শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা এবং তাঁর ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদদের কথা এখন বলা হচ্ছিলো ! এইসব কথা আলোচনা করতে গিয়ে অন্যান্য নানান প্রসঙ্গ এসে যাচ্ছে – অবশ্য তা আসার-ই কথা ! কারণ স্বামী পরমানন্দ যেন মহাসাগর. মহাসাগরেরও মহাসাগর, অনাদি–অনন্ত মহা মহাসাগর ! সাধারণভাবে বিচার করলে দেখা যাবে – তাঁর কূল নাই, কিনারা নাই, তল নাই, পার নাই – তিনি অকুল-অতল-অপার ! কিন্তু এই অকুলেরও কুল পাওয়া যায়, এই অপারেরও পারে পৌঁছানো যায়, এই অতলেরও তল পাওয়া সম্ভব হয় – যদি তিনি স্বয়ং কৃপা করেন ! নাহলে কোনো কিছুর মাধ্যমেই তা সম্ভব নয় ! ধ্যানের দ্বারা, জপের দ্বারা বা সাধনার দ্বারা অর্থাৎ যে কোনোরূপ পুরুষাকারের দ্বারা ব্রহ্মসাক্ষাৎকার বা আত্মসাক্ষাৎকার লাভ করা যায় না ! একথা উপনিষদে রয়েছে অর্থাৎ ঋষিরাই বলে গেছেন এইসব কথা !
কিন্তু তবুও আত্ম-সাক্ষাৎকারের অন্য উপায়ও রয়েছে – আর সেই উপায় হোল ___ঈশ্বরের কৃপা লাভ করা! কিন্তু জীব সরাসরি ঈশ্বরকে আর কোথায় পাবে __তাই সাধারণ জীবের ক্ষেত্রে গুরুরূপী ঈশ্বরের কৃপা হোলেই হবে! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ অভয় দিয়ে গেছেন – স্বামী পরমানন্দও বারবার বলেছেন – ” ওরে কৃপার বাতাস তো সবসময়েই বইছে ! তোরা শুধু সেই বাতাসের অনুকূলে পাল তুলে দে !” – তাহলেই এই জীবনরূপী তরণী তরতর্ করে ওই যে অকুল-অপার সমুদ্র, তার কুলে গিয়ে ঠেকবে, তার পারে এসে ভিড়বে ! আমাদের মতো সাধারণ জীবের ক্ষেত্রে গুরু (সদগুরু) এই কাজ ত্বরান্বিত করে দেন ! এই জন্যেই তো বলা হয় “কুলগুরু” বা “কৌল” অর্থাৎ ‘যিনি অকূলে কুল পেয়েছেন’।
তিনি পেয়েছেন – তাইতো তিনি ডঙ্কা মেরে বুক বাজিয়ে জোরের সাথে বলতে পারেন – “এই দ্যাখ্ ! আমি পেয়েছি (লাভ করেছি) – তুইও পেতে পারিস ! শুধু তুই আমার নির্দেশমতো পথ চলা শুরু কর্ !” অনেকেই সেকথা শুনে শুরু করে দেয়_অনেকে ছোট শিশুর মায়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকার ন্যায় _গুরুর দিকে চেয়ে থাকে ! হয়তো সে তার অক্ষমতার কথা জানে ! গুরু তাকেও হাত ধরে খানিকটা এগিয়ে দেয় ।
এইরকম বিভিন্নভাবেই লাভ করা যায় __’গুরু কৃপা’ ! আর আগেই বলা হয়েছে – ‘ঈশ্বরের কৃপা’ তো রয়েছেই ! তাহলে বাকি থাকলো আর একটা কৃপা। আর সেটাই সব চাইতে vital ! সেটা হোলো ‘আত্মকৃপা’ বা নিজের কৃপা !
চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থ – ভক্তিশাস্ত্র হিসাবে গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণের কাছে আকর গ্রন্থ ! ওই গ্রন্থের লেখক ভক্তপ্রবর কৃষ্ণদাস কবিরাজ লিখেছেন — ” গুরু-কৃষ্ণ-বৈষ্ণবের যদি দয়া হৈল,/ একের কৃপা বিনে জীব ছারেখারে গেল !” –এই একের কৃপাই আত্মকৃপা বা নিজের কৃপা। ধরে, বেঁধে কোন মানুষকে জোর করে, মুখ টিপে ধরে ‘হাঁ’ করানো যায়, কিন্তু ‘কোঁৎ’ করে ‘গেলা’-র কাজটা ঐ ব্যক্তিকেই করতে হয় – এটা বাইরে থেকে করা যায় না ! তেমনি প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে বলা যায় যে, পৃথিবীতে ধার্মিক ব্যক্তি, ধর্মীয় নেতা, ধর্মীয় গ্রন্থাদির শেষ নাই – কিন্তু তাতে individual ঐ ব্যক্তিটির কি-ই বা যায় আসে ! “চিনি-চিনি” বললে যেমন মুখ মিষ্টি হয় না বা চিনির মিষ্টস্বাদ পাওয়া যায় না, তেমনই চিনির পাহাড়ের উপর বসে থাকলে বা সেই সমস্ত চিনি নিয়ে সদা-সর্বদা নাড়া-ঘাঁটা করলেও মুখ মিষ্টি হয় না এবং চিনির আস্বাদ-লাভও হয় না ! আস্বাদ পেতে গেলে মুখে চিনি ফেলে তার স্বাদ গ্রহণ করতে হয় !
এই কথাগুলো উদাহরণ হিসাবে বিভিন্ন মহাজনগণ ব্যবহার করেছেন। মানবসভ্যতার যে লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায় – তাতে তথাগত বুদ্ধ-কেই প্রথম ‘তথা’ (ব্রহ্মলোক, ঈশ্বরলোক) হইতে ‘আগত’-ব্যক্তি হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় বা মান্যতা দেওয়া হয় ! তারপর থেকে লিখিত ইতিহাসে গোটা পৃথিবী জুড়ে যে সমস্ত জ্ঞানী-মহাত্মা-মহাপুরুষগণের নাম পাওয়া যায় – তার সংখ্যা হয়তো কয়েক হাজার বা লক্ষ-ও হয়ে যেতে পারে ! এই সমস্ত মহাত্মা-মহাপুরুষেরা সবসময়েই সাধারণ মানুষদের মঙ্গল চিন্তা করে গেছেন, তাদেরকে সৎ-উপদেশ, সৎ-শিক্ষা দিয়ে গেছেন – কখনোই কাউকে বিপথগামী হতে অনুপ্রেরণা দান করেন নি ! কিন্তু আমরা যা দেখি, তাতে করে তাঁদের সারা জীবনের সাধনা-ত্যাগ-তিতিক্ষা-শ্রম ইত্যাদির মূল্য ঠিক কতখানি ? শত-সহস্র মানুষ কি দলে দলে আত্ম-সাক্ষাৎকার করেছে ? তারা কি ঈশ্বরলাভে সমর্থ হোতে পেরেছে অথবা নিজেরা ঈশ্বরত্ব অর্জন করতে পেরেছে ? পারেনি তো ! হয়তো কেউ কেউ পেরেছে __অধিকাংশ তো পারে নি ! কিন্তু কেন পারেনি ? –তার উত্তর ঐ একটাই হবে – “আত্মকৃপার অভাবে” পারে নি।
বেশিরভাগ মানুষই (ক্ষ্যাপা, হাবাগোবা ইত্যাদি ছাড়া) জানে কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ, সে জানে কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক ! তবুও মানুষ মাঝে মাঝেই মন্দটাকেই বেছে নেয়, বেঠিক কাজটাই করে বসে। আর তার ফলেই তৈরি হয় নতুন নতুন কর্মফল – যার ভোগান্তি জন্ম-জন্মান্তর ধরে ভুগে চলে মানুষ (অর্থাৎ আমরা)! কিন্তু আমাদের মধ্যে যারই আত্মকৃপা রয়েছে অর্থাৎ যে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্যে সাধন-ভজনে ব্রতী হয়েছে, গুরুর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে জীবন পথে এগিয়ে চলেছে – তার হবেই হবে ! তার এইজন্মেই আত্মসাক্ষাৎকার, ব্রহ্মসাক্ষাৎকার হয়ে যেতে পারে ! আর যদি এই জন্মের এই শরীরে নাও হয় – তাহলে তিন জন্মের মধ্যেই হবে – এটা নিশ্চিত ! মহাজন-মহাপুরুষের বাক্য কখনোই মিথ্যা হবার নয় ! [ক্রমশঃ]
কিন্তু তবুও আত্ম-সাক্ষাৎকারের অন্য উপায়ও রয়েছে – আর সেই উপায় হোল ___ঈশ্বরের কৃপা লাভ করা! কিন্তু জীব সরাসরি ঈশ্বরকে আর কোথায় পাবে __তাই সাধারণ জীবের ক্ষেত্রে গুরুরূপী ঈশ্বরের কৃপা হোলেই হবে! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ অভয় দিয়ে গেছেন – স্বামী পরমানন্দও বারবার বলেছেন – ” ওরে কৃপার বাতাস তো সবসময়েই বইছে ! তোরা শুধু সেই বাতাসের অনুকূলে পাল তুলে দে !” – তাহলেই এই জীবনরূপী তরণী তরতর্ করে ওই যে অকুল-অপার সমুদ্র, তার কুলে গিয়ে ঠেকবে, তার পারে এসে ভিড়বে ! আমাদের মতো সাধারণ জীবের ক্ষেত্রে গুরু (সদগুরু) এই কাজ ত্বরান্বিত করে দেন ! এই জন্যেই তো বলা হয় “কুলগুরু” বা “কৌল” অর্থাৎ ‘যিনি অকূলে কুল পেয়েছেন’।
তিনি পেয়েছেন – তাইতো তিনি ডঙ্কা মেরে বুক বাজিয়ে জোরের সাথে বলতে পারেন – “এই দ্যাখ্ ! আমি পেয়েছি (লাভ করেছি) – তুইও পেতে পারিস ! শুধু তুই আমার নির্দেশমতো পথ চলা শুরু কর্ !” অনেকেই সেকথা শুনে শুরু করে দেয়_অনেকে ছোট শিশুর মায়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকার ন্যায় _গুরুর দিকে চেয়ে থাকে ! হয়তো সে তার অক্ষমতার কথা জানে ! গুরু তাকেও হাত ধরে খানিকটা এগিয়ে দেয় ।
এইরকম বিভিন্নভাবেই লাভ করা যায় __’গুরু কৃপা’ ! আর আগেই বলা হয়েছে – ‘ঈশ্বরের কৃপা’ তো রয়েছেই ! তাহলে বাকি থাকলো আর একটা কৃপা। আর সেটাই সব চাইতে vital ! সেটা হোলো ‘আত্মকৃপা’ বা নিজের কৃপা !
চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থ – ভক্তিশাস্ত্র হিসাবে গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণের কাছে আকর গ্রন্থ ! ওই গ্রন্থের লেখক ভক্তপ্রবর কৃষ্ণদাস কবিরাজ লিখেছেন — ” গুরু-কৃষ্ণ-বৈষ্ণবের যদি দয়া হৈল,/ একের কৃপা বিনে জীব ছারেখারে গেল !” –এই একের কৃপাই আত্মকৃপা বা নিজের কৃপা। ধরে, বেঁধে কোন মানুষকে জোর করে, মুখ টিপে ধরে ‘হাঁ’ করানো যায়, কিন্তু ‘কোঁৎ’ করে ‘গেলা’-র কাজটা ঐ ব্যক্তিকেই করতে হয় – এটা বাইরে থেকে করা যায় না ! তেমনি প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে বলা যায় যে, পৃথিবীতে ধার্মিক ব্যক্তি, ধর্মীয় নেতা, ধর্মীয় গ্রন্থাদির শেষ নাই – কিন্তু তাতে individual ঐ ব্যক্তিটির কি-ই বা যায় আসে ! “চিনি-চিনি” বললে যেমন মুখ মিষ্টি হয় না বা চিনির মিষ্টস্বাদ পাওয়া যায় না, তেমনই চিনির পাহাড়ের উপর বসে থাকলে বা সেই সমস্ত চিনি নিয়ে সদা-সর্বদা নাড়া-ঘাঁটা করলেও মুখ মিষ্টি হয় না এবং চিনির আস্বাদ-লাভও হয় না ! আস্বাদ পেতে গেলে মুখে চিনি ফেলে তার স্বাদ গ্রহণ করতে হয় !
এই কথাগুলো উদাহরণ হিসাবে বিভিন্ন মহাজনগণ ব্যবহার করেছেন। মানবসভ্যতার যে লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায় – তাতে তথাগত বুদ্ধ-কেই প্রথম ‘তথা’ (ব্রহ্মলোক, ঈশ্বরলোক) হইতে ‘আগত’-ব্যক্তি হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় বা মান্যতা দেওয়া হয় ! তারপর থেকে লিখিত ইতিহাসে গোটা পৃথিবী জুড়ে যে সমস্ত জ্ঞানী-মহাত্মা-মহাপুরুষগণের নাম পাওয়া যায় – তার সংখ্যা হয়তো কয়েক হাজার বা লক্ষ-ও হয়ে যেতে পারে ! এই সমস্ত মহাত্মা-মহাপুরুষেরা সবসময়েই সাধারণ মানুষদের মঙ্গল চিন্তা করে গেছেন, তাদেরকে সৎ-উপদেশ, সৎ-শিক্ষা দিয়ে গেছেন – কখনোই কাউকে বিপথগামী হতে অনুপ্রেরণা দান করেন নি ! কিন্তু আমরা যা দেখি, তাতে করে তাঁদের সারা জীবনের সাধনা-ত্যাগ-তিতিক্ষা-শ্রম ইত্যাদির মূল্য ঠিক কতখানি ? শত-সহস্র মানুষ কি দলে দলে আত্ম-সাক্ষাৎকার করেছে ? তারা কি ঈশ্বরলাভে সমর্থ হোতে পেরেছে অথবা নিজেরা ঈশ্বরত্ব অর্জন করতে পেরেছে ? পারেনি তো ! হয়তো কেউ কেউ পেরেছে __অধিকাংশ তো পারে নি ! কিন্তু কেন পারেনি ? –তার উত্তর ঐ একটাই হবে – “আত্মকৃপার অভাবে” পারে নি।
বেশিরভাগ মানুষই (ক্ষ্যাপা, হাবাগোবা ইত্যাদি ছাড়া) জানে কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ, সে জানে কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক ! তবুও মানুষ মাঝে মাঝেই মন্দটাকেই বেছে নেয়, বেঠিক কাজটাই করে বসে। আর তার ফলেই তৈরি হয় নতুন নতুন কর্মফল – যার ভোগান্তি জন্ম-জন্মান্তর ধরে ভুগে চলে মানুষ (অর্থাৎ আমরা)! কিন্তু আমাদের মধ্যে যারই আত্মকৃপা রয়েছে অর্থাৎ যে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্যে সাধন-ভজনে ব্রতী হয়েছে, গুরুর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে জীবন পথে এগিয়ে চলেছে – তার হবেই হবে ! তার এইজন্মেই আত্মসাক্ষাৎকার, ব্রহ্মসাক্ষাৎকার হয়ে যেতে পারে ! আর যদি এই জন্মের এই শরীরে নাও হয় – তাহলে তিন জন্মের মধ্যেই হবে – এটা নিশ্চিত ! মহাজন-মহাপুরুষের বাক্য কখনোই মিথ্যা হবার নয় ! [ক্রমশঃ]
