকতো – তারাই স্বামীজীর সব দায়িত্ব নিয়ে নিল । ওখানকার কিছু বৃদ্ধা সন্ন্যাসিনী বা নান্ স্বামীজীকে সন্তানের মতো দেখতেন ! তাঁরা এইসব দেখে খুবই বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন ৷ যীশুর কাছে তাঁরা প্রার্থনা করেছিলেন _ যাতে ভগবান যীশু এই মহিলাদের হাত থেকে যুবকটিকে রক্ষা করে ! কারণ তারা নিজেরা মহিলা হওয়ায় তাঁরা জানতেন যে, এই ধরনের একদল মহিলা একটি যুবকের কি সাংঘাতিক ক্ষতিসাধন করতে পারে ! তবে স্বামীজীর সংস্কার-ই ছিল অন্যরকম ! আর গুরু ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণের অভয়হস্ত সব সময় যার মাথায় _তার আবার ভয় কি ! মহিলাদের রূপ-যৌবনের প্রতি স্বামীজীর একান্ত অনীহা দেখে ওই সুন্দরীরা একে একে কেটে পড়েছিল , যারা তারপরেও থেকে গেলো তারা স্বামীজির কাছে দীক্ষা নিয়ে তার শিষ্যা হয়ে গেল !
ওই সময় স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতায় তার গুরুভ্রাতাদের কাছে একটা চিঠি লিখে বলেছিলেন – ‘জাগতিক ভোগ বিলাসিতার সমস্ত উপকরণের মধ্যে থেকেও তার মন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের পাদপদ্ম থেকে এক চুলও সরেনি’ – এটাই তাঁর উপর গুরুর অর্থাৎ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপা ৷৷