শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের পার্ষদ, ভক্ত, সহকারী-সহচরদের সম্বন্ধে কিছু কিছু কথা বলা হচ্ছিলো। আগে আমরা মৌনি-মা(কৃষ্ণজ্যোতিঃপ্রাণা) সম্বন্ধে কিছু কথা বলেছিলাম – কিন্তু এখন এখানে আরো কিছু বলা যেতে পারে। মৌনি-মা খুবই শান্ত স্বভাবের, সহজ-সরল, গ্রাম্য মহিলা সাধিকা ছিলেন। প্রথমবার যখন উনি ঘুরতে ঘুরতে বনগ্রামে এসেছিলেন – তখন উনি সবসময় মৌনব্রত অবলম্বন করে থাকতেন, কারো সাথে কথা বলতেন না। ওনার ব্রত ছিল __ওনার আরাধ্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে উনি যতক্ষণ না দর্শন করছেন – ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর মৌনব্রত ভঙ্গ করবেন না ! কিন্তু বনগ্রামে এসে গুরুমহারাজের সঙ্গে দেখা হবার পর ‘মৌনি মাতা’ তাঁর দীর্ঘদিনের ‘ব্রত’ ভঙ্গ করেছিলেন। তবু যেহেতু দীর্ঘদিন উনি মৌনব্রত অবলম্বন করেছিলেন – তাই সকলে ওনাকে ‘মৌনি-মা’ নামেই সম্বোধন করতেন।
মৌনি-মা সম্বন্ধে আশ্রমে(বনগ্রাম)-র মহারাজদের কাছে এবং গুরুমহারাজের কাছেও টুকরো টুকরো কিছু কথা আগে শুনেছিলাম, কিন্তু ওনার সম্বন্ধে ভালোভাবে অর্থাৎ বিস্তারিত শুনেছিলাম ন’কাকা (শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়)-র কাছ থেকে। কারণ আগেই বলা হয়েছিল যে, বনগ্রাম আশ্রমে প্রথমদিকে মেয়েদের বা মায়েদের থাকার মতো কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। তাই একেবারে প্রথম দিকের যে দু-একজন ব্রহ্মচারিনীরা এসেছিলেন, তাঁরা গ্রামে ন’কাকা (শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী)-দের বাড়িতেই থাকতেন। তৃপ্তিমা-ই প্রথম ব্রহ্মচারিণী, যিনি গুরুমহারাজকে বলে সাহস করে বনগ্রাম আশ্রমে(দেড়তলা মাটির ঘরটা হবার পর) পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেছিলেন।
যাইহোক মৌনিমা যখন প্রথম এসেছিলেন তখন ন’কাকাদের (মুখার্জিবাড়ি) বাড়িতেই বেশ কয়েক মাস ছিলেন। ওনার সেই সময়কার সাধন-ভজন, আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত অবস্থা ইত্যাদির কথা আমি ন’কাকার কাছে শুনেছিলাম। গুরুমহারাজের সাথে ওনার প্রথম সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা এবং কিভাবে বা কেন উনি (মৌনিমা) তাঁর দীর্ঘদিনের মৌনব্রত ত্যাগ করেছিলেন – সেইসব কথাও আমি ন’কাকার কাছে বিস্তারিত শুনেছিলাম। তাছাড়া গুরুমহারাজ স্বয়ং মৌনিমা সম্বন্ধে কি মন্তব্য করেছিলেন – সেইসব কথাও ন’কাকা কথা প্রসঙ্গে বলতেন। ন’কাকার কাছে মৌনিমা সম্বন্ধে নানা কথা শোনার পর আমার মনে হয়েছিল যে, ন’কাকা মৌনিমার ব্যাপারে খুবই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। গুরুমহারাজও মৌনিমার ছোট থেকেই ত্যাগব্রতী হওয়ার জন্য এবং নিষ্ঠাপূর্বক ও একাগ্রচিত্তে সাধন-ভজন করার জন্য মৌনিমার খুবই প্রশংসা করতেন।
খুব সম্ভবতঃ, বনগ্রামে সাধন-ভজন করা অবস্থাতেই গুরু মহারাজকে কেন্দ্র করে মৌনিমার কিছু দর্শন হয় এবং উনি নিশ্চিন্ত হন যে, উনি যে লক্ষ্যে গৃহত্যাগী হয়েছেন, সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারেন একমাত্র গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ ! ফলে উনি ওনার অন্তরের আকুলতা এবং ওনার দর্শনের সারবত্তা গুরুমহারাজের কাছে প্রকাশ করেন। গুরুজী ওনার প্রতি প্রসন্ন দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়েছিলেন, তারপর ওনাকে আশীর্বাদ করেন এবং আশ্বস্তও করেন ! এরপরে গুরুজী-ই ওনাকে বলেন যে, ” তোমার আর মৌনব্রত পালনের কোন প্রয়োজন নাই, তুমি সেবামূলক কর্ম নিয়ে থাকো – এতেই আমি অধিক প্রসন্ন হব !” এরপর মৌনিমার ব্রহ্মচর্য দীক্ষা হয় এবং ওনার নাম হয় কৃষ্ণজ্যোতিঃপ্রাণা !
আমি প্রথম প্রথম যখন বনগ্রাম আশ্রমে যেতাম, তখন কোনদিন মৌনিমা-কে আশ্রমে দেখিনি। অনেকদিন পর অর্থাৎ ১৯৮৮-৮৯ সালে – কি তারও পরে আমি প্রথম ওনাকে বনগ্রামে দেখলাম। মাথায় একমাথা জটা, কাঁধে গেরুয়া ঝোলা নিয়ে উনি আশ্রমে ঘুরছিলেন। ধবধবে ফর্সা রঙ, রোগা-পাতলা চেহারা, খুবই আস্তে আস্তে এবং ত্রিপুরার বাংলা অর্থাৎ খাস-বাঙাল ভাষায় কথা বলা, আচার-ব্যবহার খুবই মধুর – যেন মাতৃত্বে ভরা ঐ মা-টির সাথে চরৈবেতি কার্যালয়ে আলাপ হয়েছিল ! চরৈবেতির সম্পাদক স্বামী স্বরূপানন্দ পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন – “ইনি-ই মৌনিমা !”
‘উনি ত্রিপুরার যে অঞ্চলে থাকেন – সেটি শহর থেকে দূরে ! সেখানকার মানুষজন অর্থনৈতিকভাবে খুবই দুর্বল – সেখানেই উনি প্রচন্ড প্রতিকূলতার মধ্যে গোটাকয়েক অনাথ মেয়ের প্রতিপালনের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং মানুষজনের কাছে ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতার পাঠ পৌঁছে দেন’ – এইরকম কিছু কথাবার্তা সেদিন হয়েছিল।
মৌনিমার সাথে আমার ভালভাবে আলাপ হোলো ২০০৫/৬ সালে, গুরুমহারাজের স্থূল শরীর ছাড়ার পর। উনি বনগ্রামে এসে কয়েকদিন ছিলেন। একদিন প্রলয় মহারাজ(স্বামী চিন্ময়ানন্দ) আমাকে ডেকে (তখন আমি আশ্রমের স্কুলে শিক্ষকতা করতাম) বললেন, ” মৌনিমা নবদ্বীপধাম ঘুরতে চাইছেন, তারপর উনি কাটোয়ার দিকে যাবেন। তুমি যদি ওনাকে একদিনের জন্য সঙ্গ দাও এবং নবদ্বীপটা ঘুরিয়ে দাও – তাহলে খুবই ভালো হয়।” সেই আমার সুযোগ হয়েছিল সারাদিন মৌনিমার সাথে কাটানোর। ওনার সান্নিধ্যে বুঝেছিলাম যে, সত্যি সত্যিই উনি উন্নত স্তরের সাধিকা ! সাধনার দ্বারা ওনার গ্রন্থি সকল খুলে আলগা হয়ে গেছে, ওনার মধ্যে মাতৃত্বের বিকাশ ঘটে গেছে ! দেখছিলাম _চলার পথে, প্রতিটি পদক্ষেপে ওনার আচরণে দয়া-মায়া-করুণা ইত্যাদি সদগুণের স্বতঃপ্রকাশ ঘটে যাচ্ছিলো ! [ক্রমশঃ]