শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ ভগবান স্বামী পরমানন্দের কথা এবং তাঁর সঙ্গীসাথীদের কথা এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা রায়নার ভক্তদের কথা বলছিলাম, আর রায়নার কথা বলতে গেলে জগাদার (জগন্নাথ দত্ত) কথা আসবেই ! তাই জগাদার কথাও একটু-আধটু বলা হচ্ছিলো। জগাদার সঙ্গে গুরুমহারাজের লীলাকাহিনীর সবটা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় – ওটা একমাত্র জগাদা নিজেই বলতে পারেন। সে কাহিনীর বিস্তৃতিও অনেক – তাই অনেকবার শুনেও সবটা মনে রাখা সম্ভব হয় না !
জগাদার বাড়িতেও গুরুমহারাজের অলৌকিক বা অতিলৌকিক লীলা কম কিছু হয়নি ! ফলে জগাদার বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা (ওনার স্ত্রী বা পুত্র-কন্যারা এবং অবশ্যই জগাদার গর্ভধারিণী)-ও অনেক ঘটনার সাক্ষী ছিলেন। সেইসব লীলাকাহিনীর মধ্যে একটা ঘটনা জগাদার কাছ থেকে যতবার শুনতাম ততবারই অন্তরটা বেদনার্ত হয়ে উঠতো ! মনে মনে হতো – ” হায় – হায় ! পরমারাধ্য গুরুদেব স্বামী পরমানন্দ আমাদের কল্মষ হরণ করার জন্য শরীর ধারণ করে কতই না যন্ত্রণা পেয়েছেন – কতভাবেই না তাঁকে শারীরিক কষ্টভোগ করতে হয়েছে !”
গুরুমহারাজ নিজেও অবশ্য বনগ্রামের সিটিংয়ে ঐদিনের ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। সেইসময় গুরুমহারাজের শরীরে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির তীব্র ক্রিয়া চলছিল। উনি বলেছিলেন যে, সেইসময় ওনার “বৃকোগ্নি” সদা সর্বদা প্রজ্জ্বলিত থাকতো। ফলে যে কোনো পরিমাণ খাবার খেয়েও তা অগ্নিতে ঘৃতাহুতির ন্যায় মুহূর্তে পরিপাক হয়ে যেতো। ওনার পেটের ভেতরটা তখন এমন জ্বালা করতো যে, মনে হোতো হয়তো নাড়ি-ভুঁড়িগুলিই হজম হয়ে যাবে ! যাইহোক, সেইরকম একটা শারীরিক অবস্থার মধ্যে একদিন জগাদা দেখেছিলেন – গুরুমহারাজ তাদের বাড়িতে ঘরের ভিতর চৌকির নিচে যে ‘কাতা’র (নারকেল দড়ি) দড়ির ‘পাপোশ’ ছিল – সেটা থেকে নারকেল দড়িগুলোই খেয়ে চলেছেন ! জগদা তো প্রথমটায় বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন ! তারপর জগাদা “কি করছো ?” “কি করছো ?”- বলতে বলতে মুখের মধ্যে থেকে ছোবড়ার দড়ি ধরে টানাটানি করে কিছুটা বের করে দিয়েছিলেন ! কিন্তু ততক্ষনে বেশ খানিকটা গলাধঃকরণ হয়ে গিয়েছিল !
গুরুমহারাজের শরীরের যেকোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই অত্যন্ত soft এবং sensitive ছিল। সুতরাং নারকেলের ‘কাতা’ দড়ি চিবানো এবং তা জোর করে গলা থেকে বের করার চেষ্টায় গুরুমহারাজের মুখবিবরের অংশ একটু-আধটু নিশ্চয়ই ‘ছড়ে’ গেছিলো এবং এর ফলে পরবর্তী আরো দু’একদিন তাঁর অন্নগ্রহণে নিশ্চয়ই খুবই অসুবিধা হয়েছিল(এটাই আমাদের অন্তরের বেদনা!) !! এইজন্যেই বলা হচ্ছিলো যে, ভগবান আমাদের মতো সাধারন দোষে-গুণে মানুষদের উদ্ধারের জন্য, তাদেরকে উত্তরণের পথ দেখানোর জন্য শরীর ধারণ করেন – অথচ নিজেরা কতোভাবে কতো কষ্ট ভোগ করেন – তা ভাবলে অবাক বা বিস্মিত হ‌ওয়াই নয়__বেদনার্ত হোতেই হয় !
রায়না থেকে আমরা এখন আবার বনগ্রামে ফিরে আসি। বনগ্রামে পরমানন্দ মিশনের জন্মলগ্ন থেকে ঐ গ্রামের মুখার্জি পরিবার, স্বপন গোস্বামী (স্বপন খুড়ো), রাম মন্ডল (রাম খুড়ো) – প্রমুখরা ছাড়াও আর একজন ব্যক্তিও ছিলেন – তিনি হলেন নবু মাষ্টার বা রঞ্জিত দাস ! উনি প্রাইমারি টিচার ছিলেন এবং ডাকনাম ছিল ‘নবু’ – তাই গ্রামে ওনার পরিচিতি ছিল “নবু মাস্টার” হিসাবে। ছোটখাটো চেহারার মানুষ ছিলেন এই নবু মাস্টার কিন্তু খুবই ধুরন্ধর, বুদ্ধিমান এবং বিচক্ষণ লোক ছিলেন। আশ্রম নির্মাণের প্রথম অবস্থা থেকে পরবর্তীতে জমিজমা কেনা, ঘরবাড়ি তৈরি, আশ্রমের পত্রিকার (চরৈবেতি) পরিকল্পনা – ইত্যাদি সকল বিষয়ে গুরুমহারাজ ঐ মানুষটির পরামর্শ গ্রহণ করতেন। আমরা প্রথম প্রথম দেখতাম আশ্রমের যেকোনো development work-এর meeting-এ গুরুমহারাজ, তৃষাণ মহারাজ, মুরারী মহারাজরা ছাড়াও গ্রামের মুখার্জিবাড়ির সদস্যরা (বিশেষ করে মেজোকাকা ও ন’কাকা), স্বপন খুড়ো (গোস্বামী) প্রমুখের সঙ্গে রঞ্জিত মাস্টার বা নবু মাস্টার অবশ্যই উপস্থিত থাকতেন।
চরৈবেতি পত্রিকার (১৯৮৩ সাল থেকে) starting থেকেই নবু মাস্টার এই পত্রিকা প্রকাশের ব্যাপারে অন্যতম মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন এবং উনি প্রথম থেকেই চরৈবেতি পত্রিকার সংযুক্ত সম্পাদক ছিলেন। চরৈবেতি পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর লেখাগুলো পড়লে বোঝা যায় তাঁর আধ্যাত্মিক বিষয়ে সম্যক ধারণা ছিল, তাছাড়া উন সেইসময়কালীন গুরুমহারাজের করা আলোচনাগুলিও তাঁর ঐ লেখাগুলির মাধ্যমে তুলে ধরতেন। নবু মাস্টারের আর একটা বড় গুণ ছিল – উনি খুব ভালো ধর্মালোচনা করতে পারতেন। সেই হিসাবে আশ্রম প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে নবু মাস্টারও নবাগত ভক্তদের কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। বিশেষতঃ বাঁকুড়া অঞ্চলের ভক্তরা নবু মাস্টারকে গুরুর ন্যায় শ্রদ্ধা করতো ! এমনও হয়েছে যে, গুরুমহারাজ হয়তো দীর্ঘদিন বাঁকুড়া (ধরমপুর) অঞ্চলে যেতে পারেন নি – গুরুমহারাজের অনুমতি নিয়ে বাঁকুড়ার বাবা (নবু মাস্টার) ঐ অঞ্চলে গিয়ে ধর্মালোচনা করে মানুষের মনের তৃপ্তি ঘটিয়েছেন।
[প্রসঙ্গত একটা কথা বলে রাখা যায় _গুরু মহারাজের দেওয়া একটা বিশেষ “চিঠি” _যেটি সহস্র সহস্র পরমানন্দ ভক্তদের কাছে ভরসা-অনুপ্রেরণা-জীবনীশক্তি দানকারী হিসাবে বিবেচিত ও পরিচিত_যে চিঠির ছত্রগুলি অনেক ভক্তের মুখস্থ—-“আমার সন্তানরা চিরপবিত্র,…. যারা আমাকে ছুঁয়েছে তারাই পবিত্র হয়ে গেছে…. আমি দায়ী হবো,যদি তারা আমাকে স্মরণে রাখে! আমি ভোগ করবো, যদি তারা আমাকে ভালবাসে… ইত্যাদি” _ ঐ চিঠিটি গুরু মহারাজ নবু মাষ্টারমশাইকেই দিয়েছিলেন।] [ক্রমশঃ]