শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের সাথে তাঁর ভক্তদের নানা লীলার কথা এখানে বলার চেষ্টা করা হচ্ছিলো। এইসব কথা বলতে গিয়ে অনেক কিছুই হয়তো বাদ পড়ে যাবে – সব কথা বলাও যাবে না, তবু কিছু কিছু তো বলা যাবে ! আর তার মাধ্যমে সেইসব ভক্তদের সাথে “পুরোনো বনগ্রামে”র পরমানন্দ মিশনে বসে গুরুমহারাজের যে লৌকিক অথচ অলৌকিক বা অতিলৌকিক সংযোগ স্থাপন – তারই স্মৃতিচারণের চেষ্টাটাও চলবে ! এতে যদি পাঠককুল সামান্যতম হোলেও কিছু রস পান – তাহলেই এই প্রচেষ্টার সার্থকতা !
স্বামী তপেশ্বরানন্দের কথা এর আগে বেশ খানিকটা আলোচনা হয়েছে – তবু টুকরো টুকরো দু-একটা ঘটনার কথা এখনো বলাই যায়। আমি যখন প্রথম বনগ্রামে গিয়েছিলাম (১৯৮৩) তখনই কাঁচা-পাকা প্রায় সাদা দাড়ি, লম্বা কাঁচা-পাকা চুল বিশিষ্ট তপেশ্বরানন্দ মহারাজকে দেখেছিলাম। তখন বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে যৌবনের ছড়াছড়ি। গুরুমহারাজেরই স্থূল বয়স তখন তিরিশ-এর মধ্যে, প্রায় সমস্ত মহারাজরাই তার নিচে বয়েস ! দু-চারজন তো একেবারেই কমবয়সী ! যেমন কেশব ঠাকুর, তপি-মা – এনারা !
আমি যখন প্রথম আশ্রমে গেলাম (১৯৮৩) তার মধ্যেই বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনের দু-তিনটে শাখা আশ্রমের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল – অন্ততঃ রায়না তপোবন আশ্রম, আজিমগঞ্জ কনশাস্ স্পিরিচুয়াল আশ্রম – এই আশ্রমগুলিতে কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল।
ফলে, বনগ্রামে পাকাপাকিভাবে ‘থাকিয়ে’ মহারাজ বা ব্রহ্মচারী হিসাবে তখন দেখেছিলাম তৃষাণ মহারাজ, মুরারী মহারাজ ছাড়াও হরি মহারাজ, দীপ্তি মহারাজ, মামা মহারাজ (স্বামী কেশবানন্দ), স্বামী তপেশ্বরানন্দ, স্বামী স্বরূপানন্দ, কেশব ঠাকুর, মদন মহারাজ, মিহির মহারাজ, মানিক মহারাজ, অমূল্য মহারাজ, পুতুল-মা, তপি-মা, রেবা-মা, তৃপ্তি-মা প্রমুখদের ! স্বামী পূর্ণানন্দ, স্বামী অসীমানন্দ, স্বামী কৃষ্ণানন্দ – এনারা যাওয়া-আসা করতেন। তবে আমি আশ্রমে যাওয়া-আসা শুরুর কিছুদিন পরেই মিহির মহারাজ (স্বামী প্রজ্ঞানন্দ), খোকন মহারাজ (স্বামী আত্মানন্দ), মানিক মহারাজ (স্বামী অখন্ডানন্দ), অমূল্য মহারাজ (স্বামী অভয়ানন্দ) প্রমুখেরা বনগ্রাম থেকে চলে গিয়ে গুরুজীর নির্দেশে বিভিন্ন স্থানে শাখা-আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে চলে গিয়েছিলেন।
এইভাবে মিহির মহারাজ উত্তরাখণ্ডের ডালহৌসির কাছে বনিখেতে আশ্রম করেন। মানিক মহারাজ এবং অমূল্য মহারাজ একত্রে বাঁকুড়ার ধরমপুরে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। ওইখানেই ছিলেন মহাসাধিকা শবরীমাতা পূর্ণিমা-মা। উনি-ই ওইরকম একটা গরীব আদিবাসী অঞ্চলে আশ্রম তৈরির ব্যাপারে খুবই সহায়তা করেছিলেন। খোকন মহারাজ চলে যান উত্তরপ্রদেশের মজঃফরনগরে। সেখানে উনি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং উত্তরভারতের পরমানন্দ ভক্তগণকে সাথে নিয়ে গুরুজীর অনুমতিক্রমে একটি হিন্দি ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেছিলেন। স্বামী কৃষ্ণানন্দ কিছুদিন বনগ্রামে ছিলেন, তারপরে উনিও মুর্শিদাবাদের রসবেরুলিয়া আশ্রমে চলে যান (কিছুদিন আজিমগঞ্জেও ছিলেন)।
স্বামী শংকরানন্দ (স্যান্ডো মহারাজ)-কে বনগ্রাম আশ্রমে মাঝে মাঝে দেখতাম। উনিও বয়স্ক সন্ন্যাসীর মধ্যেই পড়তেন কিন্তু ওনার বিশাল, দৃঢ় শরীর এবং মেরুদন্ড খাড়া করে হাঁটা-চলা-বসা দেখে ওনাকে খুবই যুবক মনে হোতো। উনি বনগ্রাম আশ্রমে থাকলেই ওনাকে নিয়ে সবাই নানান আলোচনা করতো – এমনকি গ্রামের (বনগ্রামের) ভক্তেরাও ! যেমন – উনি প্রচন্ড খেতে পারেন, উনি খুবই রাগী, গৃহী লোকদের উনি মোটেই পছন্দ করেন না, উনি স্বামী বিবেকানন্দের একনিষ্ঠ ভক্ত, উনি দরাজ গলায় গান করেন, উনি বনগ্রামের শিবমন্দিরে শিবের সঙ্গে শুয়ে ঘুমান, আশ্রমের মাঠের মাঝে মশারি টাঙিয়ে শোয়ার জন্য ২০ হাত /৩০ হাত লম্বা লম্বা দড়ি ব্যবহার করেন – ইত্যাদি ইত্যাদি ! তাছাড়াও কতজন ভক্তের বাড়িতে যত্ন করে ওনাকে খাওয়ানোর পরেও – তাদেরকে ওনার কাছে ‘ঠিকমতো যত্ন হয়নি’– এই অপরাধে বকুনি খেতে হয়েছে – এই নিয়েও খুব আলোচনা শুনতাম ! গুরুমহারাজের সামনেও এই ধরনের আলোচনা হোতো – গুরুমহারাজ সব শুনে বেশিরভাগই চুপ করে থাকতেন, কোনো কোনোসময় সেইসব বাড়ীর মায়েদের চোখের জল দেখে উনি সমবেদনা জানাতেন, একটু দুঃখও প্রকাশ করতেন !
আমি প্রথম প্রথম বনগ্রামে গিয়ে দক্ষিণভারতের দেবেন্দ্রনাথ (স্বামী বিশুদ্ধানন্দ) বা ত্রিপুরার প্রশান্তদা (স্বামী সচ্চিদানন্দ), কাশিনাথদা(স্বামী নির্বাণানন্দ),নিলমনিদা(স্বামী চিদানন্দ), সাবিত্রী মা, মৌনি-মা (কৃষ্ণজ্যোতিপ্রাণা)-কে বনগ্রাম আশ্রমে থাকতে দেখি নি। ওনারা তার আগেই নিজ নিজ স্থানে ফিরে গিয়েছিলেন। দেবেন্দ্রনাথ এবং প্রশান্তদা কোনো নিজস্ব আশ্রম বানান নি, কিন্তু মৌনি-মা ত্রিপুরায় আশ্রম বানিয়েছিলেন (এখনও আছে)! উড়িষ্যার ব্রহ্মচারী কাশীনাথ (স্বামী নির্বানানন্দ), নীলমণিদা (স্বামী চিদানন্দ), সাবিত্রী-মা প্রমুখরাও বিভিন্ন স্থানে আশ্রম বানিয়ে নিয়েছিলেন ! অর্থাৎ ওনারাও গুরুজীর অনুমতিক্রমে নিজ নিজ পছন্দসই স্থানে সাধন-ভজনের নিমিত্ত চলে গিয়েছিলেন। [ক্রমশঃ]