*জিজ্ঞাসু* (এক সন্ন্যাসী) : ~ আমি বাংলাদেশের একটি গ্রামে আশ্রম করে থাকি । ওখানকার স্থানীয় হিন্দুরা আমার আশ্রমটি করে দিয়েছে । ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের ভাবাদর্শ গ্রহণ করে আমার সন্ন্যাস জীবন । কিন্তু বর্তমানে ওখানকার মুসলমানেরা খুবই দুর্বিনীত ও অত্যাচারী হয়ে উঠেছে । স্থানীয় মোল্লারা প্রায়ই এসে আমাকে নানাভাবে ভয় দেখায় , হিন্দু ধর্মের প্রতি প্রচন্ড ঘৃণা প্রদর্শন করে এবং বলে যে, ‘খুব শীঘ্রই মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা পৃথিবীতে সংখ্যাধিক্যতা লাভ করবে এবং এই বিশ্ব শাসন করবে’ । আমি মাঝে মাঝে সীমান্ত পেরিয়ে আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই মালদহ , মুর্শিদাবাদ ইত্যাদি স্থানে আসি । এটা হয়তো একটু অন্যায় কিন্তু বাংলাদেশের বর্ডার পার হয়ে প্রতিদিনই বহু বাংলাদেশী ভারতে আসে কাজ করতে , ব্যবসার কাজে এমনকি দোকান-বাজার করতে । তাদের সাথে আসা-যাওয়া করাটা খুব একটা অসুবিধা হয় না । এবার যখন মালদহ হয়ে মুর্শিদাবাদ এলাম তখন অনেকের কাছেই আপনার কথা শুনলাম ৷ তাই আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি , আপনি আমাকে বলে দিন আমি ওখানে কিভাবে থাকবো ? আপনি ওখানে আমার থাকার এবং ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ-স্বামীজীর আদর্শে কাজ করতে পারার আশ্বাস দিন ।
*গুরু মহারাজ* : ~ আশ্বাসের কথা বলছেন কেন ? আপনি তো একটা আশ্বাসে আশ্বস্ত হয়ে বা একটা বিশ্বাসে বিশ্বস্ত হয়েই সন্ন্যাস আশ্রম অবলম্বন করেছেন ! তাহলে আপনার আশ্বাস ও বিশ্বাস দুটোই রয়েছে । এবার যার উপর আপনি আশ্বাস বা বিশ্বাস রেখেছেন তিনি তো জগৎ-নিয়ন্তা ! তাহলে আপনার আবার সংশয় আসছে কেন ? অসংশয় হোন । যাঁর উপর নির্ভর করে ঘর ছেড়েছেন , যৌবনের মোহ , ভোগের মোহ ত্যাগ করেছেন তাঁকেই সব ভার দিয়ে আপনি নিজের কাজটি ঠিক মতো করে যান ।
হিন্দু ধর্মমত বা মুসলিম ধর্মমত নিয়ে যে কথা বলছিলেন, সেই প্রসঙ্গে বলতে গেলে বলতে হয় – দেখুন , প্রকৃতি বা মহাপ্রকৃতি কোনো ধর্মমত সৃষ্টি করেনি ৷ ধর্মমত সৃষ্টি , মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি ইত্যাদি_ এগুলি করেছে মানুষ ৷ তাই মানুষের কৃত কোনো ভুলের শাস্তি মানুষকেই তো ভোগ করতে হবে ৷
পৃথিবীর ধর্মমত সৃষ্টির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় _যতগুলি প্রধান প্রধান ধর্মমত বর্তমান বিশ্বে গ্রহণযোগ্য হয়েছে – তার মধ্যে একমাত্র ইসলাম ধর্মমতই প্রতিষ্ঠা হয়েছে অস্ত্রের ঝনঝনানিতে এবং রক্তের প্লাবনে । সুতরাং সেই শুরু থেকেই ইসলাম মতাবলম্বীরা Muscle Manifestation-এর উপরেই জোর দিয়ে এসেছে বেশি । ফলে Heart এবং Head Manifestation -এ ওরা অনেক পিছিয়ে পড়েছে । মানুষের জীবনে সম্পূর্ণতা বা পূর্ণতার জন্য Head , Heart ও Muscle -এই তিনটিরই সমানভাবে অভিবিকাশের প্রয়োজন হয় ।
আমি কোনো Individual মতামত দিচ্ছি না – বিশ্বমন থেকে বিশ্বের ইসলাম সহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বর্তমান অবস্থার কথা বলছি । দেখা গেছে Head , Heart এবং Muscle -এই তিনটির সমভাবে বিকাশ যখনই যে জাতি বা যে সমাজ অথবা কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঘটেছে – তখন সেই দেশ , সেই জাতি , সেই সমাজ বিশ্বের দরবারে নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে ৷ আর ওই তিনটির সমভাবে বিকাশ না ঘটা কোনো জাতি বা রাষ্ট্র বা জনগোষ্ঠী কখনই সমগ্র বিশ্বে নিজেদের প্রাধান্য বিস্তার করতে পারেনি, আর পারবেও না কখনও । কি করে পারবে ? এটা যেন কোনো মানব শরীরের বিশেষ একটি অঙ্গ মোটাসোটা ও প্রবল হয়ে গেছে, অথচ বাকি গুলি দুর্বল এবং সরু সরু হয়ে রয়েছে – । এই অবস্থাকে কি ওই শরীরকে সুস্থ-শরীর বলা যাবে ? এটা অসুস্থতার লক্ষণ !!
সুতরাং আপনি যে বলছিলেন – কেউ আপনাকে বলেছে যে ‘মুসলমানেরা বিশ্ব শাসন করবে’ – এটা ঠিক নয় ৷ বর্তমান ইসলাম জগতের যা চিত্র তা দেখেই আমি আপনাকে বলছি , এখন তো নয়ই__ অদূর ভবিষ্যতেও এটা ঘটবে না । ইসলামের প্রাচীন ইতিহাস এবং বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে আপনিও নিজে এটা বুঝতে পারবেন যে, ওটা অসম্ভব — ওটা ঘটবে না ।
আপনার ওখানকার (বাংলাদেশের) বর্তমান অবস্থার কথা আপনি বলছিলেন , তার উত্তরে বলতে হয় যে –ঈশ্বরের ইচ্ছা ছাড়া তো কিছু হয় না । আপনার ওখানে থাকা , কিছুটা অত্যাচারিত হয়েই থাকা – এগুলি সবই ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই ঘটে যাচ্ছে ৷ আপনি ওখানে থাকবেন কিনা জানতে চাইলে আমি বলব – আপনি থাকুন ওখানে – চলে আসবেন কেন ? ওখানে থেকেই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এবং স্বামীজীর ভাব ও আদর্শ প্রচার করুন ! ওখানে দল-মত-জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে ভালোবাসতে থাকুন , সকলের বিপদে-আপদে তাদের পাশে থাকুন , সবার জন্য আপনার হৃদয়কে প্রসারিত করে দিন ৷ দেখবেন স্থানীয় মানুষ সংকীর্ণতা ভুলে আপনাকে সাহায্য করবে , আপনার পাশে এসে দাঁড়াবে ।
আর যে কথাগুলো বললাম একটু আগে , সেগুলি হৃদয়ে গেঁথে রাখবেন । ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই সব হয় ! ইসলাম ধর্মমতের প্রতিষ্ঠাও তো তাঁর ইচ্ছাতেই হয়েছে , আবার যদি কখনও এর রূপান্তরের প্রয়োজন হয় __তো তার ইচ্ছাতেই হবে । ইসলাম-জগতে সবচাইতে সমস্যা দারিদ্র ও অশিক্ষা ! কারণ দারিদ্র্য ও অশিক্ষা থেকেই এইসব সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গোঁড়ামি ও কুসংস্কার ঢুকে পড়েছে, আর শুধু ঢোকাই নয়, যেন একেবারে গেঁথে বসে গিয়েছে ! শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গেই এই গোঁড়ামি বা কুসংস্কারের পাহাড় সরে যাবে ।
আপনি যেসব অত্যাচারের কথা বলছিলেন , এগুলো অশিক্ষিত গোঁড়ারা করে । আমি আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি __অদূর ভবিষ্যতে দেখবেন শিক্ষিত মুসলিম ছেলেরা, আপনাদের মত বয়স্ক সাধু-সন্তদের উপর কোনো অত্যাচার করবে না ৷ ঐ যে বললাম __এখন যেগুলি করছে, সেগুলি ঐ অশিক্ষিত , দরিদ্র এলাকার মুসলমান ছেলে-ছোকরারাই ৷ শহরের শিক্ষিত মুসলিম ছেলে-মেয়েরা নিজেদের carrier নিয়ে , নিজেদের উন্নতি নিয়ে Compitition -এ পড়ে গেছে । তাদের এখন আর এসব সংকীর্ণতা নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় নেই ! সুতরাং আগামী দিনে শিক্ষার প্রসার বাড়লেই যে কোনো এলাকায় ছেলে-মেয়েরা সংকীর্ণতা মুক্ত বা গোঁড়ামী মুক্ত হবেই হবে ৷
তবে এখন যেখানে আপনি আছেন, যদি দেখেন সেখানে বসবাস করা সত্যিই আপনার পক্ষে একান্ত অসম্ভব হয়ে পড়েছে __তাহলে স্থানীয়দের সাথে বিরোধিতা করে বসবাস করে তো আপনার কোনো লাভ হবে না ! ওখানে পড়ে থেকে শুধু শুধু অশান্তি ভোগ করা ! সেক্ষেত্রে আপনি অন্য কোথাও আপনার পক্ষে নিরাপদ জায়গা দেখে কুঠিয়া স্থাপন করে সাধন-ভজন করুন , ভগবানের নাম করুন , জনহিতায় কিছু কাজ করুন । এতে আপনারও মঙ্গল হবে – যেখানে থাকবেন সেখানকার স্থানীয় মানুষেরও মঙ্গল হবে ৷
দেখুন _ সাধুর জীবন “আত্মনোমোক্ষার্থং জগদ্ধিতায়” – সুতরাং দুটোর মধ্যে একটা নিয়ে তো একজন সাধুকে থাকতেই হবে ! তবে, ওই দেশ থেকে যখন এদেশে যাওয়া আসা করবেন__তখন legal পাশপোর্ট-ভিসা নিয়েই করবেন। কোনো অনৈতিক কাজ সাধু-সন্তকে শোভা পায় না !
আর স্থান ত্যাগ নিয়ে মনে কোনো Sentiment রাখবেন না । বাংলাদেশে জন্মে অনেক নামকরা মহাপুরুষ ওখান থেকে চলে এসে এদেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন । এর মধ্যে অনুকূলচন্দ্র , লোকনাথ বাবা , রামঠাকুর , ভবা পাগলা , নমঃশূদ্রদের হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুর ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য । এরা সবাই ঝামেলা এড়াতেই ও দেশে থেকে নিজেদের প্রচার-প্রসার না করে __ নির্ঝঞ্ঝাটে কাজ করার জন্য‌ই এইদেশ-টাকে বেছে নিয়েছিলেন ৷ তবে আমার এক এক সময় মনে হয় এই সব শক্তিধর মহাজনেরা যদি ওদেশেই থেকে যেতেন _ তাহলে বোধহয় ঐ দেশটারও ভালো হোতো এবং এদেশের মানুষকেও এতো ঝামেলা সহ্য করতে হোত না ।৷