শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের ভক্ত, পার্ষদ ইত্যাদিদের সম্বন্ধে কিছু কথা বলা হচ্ছিলো ! আমরা আগের আলোচনায় যে পরমানন্দ মন্ডলের কথা বলেছিলাম তার মোট সংখ্যা হবে দুশো অষ্টআশি(২৮৮) জন। গুরুমহারাজের স্থূলশরীর থাকাকালীন সময়ে – যা কোনদিনই শুনিনি (গুরুমহারাজ থাকাকালীন সময়ের শেষের দিকে তো আমি বনগ্রামেই বেশি থাকতাম, তবুও কোনোদিন শুনিনি_”আমি অমুক,আমি তমুক”!), সেটা ওনার স্থূলশরীর ছাড়ার পর বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে থাকা অনেকের মুখে শুনতে শুরু করেছিলাম যে, ”গুরুমহারাজ নাকি তাকে একবার বলেছিলেন যে, সেও ওই পরমানন্দ-মন্ডলে রয়েছে” ! এইভাবে পরপর কয়েকজনের বা বলা যায় অনেকের মুখেই শুনতে শুরু করেছিলাম ! ফলে পাঠকবর্গকে আমার এটাই মনে করিয়ে দেওয়া যে, আপনারা যেন কেউ ভুলেও ভাববেন না যে – “আপনিও ওই পরমানন্দ-মন্ডলে রয়েছেন” ! আমরা যারা সাধারণ মানুষ বা সাধারণ ভক্ত – তাদের ওখানে প্রবেশাধিকার নাই ! ওই স্থানগুলি আগেই অনেক অসাধারণেরা নিজেদের মধ্যে ভাগাবাটি করে পূরণ করে নিয়ে নিয়েছেন !!!
যাইহোক, মজা করা থাক্ ! এখন আমরা আবার মূল আলোচনায় ফিরে আসি ! পরমানন্দ-লীলায় পরমানন্দের কাজ করার জন্য যে সমস্ত ত্যাগী ভক্তরা (অর্থাৎ ব্রহ্মচারী, সন্ন্যাসীরা) বনগ্রাম মিশনকে কেন্দ্র করে এক জায়গায় জড়ো হয়েছিলেন – তাদের মধ্যে অনেকেই নিশ্চয়ই ভগবানের পার্ষদ বটে বৈকি ! এছাড়াও স্বামী পরমানন্দের সঙ্গে এসে এবং তাঁর সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে অনেকেই তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ! তাঁর কাজ অর্থাৎ ভগবানের কাজে ‘সাথী, সহযোগী বা সহযোদ্ধা’– হোতে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন –এটা তো একটা বড় দিক নিশ্চয়ই ! আর এতে তো কোনো সন্দেহের অবকাশ‌ই নাই! কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর উদ্দেশ্য বা আদর্শকে ঠিক ঠিক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে, শেষ পর্যন্ত সহযোগী হয়ে থাকার ব্রত ___কে কতটা পালন করতে পারলেন, নিরবিচ্ছিন্নতা বজায় রাখতে পারলেন – সেটা কিন্তু বিচার্য হতেই পারে ! সূধী পাঠককুল বলতেই পারেন__”বিচারটা করবে কে হে বাপু! আর এসব প্রশ্ন তোলার তুমি কে? তোমাকে কি স্বামী পরমানন্দ ভার দিয়ে গেছেন ?”
এইকথা উঠলে সত্যিই কোনো উত্তর দেওয়া যাবে না। অধোবদনে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কিন্তু একটা কথা চুপি চুপি বলে ফেলা যায়__উত্তরকালের পরমানন্দ-ভক্তরা কিন্তু এইসব নিয়ে একসময় কাটাছেঁড়া করবে এবং বোঝার চেষ্টা করবে পরমানন্দ-পার্ষদ হিসাবে কে কত নম্বর পেতে পারে !!
যদিও অধ্যাত্মজগতের লীলা, ভগবান পরমানন্দের লীলা বোঝার সাধ্য জীবের নাই – তবুও বুদ্ধি(শুদ্ধবুদ্ধি হয়তো নাই) দিয়ে একটু বোঝার চেষ্টা করা _এই আর কি!!!
গুরুমহারাজ একবার বলেছিলেন – যারা ভগবানের কাজের (অর্থাৎ মনুষ্য শরীরধারী ঈশ্বরের অবতরিত রূপের কাজ) জন্য তাঁর সঙ্গে এসেছেন, তাঁদের এই শরীরের যেকোনো কাজের জন্য কোনোরূপ কর্মফলের সঞ্চয় হবে না। অর্থাৎ তাঁরা এই বর্তমান শরীরের কর্মজনিত কোনোরূপ ফল সঞ্চয়(যাকে আমরা প্রারব্ধ বলি) করে নিয়ে যাবেন না – যদি ভোগ-ভোগান্তি কিছু থাকে তা এইখানেই ভোগ হয়ে যাবে। আর যাঁরা তাঁর পূর্বনির্দিষ্ট পার্ষদ নন, অথচ জন্ম-জন্মান্তরের সাধনা ছিল, আকাঙ্ক্ষা ছিল __তাঁর সাথে (ভগবান যখন শরীর নেবেন তখন সেই শরীরের সাথে) কাজ করবেন – তাঁদের কিন্তু কর্মজনিত প্রারব্ধ সঞ্চয় হবে ! অর্থাৎ যতই তাঁরা ভগবানের কাছাকাছি থাকুন, তাঁর কাজের অংশীদার হ’ন বা দূরে থেকেই কাজ করুন – কিন্তু তাঁর আদেশ-নির্দেশ-উপদেশ ঠিকমতো না মেনে স্বাধীন ইচ্ছা বলবতী করে বাকি জীবনটা আলস্যে-বিলাসে বা অন্যান্য কর্মে কাটিয়ে দিতে চাইছেন – সে ক্ষেত্রে কিন্তু চরম ফলভোগ করতেই হবে।
গুরুমহারাজ একবার জয়দীপের(বর্তমান জয়দীপ মহারাজ) জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে গিয়ে বলেছিলেন – ” ব্যাপারটা কি জানিস তো জয়দীপ ! প্রত্যেকেরই উচিৎ তার জন্য নির্দিষ্ট ‘কাজ’-টা বুঝে নিয়ে – গুরুর নির্দেশমতো সেই ‘কাজ’-টি সম্পন্ন করা !” জয়দীপ নিশ্চিত হবার জন্য আর একবার জিজ্ঞাসা করেছিল – ” কিন্তু গুরুমহারাজ ! আমার জন্য ‘নির্দিষ্ট কাজ’-টি কি – তা বুঝবো কী করে ?” তখন গুরুমহারাজ একটু বিস্মিত হয়েছেন – এমন ভাব দেখালেন, তারপরে একদম চুপচাপ অনেকক্ষণ বসে থাকলেন ! এই ব্যাপারে আর একটাও কথা বললেন না! তাঁর ভাবটা দেখে মনে হচ্ছিলো – যেন তিনি জয়দীপের মুখ থেকে এমন একটা জিজ্ঞাসা আশা করেন নি ! অবশ্য ওখানে উপস্থিত, আমাদের মতো অনেকেরই ওই একই জিজ্ঞাসা ছিল ! সত্যিই তো – পরমানন্দ-ভক্তরা বুঝবে কি করে যে, গুরুমহারাজ তার জন্য নির্দিষ্ট কাজটি কি বরাদ্দ করেছেন ?
অনেক পরে বুঝেছিলাম, সেদিন গুরুমহারাজের ঐরূপ বিরক্তি বা বিস্ময়ের ভাব প্রকাশের কারণটা কি ছিল ! আমরা সত্যিই আহাম্মক ছাড়া আর কী ? তাই বুঝতে দেরী হয়েছিল ! একটা সহজ পদ্ধতি তো ছিলই ! সেই করুণাময় মানুষটির পদপ্রান্তে বসে, একান্তে (যদি অনেকজনের সামনে লজ্জা লাগে – তাই) নিজেকে নিবেদন করতে পারলেই তো তাঁর সকল করুণার ধারা আপনা-আপনিই আমার(বা আমাদের) উপর ঝরে পড়তো –আমার সকল জিজ্ঞাসার অবসান হয়ে যেতো ! আমাদের অর্থাৎ পরমানন্দ ভক্তদের আত্মনিবেদনের জন্যেই তো তিনি কোল পেতে অপেক্ষায় ছিলেন! সেইটা আমরা বেশিরভাগ‌ ভক্তেরাই করতে পারিনি! সেই বিরাট পুরুষের কাছে গিয়ে, প্রতিমুহূর্তে আমরা আমাদের “নিজস্বতা”-কে হারিয়ে ফেলার ভয় করেছি_তাই পারিনি!
রবীন্দ্রনাথও যখন এই রহস্যটা বুঝেছিলেন, তখন লিখেছিলেন – “কেন আমি দিলাম না মোর সকল শূন্য করে।” এটা তো খুবই সত্যি কথা যে, আমরা আমাদের “সকল শূন্য” করে দিতে পারিনি ! আর পারিনি বলেই এখনো আমাদের মধ্যে ‘individual ego’– কাজ করে চলেছে। আমরা যদি আমাদের ‘ego’-কে শূন্য করে দিতে পারতাম, তাহলে তো জন্ম-জন্মান্তরের ফলে তৈরি হ‌ওয়া ‘আমি’ আর ‘এই-আমি’ থাকতো না – ‘পরমানন্দময় আমি’-তে রূপ নিতো ! তখন যা কিছু কথা, সে সবই ‘পরমানন্দ কথা’ হয়ে উঠতো, সকল কাজ ‘পরমানন্দের কাজ’ হয়ে উঠতো ! চলায়-বলায়-কর্মে-আচরণে পরমানন্দেরই রূপ পরিস্ফূট হয়ে উঠতো! “গুরুবৎ–গুরুপুত্রেষু” -এই পুরাণকথার সার্থক রূপ প্রকাশের এটাই হোলো একমাত্র কৌশল ! [ক্রমশঃ]