(গুরু মহারাজ ওনার গর্ভধারিনী ছাড়াও অন্যান্য “মা”-য়েদের নিয়ে আলোচনা করছিলেন। এরপর উনি রায়নার মা এবং ঐ অঞ্চলের অন্যান্য ব্যক্তিদের নিয়েও কথা বলছিলেন।)
……রায়নায় বা ওই অঞ্চলে থাকাকালীন ওখানকার অনেক মানুষের সাথে আলাপ পরিচয় হয়েছিল ৷ ওদের অনেকে পরবর্তীতে আশ্রমে এসেছে – অনেকে হয়তো আসেনি , কিন্তু তারা সকলেই আমাকে ভালবাসে । আমিও তাদের কথা ভাবি বা মনে রাখি ৷ রায়নার হাসপাতালে (Health centre)কম্পাউন্ডার হিসাবে চাকরি করতো গোপাল ঘোষ । ওকে সবাই ‘গোপাল ডাক্তার’ বলতো, কেননা চাকরির অবসরে গোপাল ঘোষ সাধারণ মানুষের চিকিৎসা করতো । তখনকার দিনে ডাক্তারেরা তো গ্রামীণ হাসপাতালগুলোয় থাকতেই চাইতো না – তাই মানুষের চিকিৎসার জন্য কম্পাউন্ডার-রাই মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল ৷ যাইহোক, গোপাল ডাক্তারকে আমার দাদার মতো মনে হোতো । তখনকার (রায়নায়) হারু (হারাধন ঘোষ), মিহির(স্বামী প্রজ্ঞানন্দ) এদের অনেক আব্দার , অত্যাচার ওকে(গোপাল ডাক্তারকে) সহ্য করতে হয়েছে ৷
তবে, রায়নায় থাকাকালীন আমার সঙ্গে জগাদার যখন প্রথম সাক্ষাৎ হোলো এবং জগাদার মা-য়ের সাথে আলাপ হোলো__তখন মনে হোলো যেন কতকালের চেনা ! জগাদার তখন চরম অভাব ৷ একটা কামারশালার উপর ওদের বড় পরিবার চলতো ! বলা যায় _খুব‌ই অসচ্ছ্বলভাবে চলতো ৷ দুবেলা-দুমুঠো অন্নের জোগান দেওয়াটাই তখন ঐ পরিবারের পক্ষে মুশকিল ছিল !
জগদারা দুই ভাই , দুই বউ তাদের ছেলে মেয়ে নিয়ে তখন সংসারের বিরাট খরচ ! আর ১৯৭৬/৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে তখন সংকটকাল চলছে । সমগ্র রাজ্যজুড়েই মানুষের খুবই সংকট চলছে । সেই অবস্থায় বা পরবর্তীকালেও দিনের পর দিন আমি জগাদাদের বাড়িতে থেকেছি । জগাদার মা আমাকে প্রায় কোনোদিনই না খাইয়ে ছাড়তেন না ৷ আমার সাথে দু-চারজন লোকও অনেক সময় থাকতো – ফলে ওদের সংসারের উপর খুবই চাপ পড়তো । কিন্তু ঐ পরিবারটি অতিথি সৎকার করা থেকে কখনো পিছিয়ে আসে নি ! জগাদা তার স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে বা বাঁধা দিয়েও সবার খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করতো ।
বাড়ি (কৃষ্ণদেবপুর)থেকে বেরোনোর পর প্রায় ১১ বছর পথে-প্রান্তরে , পাহাড়ে-জঙ্গলে , নিরন্ন-নিরাশ্রয় অবস্থায় আমার কেটেছে ৷সেই সময় যারা আমার বন্ধু বা হিতাকাঙ্খী ছিল _তারাও ছিল চরম অভাবী ! আমার ভাগের কি পরিহাস দেখো ! সেই জন্য সেই সময় ধনদেবী লক্ষ্মীর উপর আমার একটা ‘মান-অভিমান’ জাতীয় কিছু একটা চলছিল ৷ এটাকে আবার জাগতিক অভিমান বা এইরকম কিছু ভেবো না – যাইহোক একটা কিছু চলছিল ৷ তারপর ‘ও'(লক্ষ্মী) আমাকে কথা দিল আমাকে যারা ভালোবাসে _ তাদেরকে ও দেখবে , তাদের অন্ন-বস্ত্রের অভাব হবে না । আমি দেখতে পাই লক্ষ্মী তার কথা রেখেছে ! সেই সময় আমার পাশে যারা ছিল, এখন তারা সকলেই সচ্ছ্বলতার মধ্যে রয়েছে।
সুতরাং সেই দিক থেকে বিচার করলে_ এখন অর্থাৎ বর্তমানে, আমাদের আশ্রমের লোকসংখ্যা বাড়ছে, খাওয়া-দাওয়ার খরচ বাড়ছে, ঘরবাড়ি হোচ্ছে__ কিন্তু তাতেও কোনো অসুবিধা হবে না – ঠিক চলে যাবে ।
ভক্ত সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি আশ্রমের পরিধিও বাড়ছে । এখানে যারা আসছে, এমন অনেক মানুষ এই শরীরটাকে ভালোবাসে ! এই ভালোবাসা থেকেই তাদের অনেকে আশ্রমকে নানাভাবে সাহায্য করে । সবাই হয়তো রসদদার নয় কিন্তু কর্তব্যবোধে দেয় ! আবার অনেকেই আছে যারা আমার কথায় আশ্রমে প্রয়োজনে অর্থ দেয় বা বিভিন্ন সামগ্রী পাঠায়।
একবারকার ঘটনা বলি __আমি তখন নরওয়েতে ! আশ্রমে তখন ভাতের চালের shortage চলছিল – আমি ওখান থেকেই এখানকার স্থানীয় মিল মালিকদের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম –ধারে আশ্রমে চাল পাঠানোর জন্য ! ওরা দিয়েছিল ৷ এই ঘটনার কিছুদিন পরেই তপেশ্বরানন্দ মহারাজকে চন্দ্রবোড়া সাপের কামড়ালো । প্রথমটায় তো মহারাজ নিজেই পাত্তা দেয়নি , সবাই জিজ্ঞাসা করলে বলেছিল , ” ও বিস্যুতে(বিছে) কাটসে ।” সময়মতো কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় চন্দ্রবোড়ার বিষ Kidney attack করে বসলো ৷
এই অবস্থায় একমাত্র চিকিৎসা dyalisis ৷ আমি আশ্রমে নাই , তৃষাণ তপেশ্বরানন্দ মহারাজকে নিয়ে কোলকাতায় ভর্তি করেছিল কিন্তু ডায়ালিসিস্-এর খরচ যোগানোর টাকা কোথায় ? আমি ওখান থেকেই কোলকাতার ভক্তদের কয়েকজনকে ফোন করলাম –মহারাজের চিকিৎসার জন্য যা খরচ হবে তা তৃষাণের হাতে দাও , আমি দেশে ফিরে সব মিটিয়ে দেব । ওরা দিয়েছিল ৷
আমাদের জহর (জহর ঘোষ , কাটোয়া) ওর আর এমন কি আছে ? তবুও একবার আশ্রমের প্রয়োজনে ২০০০০/- (কুড়ি হাজার টাকা) তৃষাণকে দিয়েছিল ৷ এসব টাকা হয়তো দিয়ে দিতে হবে – কিন্তু দিয়েছিল তো !
এদের সবার কথা আমার মনে আছে। আমাকে যদি কেউ এক গ্লাস জল‌ও খাইয়ে থাকে, তাহলেও এই জীবনে তার আর কোনো অন্নকষ্ট থাখবে না !! (ক্রমশঃ)