জিজ্ঞাসু : ~ তাহলে ‘হিন্দু’ নামটায় আপনার আপত্তি রয়েছে ?
গুরু মহারাজ : ~ দূর পাগল ! এই জন্যই শাস্ত্রে নিষেধ রয়েছে যেখানে সেখানে অধ্যাত্ম-কথা বলতে নেই ৷ স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করতে হয় । বিভিন্ন মহাপুরুষগণ অনেক কথা বলতে চেয়েও বলতে পারেননি শুধু এই জন্যেই ৷ কি কথার কি মানে করে বসলি ! এই আলোচনাটিকে আমার ‘মতামত’ হিসেবে ধরে নিলি ?
আমি “সত্য” বললাম ! সাধারণতঃ মানুষ ইতিহাস থেকে ‘পুরোনো কথা’ বলে, কিন্তু লিখিত ইতিহাসেও ইচ্ছাকৃত এবং অনিচ্ছাকৃতভাব সত্যের অপলাপ করা হয়েছে। আমি কালের ইতিহাস দেখে কথা বললাম , কোন্ শব্দ কিভাবে বিবর্তন হয়েছে তা-ই বললাম । আর তুই এটিকে আমার ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে ধরে নিলি ? শাস্ত্র __তোদের মতো ব্যক্তিকেই ‘আহাম্মক’ বলেছে ! আর শাশ্ত্র এও বলেছে যে “আহাম্মকের ধর্ম হয় না”।
‘হিন্দু’ – এই নামটি বিদেশীরা দিয়েছিল উচ্চারণ ভুল করে । বিশেষত মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন জাতি যখনই সিন্ধুকুশ পর্বতমালা অথবা সিন্ধু নদ অতিক্রম করে এদেশে এসেছে – তারা এদেশের মানুষকে ‘হিন্দু জাতি’ বলে উল্লেখ করেছে । পরে যখন তারা এদেশে রাজত্ব করেছে , তখন ধীরে ধীরে এখানকার মানুষও নিজেদেরকে এই নামে পরিচয় দিতে শুরু করেছে । তোর নাম তো ‘প্রশান্ত’ , তোকে যদি কোন তোতলা ব্যক্তি ‘পোহান্ত’ বলে ডাকে , তুই কি নিজেকে অপরের কাছে ‘পোহান্ত’ বলে পরিচয় দিতে শুরু করবি ? আরবিয়ানদের সাথে কখনো কথা বলেছিস ? ওদের সাথে কথা বললে তোর মনে হবে কোনো তোতলা লোক কথা বলছে । সিন্ধুর অপভ্রংশ ‘হিন্দ্’ , হিন্দু , হিন্দুস্তাঁ , হিন্দুস্থান এইসব কথাগুলি এসেছে ৷ পরবর্তীতে ইউরোপীয়রা এই হিন্দ্-কেই ইন্দ্ , অ্যান্দ্ , ইন্দিয়ান , ইন্ডিয়ান , ইন্ডিয়া – এইরকমভাবে উচ্চারণ করেছে ৷ ইংরেজ রাজত্বকালে ‘ভারতবর্ষ’ – হয়ে গেছে হিন্দুস্তান বা ইন্ডিয়া ।
কিন্তু ভারতবর্ষের প্রাচীন গৌরবমণ্ডিত শাস্ত্রগ্রন্থগুলির দিকে তাকালে দেখা যায় , সেখানে কোনো জায়গায় ভারতীয়রা পরস্পর পরস্পরকে নিজেদেরকে হিন্দু বা ইন্দু বা ইন্ডিয়ান বলে সম্মোধন করেনি ৷ তারা নিজেদেরকে ‘আর্য’ হিসেবেই পরিচয় দিয়েছে । মহিলাদের প্রতি সম্মানজনক সম্বোধন ছিল ‘আর্যে’ বা ‘আর্যা’ । আর আমার নিজস্ব মতামত যদি জানতে চাও তাহলে আমি বলব যে আমি সকল শব্দের (Term) মধ্যেই রয়েছি । সকল ‘শব্দ’-কেই আমি প্রাধান্য দিই, কিন্তু আমি কোনো ‘শব্দ’কেই শুধুমাত্র একটা ‘শব্দ’ – হিসাবে বিবেচনা করি না , আমি শব্দের গভীরে প্রবেশ করি । আমার জীবনে , সমাজ জীবনে এমনকি প্রকৃতিতে সেই শব্দের প্রভাব কি – তা পর্যবেক্ষণ করি , তারপর সিদ্ধান্ত করি ।
(১) যখন আমি নিজেকে ‘হিন্দু’ হিসাবে ভেবেছি তখন দেখি –– কয়েক হাজার মুসলমান উদ্যত অস্ত্র হাতে এসে কোটি কোটি ভারতবাসীকে শাসন করছে ; এখানকার সম্পদ লুটপাট করছে ; এখানকার ঐতিহ্যকে ধ্বংস করছে ৷
(২) যখন আমি নিজেকে ‘হিন্দু’ ভাবি তখন দেখি –– আমি এদেশের অধিকাংশ জনগণকে নিচু জাতি বলে ঘৃণা করছি , অবহেলা ও অবজ্ঞা করছি ।
(৩) যখন আমি নিজেকে ‘হিন্দু’ ভাবি তখন দেখি –– ধর্মের সনাতন আদর্শ ভুলে স্মৃতি-পুরাণ , পাঁজি-পুঁথিতে ‘ধর্ম’-কে আবদ্ধ করেছি ।
(৪) যখন আমি নিজেকে ‘হিন্দু’ ভাবি তখন দেখি –– আমি অসংখ্য মানুষকে অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করছি ৷
কিন্তু , যখন আমি নিজেকে ‘আর্য’ ভাবি তখন দেখি –– (১) আমি এক সুসভ্য জনজাতির সভ্য , যারা বীর , দুর্বার গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে ঘোড়ার পৃষ্ঠে আর পত্পত্ করে উড়ছে সমুন্নত সবুজ পতাকা ৷
আমি যখন নিজেকে ‘আর্য’ ভাবি তখন দেখি –– (২) আমাদের আছে সেই সনাতন আদর্শ যা গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেবার জন্য আমরা দৃঢ় সংকল্প । আমরা বলছি “কৃণ্বন্তু বিশ্বমার্যম”, “বসুধৈব কুটুম্বকম্” ।
আমি যখন নিজেকে ‘আর্য’ ভাবি তখন দেখি –– (৩) সমাজে , দেশে , পৃথিবীতে মানব জাতির সদস্যরা সবাই মানুষ , সেখানে কোন জাতিভেদ , চামড়ার রঙভেদ , বর্ণভেদ , ধর্মের মতভেদ নাই । বৈচিত্র আছে কিন্তু বিরোধ নাই ।৷ (ক্রমশঃ)
গুরু মহারাজ : ~ দূর পাগল ! এই জন্যই শাস্ত্রে নিষেধ রয়েছে যেখানে সেখানে অধ্যাত্ম-কথা বলতে নেই ৷ স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করতে হয় । বিভিন্ন মহাপুরুষগণ অনেক কথা বলতে চেয়েও বলতে পারেননি শুধু এই জন্যেই ৷ কি কথার কি মানে করে বসলি ! এই আলোচনাটিকে আমার ‘মতামত’ হিসেবে ধরে নিলি ?
আমি “সত্য” বললাম ! সাধারণতঃ মানুষ ইতিহাস থেকে ‘পুরোনো কথা’ বলে, কিন্তু লিখিত ইতিহাসেও ইচ্ছাকৃত এবং অনিচ্ছাকৃতভাব সত্যের অপলাপ করা হয়েছে। আমি কালের ইতিহাস দেখে কথা বললাম , কোন্ শব্দ কিভাবে বিবর্তন হয়েছে তা-ই বললাম । আর তুই এটিকে আমার ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে ধরে নিলি ? শাস্ত্র __তোদের মতো ব্যক্তিকেই ‘আহাম্মক’ বলেছে ! আর শাশ্ত্র এও বলেছে যে “আহাম্মকের ধর্ম হয় না”।
‘হিন্দু’ – এই নামটি বিদেশীরা দিয়েছিল উচ্চারণ ভুল করে । বিশেষত মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন জাতি যখনই সিন্ধুকুশ পর্বতমালা অথবা সিন্ধু নদ অতিক্রম করে এদেশে এসেছে – তারা এদেশের মানুষকে ‘হিন্দু জাতি’ বলে উল্লেখ করেছে । পরে যখন তারা এদেশে রাজত্ব করেছে , তখন ধীরে ধীরে এখানকার মানুষও নিজেদেরকে এই নামে পরিচয় দিতে শুরু করেছে । তোর নাম তো ‘প্রশান্ত’ , তোকে যদি কোন তোতলা ব্যক্তি ‘পোহান্ত’ বলে ডাকে , তুই কি নিজেকে অপরের কাছে ‘পোহান্ত’ বলে পরিচয় দিতে শুরু করবি ? আরবিয়ানদের সাথে কখনো কথা বলেছিস ? ওদের সাথে কথা বললে তোর মনে হবে কোনো তোতলা লোক কথা বলছে । সিন্ধুর অপভ্রংশ ‘হিন্দ্’ , হিন্দু , হিন্দুস্তাঁ , হিন্দুস্থান এইসব কথাগুলি এসেছে ৷ পরবর্তীতে ইউরোপীয়রা এই হিন্দ্-কেই ইন্দ্ , অ্যান্দ্ , ইন্দিয়ান , ইন্ডিয়ান , ইন্ডিয়া – এইরকমভাবে উচ্চারণ করেছে ৷ ইংরেজ রাজত্বকালে ‘ভারতবর্ষ’ – হয়ে গেছে হিন্দুস্তান বা ইন্ডিয়া ।
কিন্তু ভারতবর্ষের প্রাচীন গৌরবমণ্ডিত শাস্ত্রগ্রন্থগুলির দিকে তাকালে দেখা যায় , সেখানে কোনো জায়গায় ভারতীয়রা পরস্পর পরস্পরকে নিজেদেরকে হিন্দু বা ইন্দু বা ইন্ডিয়ান বলে সম্মোধন করেনি ৷ তারা নিজেদেরকে ‘আর্য’ হিসেবেই পরিচয় দিয়েছে । মহিলাদের প্রতি সম্মানজনক সম্বোধন ছিল ‘আর্যে’ বা ‘আর্যা’ । আর আমার নিজস্ব মতামত যদি জানতে চাও তাহলে আমি বলব যে আমি সকল শব্দের (Term) মধ্যেই রয়েছি । সকল ‘শব্দ’-কেই আমি প্রাধান্য দিই, কিন্তু আমি কোনো ‘শব্দ’কেই শুধুমাত্র একটা ‘শব্দ’ – হিসাবে বিবেচনা করি না , আমি শব্দের গভীরে প্রবেশ করি । আমার জীবনে , সমাজ জীবনে এমনকি প্রকৃতিতে সেই শব্দের প্রভাব কি – তা পর্যবেক্ষণ করি , তারপর সিদ্ধান্ত করি ।
(১) যখন আমি নিজেকে ‘হিন্দু’ হিসাবে ভেবেছি তখন দেখি –– কয়েক হাজার মুসলমান উদ্যত অস্ত্র হাতে এসে কোটি কোটি ভারতবাসীকে শাসন করছে ; এখানকার সম্পদ লুটপাট করছে ; এখানকার ঐতিহ্যকে ধ্বংস করছে ৷
(২) যখন আমি নিজেকে ‘হিন্দু’ ভাবি তখন দেখি –– আমি এদেশের অধিকাংশ জনগণকে নিচু জাতি বলে ঘৃণা করছি , অবহেলা ও অবজ্ঞা করছি ।
(৩) যখন আমি নিজেকে ‘হিন্দু’ ভাবি তখন দেখি –– ধর্মের সনাতন আদর্শ ভুলে স্মৃতি-পুরাণ , পাঁজি-পুঁথিতে ‘ধর্ম’-কে আবদ্ধ করেছি ।
(৪) যখন আমি নিজেকে ‘হিন্দু’ ভাবি তখন দেখি –– আমি অসংখ্য মানুষকে অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করছি ৷
কিন্তু , যখন আমি নিজেকে ‘আর্য’ ভাবি তখন দেখি –– (১) আমি এক সুসভ্য জনজাতির সভ্য , যারা বীর , দুর্বার গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে ঘোড়ার পৃষ্ঠে আর পত্পত্ করে উড়ছে সমুন্নত সবুজ পতাকা ৷
আমি যখন নিজেকে ‘আর্য’ ভাবি তখন দেখি –– (২) আমাদের আছে সেই সনাতন আদর্শ যা গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেবার জন্য আমরা দৃঢ় সংকল্প । আমরা বলছি “কৃণ্বন্তু বিশ্বমার্যম”, “বসুধৈব কুটুম্বকম্” ।
আমি যখন নিজেকে ‘আর্য’ ভাবি তখন দেখি –– (৩) সমাজে , দেশে , পৃথিবীতে মানব জাতির সদস্যরা সবাই মানুষ , সেখানে কোন জাতিভেদ , চামড়ার রঙভেদ , বর্ণভেদ , ধর্মের মতভেদ নাই । বৈচিত্র আছে কিন্তু বিরোধ নাই ।৷ (ক্রমশঃ)
