শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের মহিমা শক্তির কথা বলা হচ্ছিলো। গুরুমহারাজ যখন স্থূলশরীরে ছিলেন তখন তো বটেই__ আবার যখন উনি স্থূলশরীর ছেড়ে চিন্ময়ধামে চলে গেলেন, তখনও __কোনো পরমানন্দ ভক্তের সঙ্গে কিছুক্ষণ অন্তরঙ্গ আলোচনা চলতে চলতেই দেখতাম, সেই ভক্তটির জীবনে ঘটে যাওয়া স্বামী পরমানন্দের মহিমা শক্তির কথা উঠে আসতোই ! আর সেই কথাগুলি বলতে বলতে সেই ভক্তের (নারী বা পুরুষ) মুখমণ্ডল কেমন যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠতো !
আমার মনে হয় স্বামী পরমানন্দের যদি কয়েক লক্ষ ভক্ত থাকে (যারা সরাসরি ওনার কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছিলেন বা দীক্ষা না নিলেও ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসেছিলেন) – তাহলে, তাদের প্রত্যেকেরই জীবনে অন্ততঃ পাঁচ-সাতটা এমন ঘটনা রয়েছে, যে সমস্ত ঘটনায় স্বামী পরমানন্দের মহিমার প্রকাশ রয়েছে ! সুতরাং যে কোনো একজনের পক্ষে স্বামী পরমানন্দের মহিমা প্রকাশের চেষ্টাটা খুবই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা – আমি সকলের কাছে এই ব্যাপারে বারবার নতিস্বীকার করছি – তবু সেই মহান মানুষটির জীবনের ছোট ছোট ঘটনাগুলিও সকলের সাথে শেয়ার করার আনন্দ নেবার জন্যই – এই প্রসঙ্গের অবতারণা !
বাল্য অবস্থা থেকেই গুরুমহারাজ (বালক রবীন) পথে বেরিয়ে পড়েছিলেন৷ ট্রেনে ‘হকারি’ করলে টিকিট কাটতে হয় না, যে কোনো ট্রেনে উঠে পড়া যায় – এই সুযোগটাকেই উনি কাজে লাগিয়েছিলেন। কৃষ্ণদেবপুরে (বাঘনাপাড়া স্টেশনে)-র প্লাটফর্মে উনি শিশু বয়সেই বাবার টি-স্টলে যাওয়া-আসা করতেন এবং বাবাকে সাহায্য করতেন। ফলে ঐ সুদর্শন, অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন বালকটিকে রেলের স্টেশনমাস্টার থেকে চতুর্থশ্রেণীর কর্মচারী কাঁড়ু-বেলদার পর্যন্ত সকলেই ভালবাসতো। কাঁড়ু-তো ওনাকে ‘রামজী’ হিসাবে ভক্তিও কোরতো ! সম্ভবতঃ ওরাই বালক রবীন(গুরু মহারাজ)-কে ‘হকারি’-র একটা লাইসেন্স বানিয়ে দিয়েছিল। সেইজন্যেই গুরুমহারাজের আর কোনো ট্রেনে ওঠা বা পরিভ্রমণ করায় কোনো অসুবিধা হয় নি !
অবতারপুরুষের জীবনে যা কিছু ঘটনা তাঁরা ঘটান – সেগুলি সবই perfect !জাগতিক যে সমস্ত সামান্য সামান্য বিষয় রয়েছে – সেগুলোও তাঁরা অমর্যাদা করেন না, সাধারণ তুচ্ছ নিয়ম-কানুনকেও অমান্য করেন না ! যখন যা করেন তাই perfect ! তখন হাওড়া-নিউজলপাইগুড়ি, হাওড়া-গয়া ইত্যাদি ট্রেনগুলি হাওড়া থেকে কালনা-কাটোয়া হয়ে যাতায়াত করতো। এইসব ট্রেন ধরেই উনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়তেন ওনার আরব্ধ কাজ সম্পন্ন করার জন্য !
আমরা ওনার ছোটবেলাকার ঘটনা শুনে যা বুঝেছিলাম, সেটা হলো এই যে – ঈশ্বরের অবতারদেরও স্থূলশরীরটির বয়স অনুযায়ী শক্তিধারণ বা গ্রহণ এবং শক্তি প্রকাশের সামর্থ্য নির্ভর করে ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন – “এবার তাঁর advance আগমন !” যার জন্য ক্ষেত্র অপ্রস্তুত ছিল ! ওনাকে সব কাজই খুব তাড়াতাড়ি করতে হয়েছে – সেক্ষেত্রে উনি পাত্রাপাত্র বিচার করেন নি, উপযুক্ততা-অনুপযুক্ততা দেখেন নি ! উনি নিজেই বলেছিলেন – ” মা জগদম্বা এবার আমাকে দিয়ে ছাগল দিয়ে যব মাড়াই করিয়ে নেবে।” এই কথাগুলির অর্থ হোল – ঘোরতর অযোগ্য লোকেদের দ্বারা অনেক আপাত অসম্ভব কাজ সম্ভব করিয়ে নেবেন (এই দলে আমরাও পড়ে যাবো!) !
ছোট বয়সের শরীরের উপযুক্ততা-অনুপযুক্ততার কথা কেন বলা হচ্ছিলো__ সেইটা একটু ব্যাখ্যা করা যাক্ ! গুরুমহারাজ ওই যে বলেছিলেন – “ছোটবেলায় মাত্র ৫/৬ বছর বয়সেই আমাকে সবাই ‘কালা’ ভাবতো, ‘ভ্যাবলা’ ভাবতো – কারণ তখন আমি কারো কথা ভালোভাবে শুনতেই পেতাম না বা বুঝতেও পারতাম না – ফলে তারাও আমাকে বুঝতো না এবং আমিও তাদেরকে বুঝতে পারতাম না !” এছাড়া যেটা হোতো সেটা হোল – কিশোর বয়সে বা প্রথম যৌবনে গুরুমহারাজের ঘনঘন ভাবসমাধির প্রকাশ ! এর ফলে এমন হয়েছে যে, গুরুমহারাজের হাতের আঙ্গুলে জলন্ত সিগারেট পুড়তে পুড়তে আঙ্গুলের খানিকটা পুড়ে গেছিল ! ঐ সময় যেহেতু তাঁর শরীরে কোনোরকম হুঁশ থাকতো না – তাই মাঝের গাঁয়ের (তৃষাণ মহারাজের যেখানে বাড়ি) কিছু বদ্-ছেলে ঐ অবস্থায় গুরুমহারাজের পায়ের দাবনায় গরম লোহার শিকের ছ্যাঁকা দিয়ে ওনাকে test করতে গেছিলো ! এর ফলে গুরুমহারাজের শরীরের ঐ অংশে দগদগে ঘা হয়ে গেছিলো ! পোড়া দাগটাও ছিল – উনি একদিন ওনার পড়নের গেরুয়া কাপড়ের কিছুটা অংশ তুলে আমাদেরকে দাগটা দেখিয়েছিলেন।
আপনারা আগে শুনেছিলেন গুরুমহারাজের ইলেকট্রিক লাইনের হাইটেনশন পোল থেকে একেবারে পাকা রাস্তার উপরে পড়ে যাবার ঘটনা – সেটাও হয়েছিল ঐ ভাবসমাধি অবস্থাতেই ! এই ঘটনাটা তো ছিল প্রাণসংকট অবস্থা – সাধারণ যে কেউ হোলে সেইদিনই নির্ঘাত মৃত্যু হোত ! এছাড়াও উনি কাটোয়া-বর্ধমান লাইনের বাসের মাথা থেকেও পড়েছিলেন। বাসটি চলন্ত অবস্থায় হঠাৎ turn নিতে যাওয়ায় উনি ছিটকে একেবারে নিচে পড়ে গেছিলেন ! তখনও নিশ্চয়ই উনি ভাবস্থ অবস্থাতেই ছিলেন ! সেক্ষেত্রেও সাধারণ যেকোনো মানুষের মৃত্যু হোতে পারতো – কিন্তু ওনার কিছুই হয় নি ! উনি পড়ে যাবার পর, উঠেই চলন্ত বাসটির পিছু পিছু ছুট লাগিয়েছিলেন বাসটাকে ধরার জন্য ! কারণ ওই বাসে ওনার ব্যাগটি ছিল – যাতে কোম্পানির কিছু টাকা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল !