শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ, তাঁর ভক্ত-পার্ষদবৃন্দ এবং তাদের সাথে গুরুমহারাজের লীলার কাহিনীসমূহ এখানে আলোচনা করার চেষ্টা হচ্ছিলো। গুরুমহারাজের সমগ্র জীবনটাই নানান লীলায় ভরা ! তাঁর জন্মগ্রহণের আগে থেকেই লীলার plot তৈরি হয়ে গেছিলো ! তাই সেখানেও কত অলক্ষ্য লীলা ঘটেছে – এরমধ্যে গুরুমহারাজ যেটুকু ব্যক্ত করেছেন – মানুষ অর্থাৎ আমরা শুধু সেইটুকুই জানতে পেরেছি ! উনি কৃপা করে যতটুকু জানিয়েছেন – আমরা জেনেছি ততখানিই ! এরপর ওনার গর্ভে আগমন, ওনার জন্ম, ওনার শৈশব, ওনার বাল্য, ওনার কৈশোর ও যৌবনের পরিব্রাজন লীলা ও কর্মলীলা আর সবার শেষে গুরুভাবে তাঁর অন্তিম লীলার বেশ কয়েকটা বছর (১৯৭৮–১৯৯৯)-এর সমস্ত লীলার কথা কে-ই বা জানতে পেরেছে ! ভগবান পরমানন্দ নিজে কৃপা করে যখন যেটুকু বলেছেন – মানুষ ততটুকুই জেনেছে !
এইবার আপনারা অনেকেই হয়তো বলবেন – কিন্তু ছোট বয়েস থেকে বড় বয়েস পর্যন্ত অনেকেই যে ওনার অনেক লীলার সাক্ষী ! তারা নিজের চোখে যে অনেক কিছুই দেখেছে ! তাহলে তারাও অনেক সত্য জানে ! তাদের কাছে শুনে নিলেই তো ভগবানের লীলার বহু কথা জানা যায় !! হ্যাঁ, তা জানা যায় ! কিন্তু এই জানাটা secondary ! Primary হোলো – যে কথাগুলো উনি স্বয়ং বলে গেছেন ! ভগবান যখন যখনই লীলাশরীর ধারণ করে তাঁর আরব্ধ কাজ করতে আসেন – তখন তাঁর জীবদ্দশায়, তাঁর লীলাকাহিনী খুব কমই লেখা হয়েছে ! আর লেখা হলেও – তাঁর সম্পূর্ণটা সেই যুগের যুগপুরুষদের কাছে approve করিয়ে নেওয়া হয়নি ! হয়তো ওই পরম্পরার পরবর্তী প্রজন্মের গুরুরা approve করেছেন !
তাছাড়া আগের বেশিরভাগ ধর্মগ্রন্থ-ই লেখা হয়েছে যেকোনো যুগপুরুষের স্থূলশরীর ত্যাগের বহু পড়ে !ফলে সেসব ক্ষেত্রে বোধসঞ্জাত কথা যতটা থাকে, তার থেকে বেশি থাকে আবেগ, ভক্তিভাবের প্রকাশ, নিজের মতো করে তাঁকে প্রকাশ করার প্রয়াস ! তাছাড়া ঐসব গ্রন্থে আরো থাকে সমকালীন বিভিন্ন ভক্তের মুখ থেকে শোনা কথা !
আসলে যুগপুরুষরা জানেন যে, পৃথিবী গ্রহ এখনো চেতনার level-এ ততটা উন্নত হয়নি (এখনো শিশু চেতনায় রয়েছে) – তাই সরাসরি যুগপুরুষদের কথা এবং শিক্ষা সমকালীন মানুষ নিতে পারবে না ! সুতরাং পরবর্তী লেখকদের একটু-আধটু জল-মেশানো শিক্ষাই থাক্ – ওটা তবুতো সাধারণে নিতে পারবে ! করুণাময় ভগবান বা যুগপুরুষগণ- মহাপুরুষগণ এইভাবেই জীবকে করুণা করে চলেছেন ! – ” যতটা পারবি, যতটা তোর সামর্থ্য – ততটাই নে ! নিয়ে অন্তত একটু চেতনার উত্তরণ ঘটা – আত্মিক উত্তরণ ঘটা। মোহ-গর্তে, অজ্ঞান-অন্ধকারে আর থাকবি কতদিন ! সেখান থেকে অন্ততঃ একটুখানি ওঠ্ ! যারা উঠতে পারলি না – তাদেরও চিন্তা নাই, ভয় নাই ! আমি তো আবার আসছি ! তখন না হয় – আরো কিছু বেশি মানুষের চেতনার উত্তরণ ঘটিয়ে যাবো !!” – করুণাময় ভগবান হয়তো এই মনোভাবই ব্যক্ত করে চলেছেন যুগ যুগ ধরে।
আর আমরা ! আমরা তো এক একটা মহাজ্ঞানী ! হাতির বিশাল পরিমাণ ‘লাদ’ (পায়খানা) দেখে পিঁপড়ের পিছন সুড়সুড় করে ! আমরাও কি কেউ কম ? আমাদের জ্ঞান, আমাদের বিদ্যা, আমাদের সাধন-ভজন, আমাদের ধন-দৌলত, আমাদের ক্ষমতা বা শক্তি – আর পাঁচজনের চাইতে কত বেশি – তা প্রদর্শন করার competition-এ যেন নেমে পড়েছি আমরা প্রায় সকলেই! এখন যদি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত print-media বা digital-media -র দিকে নজর দেওয়া হয় – তাহলে ও এই চিত্রই দেখা যাবে, আবার আমাদের ব্যবহারিক জীবনের প্রতিটি ধাপে ধাপে অর্থাৎ বাড়িতে, পাড়ায়, ট্রেনে-বাসে বা অন্যত্র ___ শুধু ঐ অহংকারের প্রদর্শন হয়ে চলছে ! সবাই বলতে চাইছে – “আমাকে দ্যাখ্ ! আমার কথা শোন্‌ ! আমাকে মান্‌ !” গুরুকে মানতে হবে না, ঈশ্বরকে মানতে হবে না, প্রাচীন পরম্পরাকে মানতে হবে না – আমি যেমনটা বিধান দেবো – ঐটাকে মানলেই হবে ! আমার বাক্য মানলেই গুরুকে মানা হবে, আমার নির্দেশ মানলেই ঈশ্বর-আল্লাহকে মানা হবে, আমি-ই পরম্পরার(ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক) মধ্যে শ্রেষ্ঠ – তাই আমাকে মান্ !
কি মূর্খতা ! কি আহাম্মকি ! হ্যাঁ, বহু মানুষ দলে দলে ওই সমস্ত নেতা (ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ইত্যাদি)-দের কাছে যাবে, তাদেরকে মেনেও নেবে, তাদের জন্য অপরের সঙ্গে fight-ও করবে – হয়তো আরো অনেক কিছুই করবে ! কিন্তু “কাজের কাজ”? এই সবের দ্বারা সেটা হবে কি ? আমার ‘চেতনার উত্তরণ’, আমার ‘বিবেকের জাগরণ’, আমার ‘আত্মিক উত্তরণ’– একটুও হোলো কি ? প্রতিদিন সকালে উঠে এই মূল্যায়নটুকু যদি না করা হয় তাহলে তো শুধু শুধুই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে, অহং-প্রদর্শনে আবার একটা জন্ম চলে গেল ! আবার মৃত্যু–আবার জন্ম–আবার জীবনকাল ! সেই জীবনেও আবার এইরকমই অহং-প্রদর্শনের শিকার হয়ে কাটিয়ে দেওয়া !!
তাহলে এর শেষ কোথায় ? গুরু মহারাজ বলেছিলেন – ” এক একটা জীবন যেন এক একটা অভিজ্ঞতার সিঁড়ি ! যে সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে মানুষ এগিয়ে চলে পূর্ণতার দিকে।” তাই আসুন না – আমরা প্রথমেই অহংমুক্ত হবার চেষ্টা করি ! এখন এটাই হোক সর্বশক্তিমান পরমেশ্বরের কাছে আমাদের সকলের ঐকান্তিক প্রার্থনা ! ! [ক্রমশঃ]