শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের জীবনে প্রকাশিত মহিমার কথা – আমরা যেটুকু জানি, সেইগুলি এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। স্বামী পরমানন্দের অনন্ত মহিমান্বিত জীবন – তাই তাঁর মহিমার কথা কখনোই বলে শেষ করা যাবে না। ‘শেষ করা যাবে না’– অর্থে মানুষ তো তাঁর সব মহিমার কথা জানতেই পারেনি – তাহলে তা প্রকাশ করবেই বা কী করে ? তিনি কৃপাবশতঃ, অপত্য স্নেহবশতঃ যেটুকু নানা সময়ে টুকরো টুকরো ভাবে আমাদের কাছে বলেছেন – সেইগুলিকে এখানে একত্র করে তুলে ধরার প্রয়াস করা হোচ্ছে – এইমাত্র !
আগের দিন আমরা আলোচনা করছিলাম – হরিদ্বারে এক ভক্ত (ত্যাগীজী)-এর বাড়ি থাকাকালীন সময়ে এক ময়রার দোকানদার হনুমানের উৎপাত থেকে বাঁচার জন্য একথালা লাড্ডুতে বিষ মিশিয়ে দোকানের সামনেটাতে সাজিয়ে রেখেছিল ! কিন্তু হনুমানের দল সেদিন প্রথমেই ঐ লাড্ডু গ্রহণ করে নি – অনেক পরে একটি বৃদ্ধ হনুমান এসে কিছু লতাপাতার রস মিশিয়ে – ঐগুলিকে বিষমুক্ত করে দিয়েছিল এবং সকলে তখন কাড়াকাড়ি করে ঐ লাড্ডু খেয়ে নিয়েছিল।
এই ঘটনাটা উল্লেখ করে সেদিন গুরুমহারাজ বলেছিলেন – জীব বিবর্তনের ক্রমে সবচাইতে উপরে রয়েছে ‘নর’ আর তার আগের stage-টাই হলো ‘বানর’! তাই হনুমান-বানর-শিম্পাঞ্জি-গরিলা ইত্যাদি প্রাণীরাও খুবই বুদ্ধিমান হয়। কারণ এই অবস্থা থেকেই জীবের মস্তিষ্ক মাটির সাথে vertical থাকতে শুরু করে। এর আগের অবস্থায় বা পশু-পাখি-কীট-পতঙ্গ অবস্থায় মস্তিষ্ক মাটির সাথে parallal বা horizental – যা বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটার পক্ষে অনুকূল নয়। তাছাড়া মেরুদন্ড সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত perineum থেকে penial-এর যে শরীরাভ্যন্তরস্থ বিদ্যুৎশক্তির ক্রিয়া – সেটি ঠিকমতো হয় না অর্থাৎ দুটি শক্তিশালী বিপরীত মেরু সৃষ্টি না হওয়ায় charging হয় না ! আর ঐ দুটি মেরুর মধ্যে charging না হোলে সেই শরীরে অন্তঃপ্রকৃতির তথা মহাবিশ্বপ্রকৃতির লীলারহস্যের অবগুণ্ঠন উন্মোচিত হয় না !
একমাত্র মানবশরীরেই ঐ দুটি মেরুর ক্রিয়াশীলতা সর্বাধিক হয় – আর সেইজন্যে সকল জীবের মধ্যে মানবশরীরেই ঈশ্বরলাভ অর্থাৎ পূর্ণতালাভ সম্ভব হয়।
যাইহোক, আমরা ছিলাম হরিদ্বারের গঙ্গাতীরবর্তী অঞ্চলের একপাল হনুমানের কথায়। সেদিন ঐ স্থানের বহুমানুষ ঐ আশ্চর্য ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছিল ! হিমালয় – শুধু দেবতাত্মা হিমালয়-ই নয়, হিমালয় হ’ল ভেষজ উদ্ভিদের একেবারে store-house ! রাবণের শক্তিশেলের আঘাতে ‘প্রায়-মৃত’ লক্ষণকে বাঁচাতে ভগবান রামচন্দ্র তাঁর সবচাইতে প্রিয় সহচর, বুদ্ধিমান, জ্ঞানী, হালকা বায়ুযান চালনায় সক্ষম – হনুমানকে পাঠিয়েছিলেন হিমালয়ে। তখন তাঁরা অবস্থান করছিলেন তৎকালীন ভারতবর্ষের দক্ষিণপ্রান্তে, কিন্তু জীবনদায়ী ঔষধ আনতে হনুমানকে পাঠিয়েছিলেন ভারতের উত্তরপ্রান্তে__ হিমালয়ে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে, সমগ্র ভারতবর্ষের মধ্যে একমাত্র হিমালয়েই জীবনদায়ী ভেষজ রয়েছে । প্রাচীন শাস্ত্রাদিতে হিমালয়ের এই মহান দিকটির কথা উল্লেখ‌ও রয়েছে – তবু আমরা ভারতীয়রা এই সব কথার অতটা মর্যাদা দিই না !
তবুও আমরা গুরুমহারাজের কাছে শুনেছিলাম – যে দেরাদুনে (!) অবস্থিত ‘হিমালয়ান ড্রাগ কোম্পানি’-র ঔষধকে ‘বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা’ খুবই মান্যতা দেয় এবং ঐ ঔষধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিকে বেশ কয়েকবার শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছে !
তাই হিমালয় যেমন দুর্ভেদ্য, দুর্গম – তেমনি দুর্জ্ঞেয়, নানা রহস্যে পরিপূর্ণ ! চীনাদের হিমালয়কে দখল করার এইটা একটা অন্যতম উদ্দেশ্য ! ওরা যে শুধুমাত্র উচ্চ উচ্চ pick-গুলি দখল করে সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র fit করে রেখে সমগ্র এশিয়ার দখল নেবার স্বপ্ন দেখছে বা ঐসব অঞ্চলে tower বসিয়ে – গোটা বিশ্বের information technology-র উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার স্বপ্ন দেখছে অথবা ঐ সুউচ্চ স্থান থেকে সবদেশের উপর নজরদারি করতে পারবে – তা-ই নয় ! ওরা হিমালয়ের অনন্ত অতুল সম্পদ [খনিজ, বনজ, ভেষজ – এমনকি আধ্যাত্মিক অর্থাৎ বিভিন্ন সাধু-মহাত্মার তপঃপীঠ বা সাধনস্থল – বিভিন্ন আধ্যাত্মিক field (যার মধ্যে স্বামী বিশুদ্ধানন্দ বর্ণিত ‘জ্ঞানগঞ্জ’ একটি)– ইত্যাদি] – ওরা নিজেদের দখলে নিতে চায়।
হরিদ্বারের সেই বৃদ্ধ হনুমানের কথা বলতে গিয়ে নানা কথার অবতারণা হয়ে গেল ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন হনু-বানর-শিম্পাঞ্জি ইত্যাদিরা বহু ভেষজের ব্যবহার জানে ! যেগুলি তারা তাদের শরীরের কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি হলে ব্যবহার করে। উনি বলেছিলেন সাধারণ অন্যান্য প্রাণীরাও তাদের প্রয়োজনে ভেষজ ব্যবহার করে। কুকুর বা বিড়ালদের পেটে কিছু উল্টাপাল্টা চলে গেলে – ওরা বিশেষ ঘাস বা বিশেষ গাছের পাতা খেয়ে বমি করে দেয়। বানর এবং ভল্লুকেরা purgative জাতীয় গাছের ফুল, ফল, পাতা খেয়ে পেট পরিষ্কার করে। হাতি, বানর, ভল্লুকে ইত্যাদিরা বিশেষ বিশেষ গাছের ফুল, ফল, পাতা খেয়ে নেশা করে এবং আনন্দে নৃত্য করে ! এসব গুরুমহারাজ বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর সময় নিজের চোখে দেখেছিলেন !
হরিদ্বারের ওই বৃদ্ধ হনুমানটিও এমন অনেক গাছপালার খবর জানতো – যা দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রকার বিষের বিষক্রিয়া নষ্ট করা যায় ! সেইজন্য হনুমানটি প্রথমে এসে ওই লাড্ডুগুলি শুঁকে পরীক্ষা করেছিল – কি ধরনের বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে — তারপর ও গভীর জঙ্গলে ঢুকে ঠিক ঐ বিষটির প্রতিষেধক কোনো লতাপাতা নিয়ে এসেছিল এবং সেইটা মিশিয়ে দিতেই ঐ লাড্ডুগুলির বিষক্রিয়া নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। (ক্রমশঃ)