শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর বিশিষ্ট ভক্ত-পার্ষদদের বিষয়ে কিছু কিছু আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা এর আগে করিমপুরের পঙ্কজ মণ্ডল (পরবর্তীতে যিনি বাণপ্রস্থী-সন্ন্যাসী হয়েছিলেন এবং তখন নাম হয়েছিল স্বামী পরমাত্মানন্দ)-এর সম্বন্ধে অনেক কথা আলোচনা করেছিলাম। কিন্তু তখন হয়তো অনেক কথাই বলে ওঠা হয়নি এবং তখন আমাদের সাথে এতো ভক্তমন্ডলীও ছিল না– তাই আর একবার ওনার কিছু কিছু বিশেষ দিক বা বিশেষ ঘটনা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
আমি বনগ্রাম আশ্রমে যাবার শুরু থেকেই(১৯৮৩) পঙ্কজবাবুকে বনগ্রাম আশ্রমে দেখতাম। খুব সম্ভব উনি ১৯৮১/৮২ সাল থেকেই আশ্রমের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। পঙ্কজবাবুর সাথে যার-ই আলাপ হয়েছিল, এমন সকলেই জানেন যে – উনি খুবই আবেগ-উচ্ছ্বাসপ্রবণ মানুষ ছিলেন। গুরুমহারাজের সাথে সংযোগ হবার পূর্ব পর্যন্ত ওনার জীবনধারা একটু উশৃঙ্খল প্রকৃতির ছিল (একথা উনিই সকলকে বলতেন)। উনি বিবাহ করেছিলেন এবং ওনার দুটি কন্যাও রয়েছে, উনি তাস খেলতে ভালোবাসতেন–বন্দুক নিয়ে পাখি শিকার করতে যেতেন – ইত্যাদি নানারকম ভাবে হৈ-হুল্লোড়ে জীবন কাটাতেন। কিন্তু গুরুমহারাজের সান্নিধ্যে আসার পর থেকে ওনার জীবনে আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। গুরুমহারাজের কাছে দীক্ষাগ্রহণের পর উনি গভীর রাত্রে খুবই ধ্যান করতেন আর সারাদিন গুরুমহারাজের কথা বা অন্যান্য ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গ করে বেড়াতেন (যদিও উনি W.B.Electricity Dept.এর কর্মী ছিলেন, তাই duty টুকু নিশ্চয়ই করতেন)।
এইরূপ করতে করতে ওনার শরীরে কুলকুণ্ডলিনীর ক্রিয়া হতে শুরু করে এবং ওনার যৌগিক অগ্রগতিও হোতে শুরু করে। এইটা এই কারণে বলছি – আমরা তখন দেখতাম উনি সবসময়ই ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গ করতেন, ‘আন্‌কথা’ প্রায় বলতেনই না ! সেইজন্য তখন চরৈবেতি কার্যালয়ে (তখন বনগ্রাম আশ্রমে গুরুমহারাজের সিটিং-এ বসা ছাড়া আর দু’জায়গায় ভক্তরা সমবেত হয়ে আলোচনা করতো, সে দুটি জায়গা হোল – আশ্রমের বটতলা প্রাঙ্গণ এবং চরৈবেতি কার্যালয়) ভক্ত ও মহারাজদের মধ্যে আলোচনা হোতো যে, পঙ্কজবাবুর কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত হয়ে ‘বিশুদ্ধ চক্রে’ (কন্ঠ)ক্রিয়াশীল হয়ে রয়েছে – তাই উনি সর্বদাই ঈশ্বরীয় কথা বলেন। এছাড়াও ওনার মধ্যে আরও অনেক গুণের বিকাশ ঘটে যাচ্ছিলো, যেমন – দানশীলতা, অল্পে সন্তুষ্ট থাকা, বেশ-ভূষা বা পোশাক-আশাকের প্রতি উদাসীনতা, স্ত্রী-কন্যাদ্বয় থাকা সত্ত্বেও সংসার বৈরাগী, আশ্রমঅন্ত প্রাণ – ইত্যাদি।
সেইসময় শুধুমাত্র পঙ্কজবাবুকে দেখে বা ওনার মুখ থেকে গুরুমহারাজের মহিমার বিবরণ শুনে বহু মানুষ বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনমুখী হয়েছিল ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন এবার ওনার লীলায় ১০৮ জন রয়েছেন, যাঁরা লোক-সংগ্রাহক ! অর্থাৎ তাঁদের আচার-আচরনে, কথাবার্ত্তায়, জনসংযোগের দ্বারা – অনেক মানুষ আশ্রমমুখী হবে অর্থাৎ তারা পরমানন্দের চরণে এসে আশ্রয় নেবে এবং অবশ্যই যুগপুরুষের যুগপ্রয়োজনে বিতরিত অধ্যাত্মশিক্ষা গ্রহণ করে তারা ত্রিতাপ জ্বালা থেকে মুক্তি লাভ করবে।
আমাদের তখন মনে হোতো – পঙ্কজবাবু গুরুমহারাজের এরকমই একজন পার্ষদ হবেন নিশ্চয়ই ! তখন আশ্রমিক সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারীরা এবং পরমানন্দ ভক্তরা পঙ্কজবাবুকে কি ভালোই না বাসতেন, সাধু-ব্রহ্মচারীর ন্যায়‌ই মর্যাদা দিতেন !
এখন বেশ বুঝতে পারি – যেকোনো মানুষের মান-মর্যাদা, যশ-সম্মান, অর্থ-প্রতিপত্তি, বিদ্যা-পাণ্ডিত্য ইত্যাদি যা কিছু সে সবই ঈশ্বরের দান (অবশ্যই এই জন্মকৃত এবং পূর্ব জন্মকৃত কর্মেরই ফল)! কিন্তু পৃথিবীগ্রহ তো এখনো matured হয়নি, এখানকার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষও মাত্র কুড়ি লক্ষ বছরের বিবর্তনের বা অভিবিকাশের একটা ফসল মাত্র (যেখানে পৃথিবীর বয়স কয়েকশো কোটি বৎসর)! মানবের মানসিকতাও এখনো খুবই নিম্ন অবস্থায় রয়েছে ! তাই যেকোন মানুষ যখনই ঐগুলি (যশ-সম্মান, মান-মর্যাদা, বিদ্যা-শিক্ষা, অর্থ-সম্পদ ইত্যাদি) লাভ করে, তখনই সাথে সাথে এসে হাজির হয় অভিমান-অহংকার ! “আমি কী হনু রে !”– আর এই ব্যাপারটা যখনই সেই ব্যক্তির মনোজগতে পাকাপাকিভাবে স্থান করে নেয় – তখন থেকেই তাঁর কুলকুণ্ডলিনী শক্তির আবার নিম্নগতি শুরু হয়ে যায় এবং সে ‘যে কে সেই’ হয়ে যায় –”পুনর্মূষিক ভবঃ”!
গুরুমহারাজ কত দুঃখ করতেন (সমস্ত মহাপুরুষেরাই আমাদের অর্থাৎ অজ্ঞান মূঢ়মতি মানবের এই দশা দেখে দুঃখপ্রকাশ করে গেছেন), বলতেন – ” দেখছি অনেক ভালো ভালো ছেলে-মেয়েরা ত্যাগব্রত অবলম্বন করে বেশ খানিকটা তরতর করে এগিয়ে আসছে, দেখে আমার আনন্দ হোচ্ছে –মনে হোচ্ছে “এর” দ্বারা মা জগদম্বা কিছু কাজ করিয়ে নেবেন । ওমা ! তারপর কিছুদিনের মধ্যেই দেখছি ঐসব ছেলেমেয়েদের মধ্যে ‘অহং’ এবং ‘অস্মিতা’ এসে দৃঢ়ভাবে বাসা বেঁধে ফেলছে এবং তারা তাদের স্থিতি থেকে নেমে এসে ‘যে কে সেই’ হয়ে যাচ্ছে ! এসব দেখে আমার কষ্ট হয় ! আমি বুঝতে পারি কেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ শুদ্ধসত্ত্ব ছেলেদের সান্নিধ্যলাভের জন্য কাঁদতেন !”
পঙ্কজ বাবু(মণ্ডল)-র বাকি কথা পরের দিন। [ক্রমশঃ]