জিজ্ঞাসা : ~ “বাউলের মর্মকথা” – বইয়ে আপনি “অনুমান ভজন” আর “বর্তমান ভজন” সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন ৷ সেখানে “বর্তমান ভজন” আবার দুই প্রকার__ “নারী নিয়ে সাধন” আর “নারীবর্জিত” ৷ তাহলে “অনুমান ভজন” কারী সন্ন্যাসীর সাথে নারীবর্জিত অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রকারের বর্তমান ভজনকারী সাধকের পার্থক্য কি ?
গুরু মহারাজ : ~ “বাউলের মর্মকথা” – বইটির “মর্ম” এখনকার মানুষেরা বা সমকালীনরা খুব একটা নিতে পারছে না ! কিন্তু পরে পরে যারা আসবে, তারা এই ব‌ইয়ের মর্মার্থ আর বেশি বেশি বুঝতে পারবে । ‘অনুমান ভজন’ – অর্থাৎ তুমি তোমার ইষ্টকে অনুমান করছো , হয় মূর্তিতে বা মনোজগতের চিন্তায়-ভাবনায় । সেখানেও অবশ্য সূক্ষ্মরূপে মূর্তি থাকছে । এইভাবে কালী , কৃষ্ণ , আল্লাহ , গড – ইত্যাদি যা কিছু একটাকে Supreme ধরে নিয়ে _যেকোনো একটা ‘ভাব’ (অর্থাৎ দাস্য , সখ্য , বাৎসল্য ইত্যাদি) আশ্রয় বা অবলম্বন করে, সেই Supreme-কে কল্পনার আসনে বসিয়ে (অথবা মূর্তি রূপে স্থূলভাবে রেখে) সাধন-ভজন করাই অনুমান ভজন ৷ এখানে আচার-অনুষ্ঠান পৃথক , উপাচার-অর্চনা পদ্ধতি পৃথক কিন্তু এই ধরনের সমস্ত সাধকই(এদের মধ্যে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান ইত্যাদি সবাই পড়ে যাবে) অনুমান ভজন করে যাচ্ছেন ৷ এই সাধনাতেও বহু সিদ্ধ-সাধক রয়েছেন ! এমন বহু যোগ-বিভূতিসম্পন্ন সাধকের কথা তুমি দেশে-বিদেশে শুনতেও পাবে । বহুকাল থেকেই সমাজে এই সাধন পদ্ধতি চলে আসছে ৷
এবার হচ্ছে ‘বর্তমান সাধন’ ৷ তুমি চোখের সামনে যাকে দেখতে পাচ্ছো_যখন তার ভজনা করছো _সেটাই বর্তমান ভজন। বলা হয়, ‘মর্ত্তের গুরু-ই ভগবান’ , কারণ গুরু সাধকের সামনে রয়েছে _গুরু বর্তমান ! তাই গুরুই এখানে Supreme ! এইজন্য গুরু প্রণাম মন্ত্র তৈরি করা হয়েছে এইভাবে – “গুরু ব্রহ্মা , গুরু বিষ্ণু , গুরুদেব মহেশ্বরঃ, গুরুদেব পরমব্রহ্ম তস্মৈ শ্রী ঘুরবে নমঃ!”
আবার এখানে হয়তো একটা কথা আসতে পারে যে, সব গুরুই তো সদ্গুরু নয় বা ভগবান পদবাচ্য নয় _তাহলে বিভিন্ন গুরু পরম্পরার শিষ্য বা সাধকদের কি হবে ? দ্যাখো , এই জগৎ সংসারের ভার যাঁর উপর _ সবকিছু তিনি-ই ঠিক করেন , তাঁর উপরেই সবকিছুর ভার , সবার ভার ৷ আমরা অজ্ঞানতা বা অজ্ঞতাহেতু অনেক কিছু ভাবি – কিন্তু আমার এই ক্ষুদ্র ভাবনার কি দাম আছে বলো তো ? সেই ভাবনায় কি জগত ্সংসার চলে ? একটা মানুষের মনকে ঠিক করতে পারবে না ! নিজের পরিবারের লোকজনদের তোমার স্বমতে আনতে পারবে ? পারবে না – ! তাহলে, বুঝতে পারছো তো _ জগতের ভালো মন্দ সব তিনিই ঠিক করেন ৷ তাই যে কোনো পরম্পরার সাধন-পদ্ধতিই হোক না কেন _ সাধক যদি নিষ্ঠা ভরে গুরুর নির্দেশ মেনে সেই পরম্পরার সাধন পদ্ধতি ঠিকমত পালন করে– তাহলে তার চেতনার উন্নতি ঘটবেই ঘটবে । ‘বর্তমান’ গুরু যদি ততটা উন্নত নাও হয়, ওই পরম্পরার প্রতিষ্ঠাতা তো উন্নত ছিলেন – ফলে তাঁর একটা প্রভাব থেকেই যায় ৷ আর সেখান থেকেই কাজ হয় ! নাহলে গুরু পরম্পরা তো রয়েছেই !
ঈশ্বরের ইচ্ছায় বা মহাজাগতিক নিয়মের মধ্যে যদি ওই পরম্পরা না থাকতো তাহলে তো তার কোনো অস্তিত্বই থাকতো না ! কোনো পরম্পরা এখনো টিকে আছে _মানেই জানবে, ঈশ্বরের ইচ্ছায় তা চলছে ! আর এর দ্বারা মানুষের কোনো না কোনো মঙ্গল সাধিত হোচ্ছে ৷ কোনো মহাপুরুষ স্থুলে বা সূক্ষ্মে সেই পরম্পরার সাধকদের উন্নতির ব্যাপারটা লক্ষ্য রাখছেন । তাই কোনো পরম্পরার গুরু ততটা আধ্যাত্মিক না হোলেও শিষ্যের মধ্যে নিষ্ঠা , শ্রদ্ধা থাকলে তার কল্যাণ হয় , তার আধ্যাত্মিক অগ্রগতি ঘটে ৷
সূয্যিমামা যেমন সবার মামা, তেমনি জগৎগুরু সকলের গুরু ! তিনিই সবার ভার নেন ! কারণ তিনি সকলের ভার সদাসর্বদাই নিয়ে রয়েছেন ।
বর্তমান ভজন বড় কঠিন। রক্তমাংসের মানুষকে সাক্ষাৎ ঈশ্বর ভাবা , তাঁকেই ইহকাল-পরকাল জ্ঞান করে _সব ভার দেওয়া, এটা সোজা কথা নয় ! দেহধারন করলেই দেহের বিকারাদিও নিতে হয় ৷ কথায় বলে ‘পঞ্চভূতের ফাঁদে ব্রহ্ম পড়ে কাঁদে’ । আর কাঁদছেই – জীবজগৎ সাক্ষাৎ ব্রহ্মস্বরূপ হওয়া সত্ত্বেও তো সর্বদা কাঁদছে । স্বয়ং ঈশ্বর শরীরধারণ করলে _ তাঁকেও জগতের সবকিছু ভোগ করতে হয় । রোগগ্রস্থ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখে কতো মানুষ যে তৎকালে দক্ষিণেশ্বর ত্যাগ করেছিল – তার ইয়ত্তা নেই ৷ তাছাড়া বর্তমান ভজনে গুরুর সাথে দাস্য , সখ্য বা বাৎসল্যভাবের সাধনের কথা ভাবো ! শ্রীকৃষ্ণের সময় ব্রজগোপীরা মধুরভাবের সাধিকা ছিল ৷ কৃষ্ণকে নিয়ে তারা কি না করেছে – পায়ে পর্যন্ত ধরিয়েছে ! আবার যখন শুনেছে ভক্তের পায়ের ধুলো ছাড়া শ্রীকৃষ্ণের মাথা ব্যথা কমবে না _তখন পায়ের ধুলো ঝেড়ে নারদকে দিয়ে পাঠিয়েছে ! রাখাল বন্ধুরা সখ্যভাবের লোক ছিল _ তারা যেমন শ্রীকৃষ্ণকে কাঁধে নিয়েছে, তেমনি আবার নিজেরাও শ্রীকৃষ্ণের কাঁধে চড়েছে এবং ঐ অবস্থায় তাঁকে ছোটানো করিয়েছে ! “বর্তমান ভজনে” — অবৈধী ভক্তি ! কোন বেদ-বিধি দিয়ে এসব বোঝা যাবে না ।
দক্ষিণেশ্বরে রাখাল মহারাজ প্রথম প্রথম এসে ঠাকুরের কোলে চেপে ঠাকুরের স্তন্যপান করতো , ঠাকুর সস্নেহে ওকে প্রশ্রয় দিতেন । বলতেন – ও ব্রজের রাখাল ! বলো তো কোনো নিয়ম-অনুশাসনের দ্বারা এর কি ব্যাখ্যা করা যাবে ? কোনো বৈধী ভক্ত কি এটা করার সাহস করবে – না এসব করতে পারবে ? বৃন্দাবন লীলায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাথে এসব খুব হয়েছিল , তাই বলা হয় – ” বৃন্দাবনে হয় রসের স্থিতি , বেদ বিধি তায় নাইক গতি ” । বিধি-নিয়ম পূর্বক যদি শত বৎসর , সহস্র বৎসর ধরে সাধনা করতে থাকা কোন সাধককে বলা হয় “ভগবানের কাঁধে চাপো” – সে ওটা করতে পারবে না ৷ তোমাকে যদি এখনই বলা হয় আমার কাঁধে চাপো – পারবে কি ? আমতা আমতা করবে । … (ক্রমশঃ)