জিজ্ঞাসু : ~ গোটা পৃথিবীজুড়েই তো দেখা যাচ্ছে শুধু হিংসা , রক্তপাত , অস্ত্রের ঝনঝনানি ! প্রায় সব দেশই নানান সমস্যায় জর্জরিত ।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে __সবার‌ই নিজের নিজের সমস্যা রয়েছে , তা সত্ত্বেও তারা আবার অপরাপর দেশকেও সমস্যায় ফেলার জন্য উন্মুখ ! বিশ্বের এরকম পরিস্থিতি-ই বা কেন আর এর প্রতিকারই বা কী ?
গুরু মহারাজ : ~ একে বলা হয় saddism , অপরকে দুঃখ দিয়ে নিজে এক প্রকার সুখ (আনন্দ নয়) অনুভব বা উপভোগ করা ! কোন্‌ মানুষ Saddist হবে , তা যদি তার ছোটবেলা লক্ষ্য করা যায় – তাহলেই বুঝতে পারবে । যেমন ধরো , গ্রামের যে বাচ্চা ছেলেটি একটা ছোট কাঠি নিয়ে কোন পোকা বা মাকড়কে খোঁচা দিয়ে দিয়ে মেরে ফেলেছে । একটু সাহস বাড়লে সেটাকে ধরে তার একটা একটা পা টেনে টেনে ছিঁড়ে দিচ্ছে , পাখনাগুলো ছিঁড়ে ওড়ানোর চেষ্টা করছে , ফড়িং-এর পিছনে দড়ি বেঁধে তাকে ওড়াচ্ছে _ জানবে বড়ো হোলে এই ছেলেটিই saddist হবে! আর এই ধরনের ছেলে যদি শহরে বাস করে, তাহলে দেখা যাবে__ সে স্কুলে তার থেকে দুর্বল কোনো ছাত্রকে মাথায় চাঁটা মারছে , ইচ্ছে করে পায়ে পা লাগিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে দিচ্ছে , অকারণে স্যার বা ম্যামের কাছে অপরের নামে নালিশ জানিয়ে তাকে শাস্তি পাওয়াচ্ছে ! আর তাকে শাস্তি পাইয়ে নিজে একপ্রকার সুখ অনুভব করছে !
এগুলি যদি খুব ছোটবেলা থেকেই পিতা-মাতা-শিক্ষকেরা লক্ষ কোরে _ তার প্রতিবিধানের চেষ্টা করে, তাহলে হয়তো ওই শিশুটি বড় হয়ে তার মানসিকতা পাল্টাতেও পারে । শিশুটি বা ব্যক্তিটি পাল্টায় না , তার মানসিকতা পাল্টায় বা বদলায় । যদি কোনো শিশুর মা নিজে উন্নত হ’ন বা প্রকৃত অর্থে-ই ‘মা’ হ’য়ে উঠতে পারেন তাহলে সেই মা পারেন – শিশুটির মানসিকতা বা চেতনার Level পরিবর্তন করতে ৷ মায়ের Sacrifice ,তার চোখের জল এটা সম্ভব করতে পারে ! সন্তানের অন্যায় কার্যে অন্যভাবে reaction না করে __তার চোখের দিকে তাকিয়ে ব্যাথাকাতর মায়ের অশ্রু যদি ঝরে, তাহলে নিষ্ঠুর বৃত্তিসম্পন্ন সন্তানও ধীরে ধীরে সহানুভূতিশীল হয়ে উঠতে পারে !
‘মা’ ছাড়া ঐ ধরণের কোনো ছেলে বা মেয়েকে শোধরাতে পারেন আচার্য বা গুরু । ঠিক ঠিক শিক্ষাগুরুও প্রকৃত গুরুর ভূমিকা পালন করতে পারেন ! এমন অনেক Record রয়েছে !
তবে একটা প্রধান শর্ত সব সময়-ই কাজ করে__ সেটা হচ্ছে ‘আত্মকৃপা’ ৷ মানুষ নিজেই পারে নিজেকে চেঞ্জ করতে , অর্থাৎ মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে তার চেতনার Level-কে উন্নীত করতে । এছাড়াও ভালো মানুষ , উন্নত মানুষের সংস্পর্শ বা সাহচর্য __এর অন্যতম শর্ত ।
তবে দ্যাখো , পৃথিবী গ্রহ তো এখনও শৈশব অবস্থায় রয়েছে ! তাই এখানকার অধিকাংশ মানুষের মানসিকতা উন্নত হবেই কি করে ? সেই অর্থে, এখানকার বেশিরভাগ মানুষই Saddist অর্থাৎ তারা অপরকে দুঃখ দিয়ে সুখ ভোগ করে ৷ পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে যদি চোখ মেলে দ্যাখো __তাহলে দেখবে অধিকাংশ তাবড় তাবড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যেমন –হিটলার , স্তালিন , রোমসম্রাট নিরো , হুণ নেতা মিহিরগুল , ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনী , ইরাকের সাদ্দাম , লিবিয়ার গাদ্দাফি , ভারতের অত্যাচারী তুর্কী ও মুঘল সম্রাটেরা – এরা এরা সবাই Saddist !
ভারতবর্ষের বাইরে অন্য কোনো দেশের Philosophy বা দর্শন বিশেষত: সেমেটিক দর্শন __ চূড়ান্ত সত্যের উপলব্ধি কিভাবে হয় অথবা পরমবোধে বা পূর্ণত্বে কিভাবে উপনীত হওয়া যায়__সেকথা বলতে পারে না ৷ অপূর্ণতা রয়েই যায়। ফলে এইসব দর্শন বা Philosophy যারা মেনে চলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ , অপূর্ণতা সবসময় কাজ করে । তাই এদের রাজনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে, এমনকি ধর্মীয় ভাবেও হিংসা-রক্তপাতের প্রবণতা এদের মধ্যে খুবই রয়ে যায় ।
ধর্মীয়ভাবে বিচার করলে দেখা যায়__ ভারতীয়রা ভাগ্যবান ! কারণ এখানে ‘ধর্ম’-কে সনাতন বলা হয়েছে , আর পৃথিবীতে একমাত্র ভারতীয় দর্শন‌ই পূর্ণতার সন্ধান দেয় । সেই জন্যেই দেখা যায় _ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নেতারা বারবার যুদ্ধ ঘোষণা করেছে , পৃথিবীতে রক্তপাত ঘটিয়েছে । অপরপক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যাত্মচেতনায় উন্নত ধর্মীয় নেতারা “শান্তি”-র বাণী শুনিয়েছে পৃথিবী কে ! ধ্যান , যোগ , প্রাণায়াম , ত্যাগ , ভালোবাসা – এইসব শিক্ষা দিয়েছেন তাঁরা । প্রাচীন ভারতে রাজন্যবর্গ কোনো না কোনো আধ্যাত্মিক ব্যক্তিকে তাঁদের গুরুর আসনে বসাতেন এবং তাঁদের আদেশ ও নির্দেশ মেনে রাজত্ব চালাতেন । এই জন্য ভারতবর্ষের কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অস্ত্র নিয়ে অন্য দেশকে Dominate করেনি ৷ সম্রাট অশোক বুদ্ধের শান্তির ললিত বাণী নিয়ে সিংহলের রাজার সাথে মিত্রতা করেছিলেন । পাল বংশীয়রা শ্যাম , কম্বোজ (বর্তমান থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ইত্যাদি)- ইত্যাদি দ্বীপরাষ্ট্রগুলিতে (যেগুলি পূর্বে বৃহত্তর ভারতেরই অংশ ছিল) শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রসার ঘটিয়েছিল । এখনো সেই সব স্থানে প্রাচীন কীর্তি-গুলিই সেখানকার গৌরব বর্ধন করে আসছে । … [ক্রমশঃ]