[আগের দিন মহাপুরুষরা শরীর ধারণ করে, কষ্ট পান কেন_এই নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো। আজ তার পরবর্তী অংশ…..]
পরবর্তীতে যখন ভক্তরা আসতে শুরু করলো , ঠাকুর(শ্রীরামকৃষ্ণ)-এর নাম কলকাতার শিক্ষিত সমাজ এবং বাবুসমাজে ছড়িয়ে পড়লো ! দলে দলে মানুষ দক্ষিণেশ্বর মুখী হোল , নরেনাদি ব্রহ্মচারীরা এসে গেল , ঠাকুরের আরব্ধ কাজ এবার শেষের মুখে – তখন ঠাকুরের শরীরে ওই মারণব্যাধি প্রকাশ পেল । প্রথমে গলায় খিচ খিচ করে ব্যথা হোত , ঢোক গিলতে কষ্ট হোত ৷ ঠাকুর সবাইকে বলতেন – ” ঐ একটু কুলফি খেয়েছিলাম , তাই বোধহয় গলা ব্যথা হয়েছে !” কিন্তু যখন সাধারণ ওষুধে সারলো না তখন কলকাতার বড় বড় ডাক্তারেরা এসে পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত করলো __এটি রোহিণী রোগ অর্থাৎ কর্কট বা ক্যান্সার !
ঠাকুরের শরীরে ক্যান্সার রোগ গ্রহণ আগামীর কথা ভেবে । যুগপুরুষ ঠাকুর দেখলেন যে, আগামীতে এই রোগটি মারণরোগ হিসাবে ভয়ংকরভাবে সমাজের ছড়িয়ে পড়তে চলেছে । তাই তিনি নিজের শরীরে ওই রোগটিকেই গ্রহণ করলেন । ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণের ভাগবতী তনু , কোনো একটা কিছুকে গ্রহণ না করলে তো শরীরটাই নষ্ট হবে না ৷ আমার (স্বামী পরমানন্দ) শরীরটার কথাই ধরো না কেন , আমি যদি এই শরীরটির মৃত্যুর কোনো হেতু-কারণ অবলম্বন না করি, তাহলে এই শরীরটা বহুকাল এইরকম-ই থেকে যাবে ,নষ্ট হবে না ৷ ঠাকুরের শরীরে ক্যান্সার রোগ গ্রহণ মানুষের কল্যাণের জন্য । এই ঘটনায় মানুষের কত বড় কল্যাণ সাধিত হোচ্ছে বলো তো ? এখনও হোচ্ছে আবার আগামী দিনগুলোতেও হবে ।
কারণ বর্তমানে মানুষ জেনেই গেছে যে, ক্যান্সার হওয়া মানেই তার শরী্রী-মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়েছে । আর মানুষের জীবনে মৃত্যুভয় অপেক্ষা ভয়ঙ্কর আর কোনো ভয় নাই । সাক্ষাৎ মৃত্যু , নির্ঘাত মৃত্যু ! এই যে সদা সর্বদা মৃত্যুভয় মানুষকে কুরে কুরে খায় ! একে তো রোগ যন্ত্রণা _রোগীর চিকিৎসা করাতে টাকা-পয়সার শ্রাদ্ধ , আর সেই টাকার যোগান দেবার যন্ত্রণা – এসবের মাঝে ওই constant মৃত্যুভয় ! ওই অবস্থায় মানুষ মনে মনে ভাবতে বসে যে, সে জীবনে কি কি পাপ করেছে বা কি অন্যায় করেছে ! আর ভাবে এইগুলোর জন্য হয়তো তার এই শাস্তি !
কিন্তু এই ধরনের পীড়িত , তাপিত জীবনে বিরাট আশ্রয় এবং আশ্বাস ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ! প্রতিটি মানুষেরই ওই অবস্থায় ঠাকুরকে স্মরণ হয় আর মনে মনে আশ্বস্ত হয় এই ভেবে যে – সে অতটা পাপী নয়, কারণ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণেরও তো এই রোগ হয়েছিল ৷ এর ফলে ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তির ঠাকুরকে স্মরণ-মনন হোচ্ছে __আবার রোগীটি মনের জোরও পাচ্ছে !
দ্যাখো , তোমাদের বিচারধারা কি বলবে আমি জানিনা – কিন্তু আমি এটা জানি যে , এঁরাই জগতের এবং মানব সমাজের যথার্থ মঙ্গলকারী ! এঁদের জীবন তো জীবন নয় – মহাজীবন ! সেই মহা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই নিহিত থাকে মানব কল্যাণ ! আর হবে নাই বা কেন ? মানব কল্যাণ সাধন করতেই তো এঁদের আসা ! এঁরা যুগাবতার , যুগপুরুষ ! যুগের প্রয়োজনে , জীবের মঙ্গল সাধনের জন্যই এঁদের শরীর ধারণ !
যীশুর Crusification – এটাও তৎকালীন ইউরোপীয় সমাজে সাধারণ মানুষের কাছে একটা বিরাট আশ্রয় বা আশ্বাস ছিল ! রোমানরা সাধারণ মানুষের ওপর যথেচ্ছ অত্যাচার করতো – গুলিবিদ্ধ করে মারতো , নয়তো তরবারিতে মুন্ডচ্ছেদ ! চার্চের আদেশে নিরীহ মানুষকে বেঁধে পুড়িয়ে মারা হোতো । ইউরোপের রোমে বা বর্তমান ইতালিতে এসব অত্যাচার খুব হয়েছে । যাইহোক, ওইসব Victim-রা ওই চরম যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর মুহূর্তে যীশুর কথা ভাবতো ! তারা ভাবতো ক্রুশকাঠে ঝুলে থাকা যীশুর কতো যন্ত্রনা হয়েছে ! এদের অনেকেই ওই অবস্থায় “যীশু”– “যীশু” বলে চেঁচিয়ে উঠে মারা যেতো । হয়তো ওই নিদারুণ অবস্থায় , প্রাণ সংকটকালে একাগ্র হয়ে যীশুকে স্মরণ করায় মৃত্যুর পূর্বে যীশুর দর্শন‌ও হোত ! আর মৃত্যুকালে যা স্মরণ করে জীবের মৃত্যু হয় – জীব সেই ‘লোক’ লাভ করে বা সেইরূপ গতি প্রাপ্ত হয় । অর্থাৎ এদের সকলের মঙ্গল হোতো – কল্যান হোতো ৷ আর হোত-ই বা বলি কেন , আজও হোতে পারে !
‘জোয়ান অফ আর্ক’-এর গল্পে তোমরা এই ধরনের ঘটনা পাবে । আরবের একজন সুফি সাধক, ( মনসুর ) যে ‘আয়নুল হক’ বলেছিল ব’লে তৎকালীন সম্রাট প্রথমে তার জিভ কেটে নিয়েছিল ! জিভের টুকরোগুলোও ‘আয়নুল হক’ বলে উঠেছিল । পরে তাকে খন্ড খন্ড করা হয় আর সেগুলো থেকেও আওয়াজ ওঠে ‘আয়নুল হক’ । এই একই কারণে ‘রাবেয়া’-কে ও মেরে ফেলা হয়েছিল , মহিলা বলে কোন Consider করা হয়নি ।
সুতরাং শুধু ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মারনরোগ-ই নয় । যারাই কোনো মহান মানব বা মানবী জগতের কল্যাণ বা মানব কল্যাণ করার ব্রত গ্রহণ করেছে ____ তাকেই যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে । কেউ শরীরে রোগ-যন্ত্রনা গ্রহণ করেছেন , কেউ মানুষের সাজানো সাজা-র যন্ত্রণা ! তাঁদের অপরাধ একটাই – তাঁরা মানুষকে ভালোবেসেছিলেন , হ্যাঁ , তারা মানুষকে প্রত্যাশাবিহীন ভালোবেসেছিলেন ৷ জগৎকল্যাণকারীদের জগৎবাসী এই ভাবেই নৃশংস ভাবে মেরে ফেলেছে ৷ কিন্তু কি আশ্চর্য ! তাঁরা আবার _ আবার , অর্থাৎ বারবার শরীর ধারণ করে এই ধরণীর ধুলায় নেমে এসেছেন! তারপর আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হোতে হোতে মারা যাওয়ার আগে উপরের দিকে চোখ তুলে তোমাদের(সাধারণ মানুষের) মঙ্গলের জন্য বলেছেন , ” হে ঈশ্বর ! ওদের ক্ষমা করো । ওরা জানেনা যে ওরা কি করছে !” এছাড়া মহামানবেরা আর কি-ই বা বলতে পারে ! এই কথাটা তো সত্যিই – “ওরা জানেনা ওরা কি করছে !” ।৷