শ্রীশ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর ভক্ত-পার্ষদ প্রমুখদের কথা এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা এখন ছিলাম মদন মহারাজ অর্থাৎ স্বামী চিৎবিলাসানন্দ মহারাজের কথায়। বনগ্রাম আশ্রম যখন প্রথম শুরু হয় – তখন থেকেই যে মদন মহারাজ আশ্রমের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন – তা কিন্তু নয় ! উনি কিছু পরেই যোগদান করেছিলেন। কিন্তু যেহেতু গুরুমহারাজের project-এর মধ্যে উনিও একজন ছিলেন – তাই গুরুমহারাজের সংকল্পের প্রতিষ্ঠান বনগ্রাম মিশনের অনাথ আশ্রমের মূল দায়িত্ব, উনি পাকাপাকিভাবে আশ্রমে যুক্ত হবার পর‌ই পেয়ে গিয়েছিলেন।
চিৎবিলাসানন্দ মহারাজ যতদিন শরীরে ছিলেন, ততদিন উনি খুবই দায়িত্বের সঙ্গে এবং কুশলতার সঙ্গে গুরুমহারাজের দেওয়ার দায়িত্বভার পালন করেছিলেন। মদন মহারাজের সাথী বা সহকারী হিসাবে গুরুমহারাজ যে কজনকে অনাথ আশ্রমের দায়িত্বে পাঠিয়েছিলেন, তাঁদের সকলের মধ্যেও বেশ সুন্দর একটা bonding ছিল। আমরা যখন প্রথম আশ্রমে গিয়েছিলাম (১৯৮৩) তখন সেই অর্থে কোনো ‘অনাথ আশ্রম'(যাকে বলে infrastructure) তৈরি হয়নি ! তখন তো ব্রহ্মচারী-সন্ন্যাসীদেরই থাকার তেমন জায়গা ছিল না, তাই যে কয়জন ছেলে (৪/৫ জন ছিল বা তারও কম) দিয়ে অনাথ আশ্রম শুরু হয়েছিল। তারা সদ্যপ্রস্তুত একটি দেড়তলা মাটির বাড়ি (এখন যেখানে সাধনা ভবন, তার সামনের দিকে ছিল)-র নিচের তলায় সবাই মিলে একসাথেই থাকতো ! প্রথমটায় পাঁচকড়ি জামাইরা কিছুদিন দেখাশোনা করলেও কিছুদিন পর থেকেই মদন মহারাজ ছেলেদের take care করতে শুরু করেছিলেন।
আমার মনে আছে, আশ্রমে যাতায়াতের একেবারে শুরুর দিকেই ওনার সাথে আমার বেশ ভালই আলাপ জমে গেছিলো। আসলে উনি খুবই আলাপি এবং সহজ-সরল-আমুদে মানুষ ছিলেন। যেকোনো ভক্ত আশ্রমে কিছুদিন যাওয়া-আসা করতে শুরু করার পরেই – মদন মহারাজের সাথে তার আলাপ হতোই হোতো !
এর একটা অন্যতম কারণ ছিল – যেকোনো গৃহী মানুষ তাঁর বাড়িতে একটা-দুটো ছেলেমেয়ে নিয়েই অস্থির হয়ে পড়ে, অথচ এই আশ্রমে একসাথে এতগুলো বিভিন্ন বয়সের, ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ছেলেকে বড় করে তোলা, তাদের রোগ-ভোগ দেখা, তাদেরকে লেখাপড়া শেখানো, তাদেরকে শারীরিকভাবে সুগঠিত করে তোলা – “এই কাজগুলি এখানকার মহারাজেরা করেন কি করে !” এই ভাবনা থেকেই তখনকার বেশিরভাগ ভক্তরা অনাথ আশ্রমের দায়িত্বপ্রাপ্ত মহারাজদের সাথে যেচে আলাপ করতো ! তাছাড়া এইসব ছোট ছোট বাচ্চাদের জন্য অনেকেই হাতে করে কিছু না কিছু দ্রব্যসামগ্রী আনতো, তারা সেগুলিকে অনাথ আশ্রমের অধ্যক্ষ হিসাবে মদন মহারাজের হাতেই দিতো – এইভাবেও সেইসময় আশ্রমে আসা মানুষদের সাথে মদন মহারাজের একটা সুসম্পর্ক তৈরি হয়ে যেতো।
‘ তাদের সাথে ওনার সুসম্পর্ক তৈরি হোতো’ – এটা বলা হলো এইজন্য যে, “দেওয়াটা” একটা অভ্যাস। যেসব ব্যক্তি আশ্রম-বালকদের জন্য কিছু না কিছু সামগ্রী হাতে করে নিয়ে আসতো, তা সেগুলি বই-খাতা- পেন-পেন্সিল ইত্যাদিই হোক বা জামা-কাপড়-শীতবস্ত্রই হোক অথবা কোনো খাদ্যসামগ্রী অর্থাৎ বিস্কুট-লজেন্স-ফলমূলাদি – তারা বারবারই কিছু না কিছু নিয়ে আসতো ! এইভাবে যে সমস্ত ভক্তরা আশ্রমের ছেলেদেরকে নিমন্ত্রণ করে বৎসরের বিশেষ সময়ে তাদের বাড়িতে নিয়ে যেতো – তারা প্রতি বৎসরই এটা করতো। যারা ছেলেদেরকে আমিষ খাওয়াতে চাইতো (যেহেতু আশ্রমে সাধারণত নিরামিষ আহারই রান্না হয়। তবে বাচ্চাদের শরীর-স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে বা তাদের এবং ভক্তদের মনঃস্কামনা পূর্ণ করার জন্য গুরুমহারাজ আলাদা রান্নাঘরে আমিষ রান্নার ব্যবস্থা করে গেছেন।) – তারাও বছরের নির্দিষ্ট সময়ে এক একজনে(বা সমবেতভাবে) এসে খাইয়ে যেতো। এইভাবে বারবার যোগাযোগ থাকার কারনেই ভক্তমন্ডলীর অনেকের সাথে মদন মহারাজের একটা good relation তৈরি হয়ে যেতো ! আর যেহেতু মদন মহারাজের স্বভাবে ‘সহজতা’ ব্যাপারটা ছিল, তাই মহারাজ তাদের সাথে friend (বয়স কম বা বেশী যাই হোক)-এর মতোই মিশতেন এবং তদনুরূপ ব্যবহার করতেন ! সাধু-সন্ত বলে গৃহীদের সাথে যে একটা distance সাধারণত দেখা যায় – সেটা মহারাজের একদমই ছিল না !
মদন মহারাজের এই ব্যাপারটা আমাদের মিশনের অন্যান্য সাধু-ব্রহ্মচারীদের এবং অন্যান্য বিভিন্ন পরম্পরার সাধুসন্তদেরও শিক্ষণীয় ! “গৃহীদের টাকা-পয়সা বা অন্যান্য donation নেবার সময় তারা খুবই আপন, কিন্তু দেওয়া-নেওয়াটা মিটে গেলেই ‘গৃহী’ বলে একটা নাক সিঁটকানো ভাব, যাদের সাথে দেওয়া-নেওয়ার বিশেষ সম্পর্ক নাই – তাদেরকে সবসময়ই একটু দূরে দূরে রাখা”– এই ধরনের tendency বর্তমান সমাজের সাধু-সন্তদের মধ্যে খুবই দেখা যায় ! কিন্তু এর একটা চরম কুফল ও রয়েছে ! এর ফলে কি হয়,না__দেখা যাচ্ছে বর্তমানে গৃহী মানুষেরাও ওই ধরনের সাধু-সন্তদের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে বসছে, তাদের ভালো-মন্দের সাথে নিজেদেরকে জড়াতেই চাইছে না ! সাধুসন্তদের ব্যক্তিগত জীবনে কোনো ঝামেলা উপস্থিত হোলেও __’ওসব ওনাদের ব্যাপার’_বলে উদাসীন থেকে যাচ্ছে ! শুধু তাদের বাৎসরিক উৎসব-অনুষ্ঠানে বাউলগান শুনতে আর খিচুড়ি খেতে একবার করে যায়, আর হয়তো কিছু চাঁদাও দেয় !
কিন্তু গুরুমহারাজ কি বলেছিলেন ? উনি বলেছিলেন _’সাধু-সন্ত এবং গৃহী মানুষ উভয়েই উভয়ের পরিপূরক হয়ে সমাজে বাস করবে (যাঁরা গিরি-গুহা-জঙ্গলে অর্থাৎ লোকচক্ষুর অন্তরালে– একান্তে থাকেন, তাদের জন্য এ কথা নয়), গৃহীদের কাছে সাধু-সন্তরা যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু অন্ন-বস্ত্র বা বাসস্থানের জন্য সাহায্য নেবে, আর বিনিময়ে তাঁরা সমাজের মানুষকে শেখাবে বাঁচার কলা এবং জীবনের কলা অর্থাৎ Art of life , Art of living !
(বাকি কথা পরের দিন।) (ক্রমশঃ)