গুরুমহারাজের মহিমার কথা এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। এই বিষয়ে যদি পরমানন্দ-ভক্তগণের অনেকেই কলম ধরেন, তাহলে লক্ষ লক্ষ পাতার গ্রন্থ রচনা হয়ে যেতে পারে! কারণ পরমানন্দ ভক্ত (নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে)-দের প্রত্যেকেরই এই ব্যাপারে কিছু না কিছু বলার আছে। হয়তো চক্ষণজাদীর টগরদা, রায়নার জগদা বা হারুদা, অথবা তৃষাণ মহারাজ (স্বামী পরমেশ্বরানন্দ)-এর মতো গুরু মহারাজের প্রথম দিকের সাথীরা অনেক অনেক বেশি বেশি বলতে পারবেন, ওনারা আমাদের কাছেও অনেক অনেক কথা বলেছেন – সেগুলিও এখানে বলার চেষ্টা করা হয় ! সেই সব ঘটনা বলতে গিয়ে (লিখতে গিয়ে) অনেক সময় ঘটনা পরম্পরার বা মূল ঘটনার কিছু না কিছু চ্যুতি-বিচ্যুতিও ঘটে যায় – তখন ওনারাই আবার পরে সংশোধন করেও দেন – এইভাবেই এগিয়ে চলেছে *পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা* !
যে কথাটা আগের আগের আলোচনায় শুরু করেছিলাম যে, যে কোনো মহাপুরুষের “ভাবাবস্থার” স্থায়িত্বকাল বেশি হোলে তাঁদের কতরকম অসুবিধা হয় ! শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর‌ও হয়েছিল – ভাবাবস্থায় কৃষ্ণবিরহী রাধার ভাবে বিভোর হয়ে মাটিতে পড়ে মুখ রগড়াতেন, তাছাড়া হঠাৎ হঠাৎ পড়ে গিয়ে সারা অঙ্গে আঘাত প্রাপ্ত‌ও হোতেন !
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনেও আমরা বহুবার এই একই রকমের ঘটনার উদাহরণ পেয়েছি ! আর আমরা এখন আলোচনা করতে চাইছি, এই যুগের ঠাকুর – এই কালের চৈতন্য-দানকারী মহাপ্রভু স্বামী পরমানন্দের কথা !
গুরুমহারাজ একবার পূর্ব বর্ধমানের মাঝের গ্রামে (তৃষাণ মহারাজের গ্রামের বাড়ি যেখানে) rural electrification-এর কাজ করছিলেন। সেইসময় কোনো ব্যাপারে চিন্তার গভীরতা আসতেই ওনার মন হু-হু করে ঊর্ধ্বগতি লাভ করতে থাকলো। উনি বুঝতে পারছিলেন – কিছুক্ষণের মধ্যেই ওনার শরীরের আর কোনো আঁট থাকবে না ! তাই উনি মাঠের (যেখানে ইলেকট্রিকের তার টাঙানো হচ্ছিল বা অন্য কাজ চলছিল) দিক থেকে দ্রুত ফিরে আসছিলেন ওনার ক্যাম্পের ঘরের দিকে !
গুরুমহারাজের নিজের কথায় ঘটনাটা বলা যাক – ” ঐদিন কি হয়েছিল জানিস ! আমি বুঝতে পারছিলাম – আমার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গ্রন্থিগুলি আলাগা হয়ে যাচ্ছে – ফলে কোনকিছুই ঠিক মতো কাজ করছিলো না ! চেতনা এককেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছিলো –এমনটা হোলে আমার তখন নিজের শরীরের উপর কোনো control-ই থাকতো না ! তবুও আমি জোর করে আমার মনকে নিচের দিকে ধরে রাখছিলাম__ যাতে যত দ্রুত সম্ভব আমার ক্যাম্পের ঘর পর্যন্ত যেতে পারি ! খুবই তাড়াতাড়ি আসছিলাম – কিন্তু মাঠ থেকে পাকা রাস্তায় ওঠার ঠিক আগেই একটা বড় নালার মতো ছিল – আর ওইটার উপর দিয়ে যাতায়াতের জন্য গ্রামের মানুষ নালার উপরে একটা বাঁশের চাটা পেতে রাখতো ! বর্ষার জল পেয়ে পেয়ে সেই চাটাগুলি পলকা হয়ে গেছিলো – তাছাড়া দু-একটা চাটা উঠে গিয়ে ফাঁক ফাঁকও হয়ে গেছিলো।
আমাকেও ওটার ওপর দিয়েই আসতে হবে – কিন্তু আমার তো পায়ের উপর তখন কোনো control-ই ছিল না ! তাই টলমল পায়ে ওটার ওপর উঠতেই নিচে পড়ে গেলাম ! নিচে জলনিকাশি বড় নালা ছিল – সেখানে জলের চাইতে কাদা বা পাঁকের পারিমাণ বেশী ছিল। আমি এমনভাবে পড়েছিলাম যে, আমার পুরো মাথাটা পাঁকের মধ্যে গুঁজে গেল, আর পুরো শরীরটা বাইরে ছিল –! এই অবস্থায় কতক্ষণ পড়েছিলাম তার ঠিক নাই ! ঐ পথ দিয়ে যখন অন্য কোনো এক ব্যক্তি আসছিল __সে-ই প্রথম লক্ষ্য করেছিল। তার চেঁচামেচিতে কিছু মানুষ জড়ো হয়ে আমাকে পাঁক থেকে তুলেছিল এবং জল ঢেলে কাদা-পাঁক পরিষ্কার করে আমাকে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল।”
তাহলে বোঝা যাচ্ছে, পুরো মাথাটা কাদা-পাঁকের মধ্যে যদি ২ol২৫ মিনিট বা আধঘন্টা কারো ঢুকে থাকে, তাহলে সে কি বাঁচতে পারে ? কিন্তু কোনো যোগীর ক্ষেত্রে এটা কোনো সমস্যা নয় ! কারন ভাবসমাধির অবস্থায় তাঁর শ্বাস তো আর নাসিকায় বয় না, তখন শ্বাস বয় অন্তঃনাড়ীতে ! আর গুরুমহারাজ হোলেন “মহাযোগী- মহেশ্বর”– মা জগদম্বার অত্যন্ত আদরের প্রিয় সন্তান !– ফলে তাঁর কথা সম্পূর্ণভাবে স্বতন্ত্র !
কিন্তু আমাদের যেটা আলোচনার বিষয় ছিল সেটা হোল – মহাপুরুষ বা অবতার পুরুষদের শারীরিক যন্ত্রণাভোগ ! এই যে গুরুমহারাজ নানাভাবে শারীরিক কষ্টগুলি পেয়েছিলেন – এইগুলি আমাদের খুবই ব্যথার কারণ। যে কোনো অবতারপুরুষরাই এই ধরনের নানারকম শারীরিক নিগ্রহ ভোগ করেন – এটা সত্যিই ! তাহলেও আমাদের পরমারাধ্য গুরুদেবের জীবনে ঐ সমস্ত ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা স্মরণ হোলে খুবই কষ্ট হয়। এখন বুঝতে পারি চৈতন্যভক্ত গোবিন্দদাস কেন লিখেছিলেন – “গৌরাঙ্গের নিছনি লইয়া মরি !”(ক্রমশঃ)