শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের মহিমার কথা বলা হচ্ছিলো। আমরা একবার উল্লেখ করেছিলাম গুরুমহারাজের ছোটবেলায় খেলার সাথী নারুদার (উনি এখনও শরীরে রয়েছেন) কথা ! নারুদা ছোটবেলায় গুরুমহারাজের (বালক রবীন) সাথে দিনে-রাতে অনেকটা সময় কাটিয়েছেন। ওনার কাছে গুরুমহারাজের সাথে কাটানোর সেই মধুর স্মৃতিগুলি রয়েছে – আপনারা যে কেউ কৃষ্ণদেবপুরে গেলেই নারুদার মুখ থেকে সেইসব দিনের কথা শুনতে পারবেন। নারুদা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসারজীবনে, কর্মজীবনে প্রবেশ করেছিলেন এবং গুরুমহারাজ সর্বত্যাগী হিমালয়ে। কিন্তু রবীনের (গুরুমহারাজের) সাথে তার যোগাযোগ কখনও ছিন্ন হয়নি। পরে ঐ নারুদাই গুরুমহারাজের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণও করেছিলেন এবং তার বাল্যবন্ধুকে ‘গুরুজী’ বলেই সম্বোধন করতেন !
গুরুমহারাজের মহিমা প্রকাশের কি শেষ আছে ? যাঁর সমগ্র জীবনই মহিমময় – তাঁর আর আলাদা করে মহিমার কথা বলার কি-ই বা থাকতে পারে ! গুরুমহারাজ শিশু অবস্থায় (বছর দেড়েক বয়স) যখন পুকুরের জলে ডুবে গেছিলেন – তখন যাঁদের সাথে ওনার দেখা হয়েছিল – তাঁরা ঠিক কারা ছিলেন, আর কেনই বা তাঁরা গুরুমহারাজকে আকর্ষণ করে নিয়ে গিয়েছিলেন (গুরুমহারাজ ইচ্ছা করে জলে নামেন নি, উন্নত যোগীরা আকর্ষণ করে নিয়ে গিয়েছিলেন!) – সেটা আমি ঠিক জানি না ! ওঁরা কারা ছিলেন – সেই ব্যাপারে বিভিন্ন জন বিভিন্ন রকমভাবে লিপিবদ্ধও করে ফেলেছে ! ফলে সুধী পাঠকেরা বা বোধী-ব্যক্তিরা সেখান থেকেই একটা synthesis করে নেবেন ! তবে, ঘটনাটা যা-ই হোক না কেন, আমরা সবাই এটা বুঝতে পেরেছিলাম যে, ওনাদের(ঐ সব উন্নত চেতনাসম্পন্নদের) বহুকালকার মনোবাসনা (ভগবানকে নিয়ে আনন্দ করা) পূর্ণ করেছিলেন গুরুমহারাজ !
আবার এমনটাও হোতে পারে যে, তাঁদের কাছে সঞ্চিত (সাধনার দ্বারা অর্জিত) কোনো সাধন-শক্তি, যা পরমানন্দলীলায় কাজে লাগতে পারে – সেটা ওনারা শিশু গুরুমহারাজকে নিয়ে আনন্দ করার সময়, তাঁকে দান করেছিলেন ! এইটা বললাম – কারণ এমন ঘটনা গুরুমহারাজের জীবনে অনেকবার ঘটেছিল ! হিমালয়ের সেই প্রাচীন সন্ন্যাসী (যাঁর বয়স ছিল প্রায় আড়াই হাজার বছর) যিনি একটা দুর্গম অঞ্চলের এক গুহায় থাকতেন এবং যাঁর শরীর দেখে মনে হচ্ছিল – শুধু কঙ্কালের উপর চামড়া জড়ানো,– অথচ তাঁর গলার আওয়াজ ছিল বজ্রগর্জনের ন্যায় গম্ভীর ও শক্তিশালী,– তিনিও কিশোর গুরুমহারাজের সাথে দেখা হবার পর – তাঁর সুদীর্ঘ সাধন জীবনের অর্জিত সম্পদ বা বলা চলে তাঁর কাছে গচ্ছিত আধ্যাত্ম-সম্পদ (অনেকের সাধনলব্ধ শক্তির একটা deposit) গুরুমহারাজকে উপযুক্ত পাত্র হিসেবে পেয়ে ওনাকে তার সর্বস্বটা দান করে শরীর ছেড়ে দিয়েছিলেন।
স্বামী বাউলানন্দের সাথেও গুরুমহারাজের যখন দেখা হয়েছিল (যেদিন স্বামী বাউলানন্দ শরীর ছাড়েন, তার আগের দিন সন্ধ্যায় উনি রায়নার শ্মশানে বসে থাকা গুরুমহারাজকে, উড়িয়ে পেরেন্টাপল্লী নিয়ে গিয়েছিলেন) সেদিনও সারারাত্রি ব্যাপী স্বামী বাউলানন্দ গুরুমহারাজকে নানান শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং শিক্ষা সমাপনান্তে শরীর ছেড়ে দিয়েছিলেন ! এছাড়াও গুরুমহারাজের কাছে আমরা শুনেছিলাম – বহু মহাত্মা-মহাপুরুষ-ই গুরুমহারাজকে তাঁদের সাধনশক্তি নিঃস্বার্থভাবে দিয়ে শরীর ছেড়েছিলেন।
আবার ওনার শ্রীমুখেই এমনও শুনেছিলাম যে, গুরুমহারাজের স্থূল শরীর যতদিন ছিল ততদিন – কোন উন্নত মহাত্মা (তা তিনি যে পরম্পরার-ই হ’ন না কেন) শরীর ছাড়লে – তাঁর সবকিছুই গুরুমহারাজের কাছে চলে আসতো ! তারমানে গুরুমহারাজ ছিলেন যেন আধ্যাত্ম-শক্তির store house ! মা জগদম্বা ওখান থেকেই নিয়ে প্রয়োজনে সাধকদের দিতেন, আবার কোনো যোগী-মহাত্মার সাধনশক্তি ওইখানেই এসে storing হোত !
গুরুমহারাজ একদিন বনগ্রাম আশ্রমের সিটিং-এ বৃন্দাবনের যাদবেন্দ্র স্বামীর প্রেমের কথা, তাঁর সাধনার কথা খুবই আপ্লুত হয়ে আলোচনা করছিলেন ! ঐসব কথা শুনে জয়দীপ (বর্তমান জয়দীপ মহারাজ) গুরুজীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন – “ঐ মহাত্মা এখনো শরীরে আছেন কি না ?” এই কথার উত্তর দিতে গিয়ে গুরুমহারাজ একটু যেন সময় নিচ্ছিলেন – তারপর ঐ কথাটা বললেন যে, তিনি দেখে নিচ্ছিলেন যে, যাদবানন্দের বাৎসল্য প্রেমের ভাবটি তাঁর শরীরে এসেছে কিনা ! যদি আসে তাহলে তিনি শরীর ছেড়ে দিয়েছেন এবং তাঁর ভাবটি বর্তমানের আধ্যাত্মজগতের store house – পরমানন্দ শরীরে এসে প্রবেশ করবে।
যাইহোক, এখন আমরা যেখান থেকে শুরু করেছিলাম আবার সেখানেই ফিরে যাচ্ছি। গুরুমহারাজ শিশু অবস্থায় পুকুরে ডুবে যান নি – তিনি একদল মহাজ্ঞানী কোন বিশেষ পরম্পরার মহাত্মাদের সাক্ষাৎ দেবার জন্য গিয়েছিলেন। একটা অন্তরাল প্রয়োজন ছিল – তাই হয়তো জলের তলায় ঐ আসরটি বসেছিল ! জল, স্থল, অন্তরীক্ষ – সবস্থানই তো ওনার – তাই সব জায়গাতেই ওনার ছিল অবাধ গতি ! তাই ঐ ধরনের কোনো পরম্পরার দাবী মেটাতেই গুরু মহারাজের শিশুবেলায় ওই জলপ্রবেশ হয়েছিল ! [ক্রমশঃ]