জিজ্ঞাসু :– এখন কিন্তু ‘গুরুগিরি’ ব্যাপারটা খুবই বেড়ে গিয়েছে । বিভিন্ন মঠ, মিশন থেকে সন্ন্যাসী বা গুরুরা দীক্ষা তো দিচ্ছেই, বহুস্থানে আবার দীক্ষার জন্য বিশেষ ‘ফি’ দিতে হয় ৷ তাছাড়া বিভিন্ন পরম্পরায় দেখা যাচ্ছে দীক্ষা দেবার ভারপ্রাপ্ত লোক রয়েছে। তারা ধরে ধরে যেখানে পারছে_দীক্ষা দিয়ে দিচ্ছে! এরপর রয়েছে গ্রামে-গঞ্জের বংশ-পরম্পরার গুরু ! তারাও বাড়ি বাড়ি গিয়ে দীক্ষা দিয়ে আসছে !!
এইসব দেখেশুনেই কথাটা বলছিলাম আর কি??
গুরুমহারাজ :– “গুরুগিরি”- কথাটা ব্যবহার করলি ! কোনো কাজে বাহাদুরি বোঝাতে যেমন ‘দাদাগিরি’ কথাটা ব্যবহার হয়, এই কথাটাও তোর মুখে খানিকটা সেইরকম শোনালো !
এখন সমাজে গুরুর সংখ্যা বেড়েছে __এটাই তুই বলতে চাইছিস ? তার মানে লোকে বেশি বেশি গুরুর কাছে আসছে ? তা যদি আসে তাহলে জানবি মানুষের চেতনার উন্নতি হোচ্ছে, সমাজের upliftment হোচ্ছে ! আর যদি কোথাও জোর করে কাউকে তার নিজস্ব মত চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয়, তাহলে সেটাকে বলা হয় ‘অনাচার’ । কিন্তু তুই যে এখনি বললি __কোনো কোনো পরম্পরা দীক্ষা দেওয়ার জন্য ভারপ্রাপ্ত লোক রেখেছে বা যে কোনো সাধু-সন্তরা যেখানে সেখানে বা যখন তখন দীক্ষা দিয়ে দিচ্ছে – এগুলো কিন্তু ভারতীয় প্রাচীন পরম্পরা নয় । আর বংশপরম্পরার ব্যাপারটা তো একদমই শাস্ত্রসম্মত নয়_ওটা ব্রাহ্মণ্যপ্রথার প্রাধান্যের সময়ে সৃষ্ট একটা বৃত্তি ৷
‘কুলগুরু’ বলতে ‘কুল’ মানে বংশ ধরে এইরকম মানে করা হয়েছে ৷ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ‘কুলগুরু’ মানে কৌল অর্থাৎ যিনি ‘অকূলে কূল পেয়েছেন’ অর্থাৎ যাঁর আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হয়েছে । দ্যাখো, প্রকৃতপক্ষে আত্মজ্ঞান লাভ করেছেন যিনি, একমাত্র তিনি-ই গুরু হবার যোগ্য ! তাছাড়া আর কারো সে যোগ্যতাই লাভ হয়নি । আর ঠিকমতো যোগ্যতা প্রাপ্ত না হোলে _সে দীক্ষা দিয়েই বা কি করবে ?তার দ্বারা শিষ্যের কোনো মঙ্গল তো হবেই না বরং তার এবং শিষ্যের _ উভয়ের-ই চরম ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকবে ।
সেই অর্থে হয়তো_ অযোগ্য ব্যক্তিদের এইরূপ গুরু হওয়ার ব্যপারটাকেই সমাজে ‘গুরুগিরি’ আখ্যা দেওয়া হোচ্ছে । তবে কথাটা কি জানিস – এই ধরনের ‘গুরুগিরি’_ করাটা খুবই খারাপ ! এই গুরুরা, জেনে শুনেই হোক বা অজ্ঞতাবশতঃ__ যতই শিষ্য বানাক না কেন, তাকে কিন্তু প্রচন্ড অশান্তি ভোগ করতে হয় । তার নিজের জীবনে হয়তো তেমন কোনো সমস্যা নাই, কিন্তু যাদের ভার নিচ্ছে তাদের তো নানারকম সমস্যা রয়েছে ! তারা এসে গুরুর কাছে তাদের সমস্যার কথা বলবেই ! আর বললেই তার অশান্তির ভাগ এসে পড়ল গুরুর উপর । কারণ আধ্যাত্মিকভাবে দুর্বল গুরুরা পারমার্থিক তো দুর অস্ত_ভক্তদের মধ্যে কারো জাগতিক সমস্যাই দূর করতে পারে না_কিন্তু ভক্তের সমস্যার জন্য দুশ্চিন্তা তো করতে হবেই! ভালো মানুষ হোলে, এইটা থেকে সে কি করে মুক্তি পাবে !!
আমার এখানেই দ্যাখ্ না – কত লোক আসছে, সবাই কি আধ্যাত্মিক জীবন তৈরি করতে আসছে ? আর্ত আর অর্থার্থী-ই তো বেশী । বেশিরভাগ মানুষ-ই এখানে আসে বিভিন্ন ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট নিয়ে । তারা তাদের সমস্যার কথা এসে আমাকে বলে, তাদের জন্য আমাকে চিন্তা করতে হয় ! অথচ দ্যাখ্, আমার কিন্তু কোনো সমস্যা নাই, ওদের সমস্যাগুলোই আমাকে ভাবিত করে ! ওদের দুঃশ্চিন্তায় আমি চিন্তিত হই, ফলে সমস্যাগুলির সমাধানের ব্যবস্থাও আমাকেই করতে হয় !
এছাড়া এর থেকে আরও বেশি অসুবিধার কথা বলছি শোন্ ! আমি তো একজন সন্ন্যাসী ! আর অনেকে আমার কাছে এসে তাদের দাম্পত্য কলহের কথা আমাকে বলে, আর যাতে ওদের কলহ শীঘ্র মিটে যায় __তার ব্যবস্থা করতেও অনুরোধ করে ! এইবার আমি কি করি বল্ ? ছেলেটি আমার সন্তান, আর তারর স্ত্রীও তো আমারই মেয়ে – তাদের জীবনে সুখের ব্যবস্থা করা তো আমার উচিত – নয় কি ? তাই আমাকে মাথা ঘামাতে হয় ! ফলে, তোদের জীবনের অশান্তির আগুনের আঁচ আমার গায়ে লাগে । সত্যি বলছি আঁচ লাগে !
এবার সাধারণ গুরু অর্থাৎ যাদের গুরুগিরি একটা বৃত্তি _ তাদের কথায় আসছি ! ধরে নে তারা যেন এক একটা ছোটো ছোটো ডোবা ! এবার গোটাকয়েক পচা-নর্দমা যদি সেখানে এসে পড়ে, তাহলে সেই ডোবাটার অবস্থা কি হবে বল দেখি ? কিছুদিনের মধ্যেই পচে বজ্-বজ্ করবে !
এইরকমটাই হয় ৷ বিভিন্ন গুরু পরম্পরা বা বিভিন্ন সম্প্রদায় যেন ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি আর কুসংস্কারে আবদ্ধ হয়ে একেবারে পচে গেছে ! পচা পুকুরেও যেমন বিভিন্ন প্রাণী ও অসংখ্য পোকা কিলবিল করে __তেমনি এসব সম্প্রদায়েও শিষ্য-ভক্তের অভাব হয় না । কিন্তু যেন কীটবৎ কিলবিল করছে ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এসব দেখেই বলেছিলেন, “লোক না পোক্”। বুঝতে পারলি !
সে যাইহোক, যে কথা হচ্ছিলো – ওই যে বলছিলাম উন্নত গুরু, যোগ্যতাসম্পন্ন বা ভারপ্রাপ্ত গুরু অর্থাৎ যাঁর অন্ততঃ আজ্ঞাচক্রে স্থিতিলাভ ঘটেছে __ তিনি যেন স্রোতস্বিনী ! দু’চারটে পচা নর্দমায় চট্ করে তাকে কলুষিত করতে পারে না । বয়ে নিয়ে গিয়ে ঠিকই একটা বড় স্রোতস্বিনীতে নিয়ে গিয়ে ফেলবে__যা গিয়ে মিলিত হবে সাগরে।।
তবে, এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে, ছোটখাটো স্রোতস্বিনীও শহরের দূষণে দূষিত হয় । এমন যে গঙ্গানদী সেই নদীও কিভাবে দূষিত হয়েছে দেখছো তো ! কিন্তু স্রোতস্বিনী বা নদী যেই সাগরে পড়লো __অমনি আর কোনো দূষণ নাই ! স্রোতস্বিনী যো-সো করে নিজে দূষিত হয়েও দূষণযুক্ত বস্তুকে সাগরে নিয়ে গিয়ে ফেলে _নিজেকে দূষণমুক্ত করে নেয় ৷ কিন্তু ঐ যে বলছিলাম সারাপথ দূষণযুক্ত হয়ে চলতে হয় অর্থাৎ গুরুকে অশান্তির আগুনে জ্বলতে জ্বলতে চলতে হয় !
এখানে সাগর হচ্ছে পরমচৈতন্য । জীবের চেতনা চৈতন্য পৌঁছালে _তবেই ত্রিতাপ জ্বালার হাত থেকে মুক্তি পায় সে। আর গুরুর দায়িত্ব জীবকে জ্বালা থেকে মুক্তি দেওয়া । তুমি যে অর্থে ‘গুরুগিরি’ বলছো – এটা গুরুর কাজ নয় । গুরুর কাজ অনেক উপরে । গুরু ঈশ্বরের প্রতিনিধি – গুরুই জীবকে পথ দেখিয়ে ইষ্টের সঙ্গে পরমের মিলন ঘটায় ! সেই অর্থে, গুরু যেন ঘটক ।
এবার কথা হোচ্ছে, জগতে যতসংখ্যক ডোবা, নর্দমা, নালা ইত্যাদি রয়েছে এবং যেগুলি পচে বজ্-বজ্ করে সমাজে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে চলেছে – তাদের পরিণতি কি হবে ? তাদের কি কখনোই মুক্তি ঘটবে না ? এরা কি কখনও দূষণমুক্ত হবে না ? এরা কি সাগরে পৌঁছাবে না ? হ্যাঁ পৌঁছাবে !
এইজন্যেই তো প্রয়োজন হয় বন্যার ! শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, শ্রীরামকৃষ্ণ এইরকমই বন্যা বা প্লাবন! বন্যার প্রবল জলোচ্ছাসে ডোবা, নর্দমা, নদী-নালা সব জায়গাতেই ভর্তি ভর্তি জল, সব জায়গাতেই প্রচন্ড স্রোত । আর এই স্রোতই সবকিছুকে নিয়ে চলে সাগরের দিকে, মহামিলনের দিকে ৷(ক্রমশঃ)