জিজ্ঞাসু : ~ আজকে যা শুনলাম তাতে তো ভারতবাসী হিসাবে এবং হিন্দু হিসাবে আমার খুবই গর্ব হোচ্ছে – আর আমার মনে হয় ভারতীয় সকলেরই তা হওয়া উচিত ! __ নয় কি ?
গুরু মহারাজ : ~ ভারতবাসী হিসাবে গর্ব করতে পারো –তবে ‘হিন্দু’ হিসাবে গর্ব করার কিছু নাই । কারণ সুপ্রাচীনকাল থেকে ভারতবাসীরা কিন্তু কোনোকালেই ‘হিন্দু’ হিসাবে নিজেদেরকে পরিচয় দেয়নি । তুর্কি মুসলমানরা যখন ভারত আক্রমন করলো, তখন ওরাই প্রথম ‘সিন্ধু’-র অপভ্রংশ হিসাবে ‘হিন্দু’ কথাটি ব্যবহার করতে শুরু করলো । ‘সিন্ধুকুশ পর্বতমালা’ হোল ‘হিন্দুকুশ পর্বতমালা’ ৷ হিন্দুকুশ থেকেই ‘হিন্দু’ কথাটা এসেছে ।ওখান থেকে হিন্দি বা উর্দূতে “হিন্দ” হলো, আর ইংরেজরা এটাকেই ‘ইন্ডিয়া’ বানিয়ে দিল । সুতরাং এদের আগে ভারতীয়রা কখনোই হিন্দুও ছিল না, ইন্ডিয়ানও ছিল না । এগুলো বিদেশিদের দেওয়া নাম । “ভারত” – নামটি সংস্কৃত থেকে নেওয়া , ভারতবর্ষ বলা হয়েছে ! ‘বর্ষ’_ মানে বছর নয়, মনুষ্য বসবাসের উপযোগী কোনো মহাজনপদ বা এক একটা বড় অঞ্চলের সাথে ‘বর্ষ’ কথাটা যোগ করে দেওয়া হোতো ! যেমন __উত্তরকুরুবর্ষ, কিম্পুরুষবর্ষ, হিরণ্ময়বর্ষ, ইলাবৃত্তবর্ষ ইত্যাদি ।
যখন থেকে জলপথে বিদেশীরা এই দেশে আসতে থাকলো, তখন তাদের কেউ কেউ এই দেশকে জম্বুদ্বীপও বলতো ! জামের মতো আকৃতি সেই অর্থে জম্বুদ্বীপ । অনেক বিদেশি বণিকদের লেখায় এই দেশকে ‘মশলা দ্বীপ’-ও বলা হয়েছে । সমগ্র পৃথিবীতে এলাচ,লবঙ্গ, দারুচিনি,কেশর ইত্যাদি দামী দামী মশলা সরবরাহ হোত ভারতবর্ষ থেকে । এই দেশের তিন দিকে সাগর বলে যে বিদেশীরা জাহাজে করে আসতো, তারা দেশটিকে দ্বীপ বলে মনে করতো ৷
সে যাই হোক , তুমি বললে নিজেকে ভারতীয় হিসাবে ভেবে গর্ববোধ করছো, কিন্তু বলোতো – বর্তমান ভারতের গর্ব করার মতো কি আছে ? আমি তো তেমন কিছু খুঁজে পাইনা ! অনেক চিন্তা ভাবনা করে দেখেছি ভারতবর্ষের প্রাচীন যা কিছু সম্পদ_সেইগুলো নিয়েই একমাত্র গর্ব করা যায় ! ‘বেদ-বেদান্ত’, পুরাণ-মহাকাব্য, উন্নত যোগী-ঋষি-মহাত্মা-বেদজ্ঞ-আত্মজ্ঞরা ছাড়া ভারতের গর্ব করার সত্যিই কিছুই নাই ! ‘বেদজ্ঞ’ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ , বা বেদের পণ্ডিত নয় – মহাত্মা-মহাপুরুষদের কথা বলছি ৷ ভারতবর্ষের ‘বেদ-বেদান্ত’ আর ভারতবর্ষের ঋষি, মহাপুরুষগণই ভারতবর্ষের সম্পদ ! যা বহু কাল থেকে আজ পর্যন্ত এই দেশের মাথা উঁচু করে রেখেছে ! পৃথিবীকে জ্ঞান , প্রেম , মৈত্রীর বাণী শুনিয়েছে ভারতবর্ষের আচার্যরা(উন্নত আধারের মনীষীরা) ।
আধুনিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যে নামগুলি সামনে আসে অর্থাৎ যাঁরা ভারতবর্ষের মাথা উঁচু করেছেন __তাঁরাও যোগী-ঋষি-মহাত্মাই ছিলেন ! ভারতের বাইরে প্রথম বুদ্ধের বাণী চিনে পৌঁছে দিয়েছিলেন জিন ভিক্ষু, অশোকের রাজত্বকালে শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা(সন্ন্যাসীরা) গিয়েছিলেন ধর্ম শিক্ষা দিতে । আধুনিককালে স্বামী বিবেকানন্দ , শ্রীল প্রভুপাদ অভয়চরণ , যোগানন্দ ইত্যাদিরা পশ্চিমি দুনিয়ায় বেদান্ত ,প্রেম-ভক্তি , যোগ এইসব শিক্ষা পৌঁছে দিলেন । এইভাবে বহুকাল আগে থেকেই ভারতবর্ষের আচার্যকূল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশকে অধ্যাত্মশিক্ষা দিয়ে আসছে !
কিন্তু কি পরিহাস দ্যাখো ! এই ভারতবর্ষেই হয়েছে আধ্যাত্মিকতার চরম স্ববিরোধিতা । মনুষ্যত্বের কি চরম অপমানটাই না হয়েছে ভারতবর্ষে ! জাতপাত , ছোঁয়াছুঁয়ি বা অস্পৃশ্যতা , বিভিন্ন কুসংস্কারের বাঁধন – এইসব দিয়ে এক শ্রেণীর মানুষ, সমাজের অপর বেশিরভাগ মানুষকে কি লাঞ্ছনাই না করেছে ! জানো তো মানুষ __দুঃখ-দারিদ্র সইতে পারে , দুর্বল মানুষ অত্যাচারও মুখ বুজে মেনে নিতে পারে, কিন্তু মানুষ সইতে পারে না অবজ্ঞা আর অবহেলা ! আধুনিক ভারতের তথাকথিত ‘হিন্দু’রা জাতিভেদ , অস্পৃশ্যতা এইসব সৃষ্টি করে এটাই করেছে – মানুষের বা মনুষ্যত্বের প্রতি চরম অবহেলা ও অবজ্ঞা করেছে ৷ আর এটা করেছে দীর্ঘকাল ধরে । বহু মহাপুরুষ শরীর নিতে বাধ্য হয়েছে এর প্রতিকার বা প্রতিবিধানের নিমিত্ত ! ভগবান বুদ্ধ , শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং আধুনিক কালে স্বামী বিবেকানন্দ ভারতবর্ষে শরীর নিয়েছিলেন, বা বলা যায় শরীর নিতে বাধ্য হয়েছিলেন শুধুমাত্র এই কাজ করতেই !! …. [ক্রমশঃ]