শ্রী শ্রী গুরুমহারাজের জীবনে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনার মধ্যে প্রকটিত মহিমা শক্তির প্রকাশের কথা আলোচনা করতে গিয়ে গুরুমহারাজের সঙ্গে বিভিন্ন পশু-পাখি-সরীসৃপ ইত্যাদির ঘটা বিভিন্ন ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হচ্ছিলো। তাছাড়াও গুরুমহারাজ বিভিন্ন পশু-পাখি বা অন্যান্য প্রাণীকে কি করে কব্জা করা যায়, কি কৌশলে তাদেরকে বশ করা যায় বা কিভাবে হিংস্র পশুদেরকে শিকার করতে হয় – সেইসব কথাও তিনি সিটিং-এ আলোচনা করতেন ! পূর্ব পূর্ব জীবনের স্মৃতি থেকেও অনেকসময় উনি এইসব কথাগুলি বলতেন। সেইসব জীবন ছিল একেবারে আদিমকালের – যে সময় মানুষ এতোটা সভ্য হয়নি, মানুষ তখন নগরসভ্যতা গড়ে তোলে নি – সেই সময়কার কথা উনি সিটিং-এ তুলে ধরতেন।
বহুদিন আগে একবার ‘পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা’-য় এই ঘটনাগুলির কিছু কিছু অংশ আলোচনা করা হয়েছিল – কিন্তু এবার এই ধরনের ঘটনাগুলিই (যেগুলো আমি গুরুমহারাজের কাছে শুনেছিলাম) একসাথে এখানে উল্লেখ করা হবে। ফলে আপনারা যারা আগেও এগুলি শুনেছেন বা পড়েছেন – তারা একজায়গায় সব কথাগুলোই পেয়ে যাবেন – আর নতুনদের কাছে কথাগুলো যতটা শিক্ষণীয় না হবে, তার চেয়েও বেশি চিত্তাকর্ষক হবে !
গুরুমহারাজ তাঁর এক জন্মের কথা বলেছিলেন – যে শরীরে উনি বা ওনার জনজাতির লোকেরা বাল্টিক সাগরে মাছ ধরার জন্য নৌকা ভাসিয়ে গভীর সমুদ্রে চলে যেতেন। নৌকা তৈরি হতো বড় বড় মাছের হাড় দিয়ে, আর নৌকার কাঠামো বাঁধা হোত বুনো লতা এবং বড় মাছের কর্ড দিয়ে যা শক্ত সুতোর চেয়ে টেঁকসই ! মাছ ধরার বঁড়শির জন্য ধাতু (তামা বা লোহা)-র ব্যবহার হতো। বর্শা, হারপুন, চপার জাতীয় অস্ত্র – এগুলোও ধাতুনির্মিত ছিল। তার মানে হচ্ছে যে সময়ের কথা গুরুমহারাজ বলেছিলেন – তখন সবে সবে ধাতুর ব্যবহার হতে শুরু করেছে অর্থাৎ সে সব হাজার হাজার বছর আগের কথা !
একবার গুরুমহারাজরা তিনজন মিলে (বাকি দুজন এই শরীরেও গুরুমহারাজের সাথেই লীলা করছেন। একজন অবশ্য সদ্য প্রয়াত হয়েছেন !) কোনো এক পার্বত্য জনজাতির কতকগুলি বাচ্ছা ছেলেদেরকে পুরুষত্বহীন বা ‘খোজা’ করার হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। সেই সময়কার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ধর্মনেতারা ছোট ছোট শিশুদেরকে জোর করে ধরে নিয়ে এসে এইসব কাজ করতো। এই কাজে বাধা দিতে গিয়ে ওনাদেরকে অস্ত্রহাতে লড়াই করতে হয়েছিল, ওনার এক সাথী আহতও হয়েছিলেন।
যাইহোক, এটা ছিল অন্য প্রসঙ্গ। আমরা গুরুমহারাজের সাথে ঘটা বিভিন্ন পশু-পাখি বা অন্যান্য জীব জন্তুর ঘটনায় ছিলাম। সেখান থেকেই আমরা আলোচনা করছিলাম যে, বিভিন্ন পশু-পাখিকে কিভাবে কব্জা করতে হয় – সে কায়দার কথাও গুরুমহারাজ বলতেন ! হয়তো এগুলি ওনার পূর্ব পূর্ব জীবনের অভিজ্ঞতায় ছিল ! একদিন উনি – বনের হিংস্র বাঘকে কিভাবে জঙ্গলের লোকেরা ধরতো – তার সম্পূর্ণ বিবরণ দিচ্ছিলেন। সমস্ত বর্ণনাটা শুনে তো আমরা একেবারে ‘থ’ ! আপনারাও তাই হবেন – এটা আমি নিশ্চিত ! পদ্ধতিটা শুনুন।
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – বাঘ ধরার যারা expert তারা জঙ্গলে বাঘ চলাচলের রাস্তা কোনটা তার খবর রাখে ! জঙ্গলের পশুদের চলার পথ মানেই খুবই সরু – দু’ধারে বন-ঝোপে কাঁটাগাছে ঠাসা – তার মধ্যে দিয়ে পথ ! বাঘধরা ব্যাধেরা জঙ্গলাকীর্ণ ঐ সরু পথের মধ্যে এমন জায়গা বাঘ ধরার জন্য নির্বাচন করে__ যার দুপাশে মোটা মোটা বৃক্ষ রয়েছে। ওরা ঐ পথের উপর দিয়ে বড় শক্ত দড়া বা শক্ত বুনো লতা দু-পাল্লা করে প্রথমে ৩/৪ ফুট উচ্চতায় বেঁধে নেয়। এবার ঠিক ঐ সরু পথ বরাবর একটা গোল বা ত্রিকোনা মতো শক্ত কাঠের তৈরি আংটা, দড়া-দুটোর ভিতর পরিয়ে পাক দিতে থাকে। প্রচুর পাক দিতে হয় – যাতে একবার ছাড়া পেলেই ওই দড়াটি অন্ততঃ ৫০/৬o পাক বা তারও বেশি উল্টোদিকে প্রবল বেগে খুলতে থাকে ! এইভাবে মাঝখানে ওই কাঠের আংটাটির ফাঁকটাকে বজায় রেখে – নিচের অংশ ঝোপঝাড় কেটে এমনভাবে ভর্তি করে দেওয়া হয় যাতে, ঐ বাঘটিকে যেতে হলে ঐ ফাঁকমতো অংশের মধ্যে দিয়েই কষ্ট করে যেতে হয় !
এবার আর একটা কাজ করতে হয় – ঐ যে কাঠের শক্ত আংটাটি দুটো দড়ার মাঝখানে set করা রয়েছে, ওইটির সাথে আর একটা শক্ত, লম্বা দড়ি এমনভাবে বেঁধে রাখা হয় যে, ওই দড়িটা টানলেই আংটাটা খুলে যাবে এবং গাছে বাঁধা দু-পাল্লা দড়াটা প্রবলবেগে উল্টোদিকে পাক খেতে থাকবে !
আর বাঘ ধরা পরার সময় __সেটাই হয় ! ফাঁদটা ঐভাবে পেতে ব্যাধেরা আংটায় লাগানো দড়িটা হাতে নিয়ে কাছাকাছি কোন বড় গাছের উপরে চেপে অপেক্ষা করতে থাকে। ঐ পরিচিত পথে কোনো বাঘ যখনই আসে, সে রাস্তার মধ্যে বাধা দেখে প্রথমে খানিকটা ঘাবড়ে যায় – তারপর মাঝখানে একটা ফাঁক রয়েছে দেখে সেখানে প্রথমে মুখ ঢোকায়, তারপর যেইমাত্র সামনের পা দুটো ঐ ফাঁকে ঢোকায় – অমনি দড়িতে টান ! ফলে আংটাটা খুলে যায় এবং বাঘের গায়ে মোটা দড়া এঁটে গিয়ে বাঘ সমেত দড়াটা প্রবলবেগে উল্টোপাকে ঘুরতে থাকে – একেবারে ৫০/৬০ পাক ! ঘটনার আকস্মিকতায় এবং অত পাক খেয়ে বাঘ-বাবাজী তখন একেবারে কেঁচো ! নড়াচড়াও করতে চায় না। কারন তা করতে গেলেই আরও দু-চার পাক ! তখন ব্যাধেরা গাছ থেকে নেমে এসে বাঘটির গায়ে মাথায় হাত বোলায় এবং শক্ত করে পা-গুলো বাঁধে, মুখেও শক্ত করে থলি বেঁধে দেয় এবং ১০/১২ জনে মিলে, বাঁশে বেঁধে কাঁধে করে গ্রামে নিয়ে চলে যায়।