শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের শিষ্য, পার্ষদ, ভক্তসমূহের কথা এখানে বলার চেষ্টা করা হচ্ছিলো। আমরা এখন আলোচনা করছিলাম মদন মহারাজ বা স্বামী চিৎবিলাসানন্দের সম্বন্ধে। কিন্তু এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অন্যান্য নানান প্রসঙ্গ চলে আসছে – ফলে, এবারেও কতটা বলা যাবে তা ভগবান পরমানন্দই জানেন ! যাইহোক্, প্রসঙ্গ আগিয়ে নেওয়া যাক্।
গুরুমহারাজ তাঁর সকল ত্যাগী সন্তানদেরকেই অত্যন্ত স্নেহ করতেন – আর করবেনই না কেন? এই জগৎ তো ভোগময় ! প্রায় সমস্ত মানুষ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিসরে নিজের ভোগের জগৎ নিয়েই মেতে রয়েছে ! তাদের আর বহুজনহিতায়-বহুজনসুখায় কাজ করার মানসিকতাই বা কোথায় আর সময়ই বা কতটুকু ? কিছু কিছু মানুষ ভোগময় সংসার করার ফাঁকে, একটু-আধটু সময় বের করে কিছু কিছু জনসেবামূলক কাজ করে থাকে – কিন্তু তাতেও প্রচার পাবার যথেষ্ট আকাঙ্খা বিদ্যমান থাকে। Where as, প্রকৃত অর্থেই যাঁরা ত্যাগী-সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারী, তাঁরা আগে থাকতেই “মায়ের কাছে বলি প্রদত্ত !” তাঁরা তো আত্মসুখের সমস্তরকম ইচ্ছা বিসর্জন দিয়ে “আত্মনোমোক্ষার্থং জগৎহিতায় চ”– কাজ করার জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়ে ত্যাগব্রত অবলম্বন করেছেন। ফলে তাঁর আর নতুন করে প্রচারের প্রয়োজন নাই – তিনি যেখানে যখন থাকবেন, তখনই সেখানে কোনো না কোনো বহুজনহিতায়-বহুজনসুখায় কাজই করতে থাকবেন। এই কাজে কখনোই কোনো অন্যথা হবার কথা নয় ! তাই তো তাঁরা ভগবানের সবচাইতে প্রিয়!
সুধী পাঠকবৃন্দ হয়তো বলতে পারেন, ঠিক ঠিক এমনটা তো আমরা তাদেরকে সবসময় করতে দেখি না ! তাঁদেরও তো যথেষ্টই ভোগের প্রতি, বিলাস-ব্যসনের প্রতি, যশ-প্রতিষ্ঠা-খ্যাতির প্রতি মোহ রয়েছে ! হ্যাঁ, তা হয়তো কিছু কিছু রয়েছে – আর সেইজন্যেই তো বর্তমান সাধুসমাজ যতটা সমাজের কাছে গ্রহনযোগ্য হয়ে ওঠা উচিৎ ছিল, সমাজের মাথায় থেকে কাজ করা উচিৎ ছিল – ততটা হয়ে উঠতে পারে নি ! এইজন্যই তোবেশিরভাগ সাধারণ মানুষও সাধুসন্তদের এড়িয়ে চলে, পাত্তা দিতে চায় না ! Madia-য় দু’চারটে নামকরা সাধুসন্তের scandal ছড়িয়ে পড়তেই (এগুলো plan করে তাদেরকে maline করাও হতে পারে) বাদবাকি সমস্ত সাধুসমাজের সম্বন্ধে মানুষ কুমনোভাব পোষণ করে এবং কুমন্তব্য করতে শুরু করে ! আবার সমাজে যখনই স্বামী বিবেকানন্দ অথবা স্বামী পরমানন্দের ন্যায় সন্ন্যাসীশ্রেষ্ঠরা cyclone-এর মতো আবির্ভাব হ’ন, তখন এই তথাকথিত মনুষ্যসমাজ যেন একটু নড়েচড়ে বসে ! তখন তারা আবার সাধু-সন্তদেরকে নিয়ে নতুন করে চিন্তা ভাবনা করতে থাকে, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠতে শুরু করে !
কিন্তু দেখুন – ওই যে আগে বলা হয়েছিল “পঞ্চভূতের ফাঁদে, ব্রহ্ম পড়ে কাঁদে” – সাধুসন্ত হয়েছে তো কি হয়েছে ? তারাও তো মানুষ ! হয়তো আমাদের থেকে একটু উন্নত চেতনার মানুষ। কিন্তু মানুষ তো ! ফলে এই পৃথিবীগ্রহের রূপ-রস-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শাদি রূপ মহামায়ার যে ফাঁদ পাতা রয়েছে, তাতে একটু-আধটু বিভ্রান্ত যে কেউ হতেই পারে ! এই ফাঁদগুলি কাটানোটাই তো সাধনা ! এই সাধনাই তো তাঁরা করছেন ! কেউ কেউ ঐগুলির প্রলোভন overcome করতে পারছেন – হয়তো কেউ পারছেন না, ফেঁসে যাচ্ছেন ! তাতে ‘গেল’- ‘গেল’ রব তোলার কিছুই নাই !
কিছুদিন আগেই রামকৃষ্ণ মিশন পরম্পরার এক সাধু (বীরভূমের একস্থানে আশ্রম করে রয়েছে। ওর গুরুদেব রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসী। এখন বেরিয়ে গিয়ে পৃথক সংঘ তৈরি করেছেন।) আমাদের সাথে দু-চার কথা বলতে বলতেই এমন রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেল যে, আমাদেরকে যা তা বলতে শুরু করলো, প্রায় তার আশ্রম থেকে আমাদেরকে বের করেই দিতে চাইলো ! আমরা (তিনজন গৃহীভক্ত এবং একজন গেরুয়া পড়া ব্রহ্মচারী) ওনার এইরকম ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ দেখে একটু অবাক হলাম এবং একেবারে শান্ত হয়ে গেলাম ! ফলে কিছুক্ষণ লম্ফঝম্প-আস্ফালন করার পরে ও চুপ করে গেল ! কিন্তু বারবার “ও যে একজন সন্ন্যাসী এবং সেটাই ওর অহংকার”– এই কথাটা বলছিল ! সেই সঙ্গে আমাদের সাথে যে গেরুয়া পড়া ব্রহ্মচারীটি ছিল, তাকেও চিৎকার করে যথেষ্ট পরিমাণে ‘জ্ঞান’ দিচ্ছিলো (যেটা রামকৃষ্ণ পরম্পরার বর্তমান সাধুরা প্রায়শঃই দিয়েই থাকে) যে, ”তাঁরও গৃহীদেরকে পাত্তা দেওয়া উচিত নয়, তাদের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা উচিত”- ইত্যাদি ইত্যাদি !
দেখুন ! এর ফলে কি হোলো – ওই সাধুটিই আমাদের চোখে অনেকটাই খেলো হয়ে গেলো ! ওর সন্ন্যাসী হিসাবে ‘অহংকার’ ষোলআনা, কিন্তু দুটো-একটা গুরুমহারাজের কথা শুনেই ক্রোধে উন্মত্তপ্রায় হয়ে উঠলো। শ্রীমদ্ভাগবত গীতায় রয়েছে – ‘কাম বিকৃতি থেকে ক্রোধের সৃষ্টি বা উৎপত্তি হয়!’ – সেই কথাটাও সেই মুহূর্তে সাধুটি ভুলে বসলো !
যাইহোক, এইসব বিভিন্ন কারণে সাধুসমাজের দিক থেকেও সাধারণ মানুষ অনেকটাই মুখ ফিরিয়ে রেখেছে ! তবু সেবামূলক কাজ যে সব মঠ-মিশনে হয় সেখানে মানুষ (যাদের পয়সা বা শ্রম দেবার ক্ষমতা ও ইচ্ছা রয়েছে) নিজেদেরকে associate করে।
গুরুমহারাজ বনগ্রাম আশ্রমের গৃহীভক্তদেরকে উদ্দেশ্য করে এই সমস্ত কাজে সহযোগিতা করার জন্য বলেছিলেন। উনি বলেছিলেন সাধারণ মানুষ নিজে আর কতটুকু সেবামূলক কাজ করতে পারে ? তাই বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হোতে পারলে – তার মাধ্যমে অন্তত ক্ষুদ্র সামর্থ্য দিয়েও অংশগ্রহণ করা যায়। এই কাজগুলি নিঃস্বার্থ হওয়ায় একে ‘নিষ্কাম কর্ম’ বলা হয়। আর একমাত্র নিষ্কাম কর্মের দ্বারাই জন্ম-জন্মান্তরের সঞ্চিত কর্মফলের ক্ষয় হয়। তাই চেতনাসম্পন্ন সকল ব্যক্তিরই এই ধরনের নিষ্কাম কর্মের সাথে যুক্ত হওয়া উচিৎ !
(ক্রমশঃ)
গুরুমহারাজ তাঁর সকল ত্যাগী সন্তানদেরকেই অত্যন্ত স্নেহ করতেন – আর করবেনই না কেন? এই জগৎ তো ভোগময় ! প্রায় সমস্ত মানুষ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিসরে নিজের ভোগের জগৎ নিয়েই মেতে রয়েছে ! তাদের আর বহুজনহিতায়-বহুজনসুখায় কাজ করার মানসিকতাই বা কোথায় আর সময়ই বা কতটুকু ? কিছু কিছু মানুষ ভোগময় সংসার করার ফাঁকে, একটু-আধটু সময় বের করে কিছু কিছু জনসেবামূলক কাজ করে থাকে – কিন্তু তাতেও প্রচার পাবার যথেষ্ট আকাঙ্খা বিদ্যমান থাকে। Where as, প্রকৃত অর্থেই যাঁরা ত্যাগী-সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারী, তাঁরা আগে থাকতেই “মায়ের কাছে বলি প্রদত্ত !” তাঁরা তো আত্মসুখের সমস্তরকম ইচ্ছা বিসর্জন দিয়ে “আত্মনোমোক্ষার্থং জগৎহিতায় চ”– কাজ করার জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়ে ত্যাগব্রত অবলম্বন করেছেন। ফলে তাঁর আর নতুন করে প্রচারের প্রয়োজন নাই – তিনি যেখানে যখন থাকবেন, তখনই সেখানে কোনো না কোনো বহুজনহিতায়-বহুজনসুখায় কাজই করতে থাকবেন। এই কাজে কখনোই কোনো অন্যথা হবার কথা নয় ! তাই তো তাঁরা ভগবানের সবচাইতে প্রিয়!
সুধী পাঠকবৃন্দ হয়তো বলতে পারেন, ঠিক ঠিক এমনটা তো আমরা তাদেরকে সবসময় করতে দেখি না ! তাঁদেরও তো যথেষ্টই ভোগের প্রতি, বিলাস-ব্যসনের প্রতি, যশ-প্রতিষ্ঠা-খ্যাতির প্রতি মোহ রয়েছে ! হ্যাঁ, তা হয়তো কিছু কিছু রয়েছে – আর সেইজন্যেই তো বর্তমান সাধুসমাজ যতটা সমাজের কাছে গ্রহনযোগ্য হয়ে ওঠা উচিৎ ছিল, সমাজের মাথায় থেকে কাজ করা উচিৎ ছিল – ততটা হয়ে উঠতে পারে নি ! এইজন্যই তোবেশিরভাগ সাধারণ মানুষও সাধুসন্তদের এড়িয়ে চলে, পাত্তা দিতে চায় না ! Madia-য় দু’চারটে নামকরা সাধুসন্তের scandal ছড়িয়ে পড়তেই (এগুলো plan করে তাদেরকে maline করাও হতে পারে) বাদবাকি সমস্ত সাধুসমাজের সম্বন্ধে মানুষ কুমনোভাব পোষণ করে এবং কুমন্তব্য করতে শুরু করে ! আবার সমাজে যখনই স্বামী বিবেকানন্দ অথবা স্বামী পরমানন্দের ন্যায় সন্ন্যাসীশ্রেষ্ঠরা cyclone-এর মতো আবির্ভাব হ’ন, তখন এই তথাকথিত মনুষ্যসমাজ যেন একটু নড়েচড়ে বসে ! তখন তারা আবার সাধু-সন্তদেরকে নিয়ে নতুন করে চিন্তা ভাবনা করতে থাকে, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠতে শুরু করে !
কিন্তু দেখুন – ওই যে আগে বলা হয়েছিল “পঞ্চভূতের ফাঁদে, ব্রহ্ম পড়ে কাঁদে” – সাধুসন্ত হয়েছে তো কি হয়েছে ? তারাও তো মানুষ ! হয়তো আমাদের থেকে একটু উন্নত চেতনার মানুষ। কিন্তু মানুষ তো ! ফলে এই পৃথিবীগ্রহের রূপ-রস-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শাদি রূপ মহামায়ার যে ফাঁদ পাতা রয়েছে, তাতে একটু-আধটু বিভ্রান্ত যে কেউ হতেই পারে ! এই ফাঁদগুলি কাটানোটাই তো সাধনা ! এই সাধনাই তো তাঁরা করছেন ! কেউ কেউ ঐগুলির প্রলোভন overcome করতে পারছেন – হয়তো কেউ পারছেন না, ফেঁসে যাচ্ছেন ! তাতে ‘গেল’- ‘গেল’ রব তোলার কিছুই নাই !
কিছুদিন আগেই রামকৃষ্ণ মিশন পরম্পরার এক সাধু (বীরভূমের একস্থানে আশ্রম করে রয়েছে। ওর গুরুদেব রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসী। এখন বেরিয়ে গিয়ে পৃথক সংঘ তৈরি করেছেন।) আমাদের সাথে দু-চার কথা বলতে বলতেই এমন রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেল যে, আমাদেরকে যা তা বলতে শুরু করলো, প্রায় তার আশ্রম থেকে আমাদেরকে বের করেই দিতে চাইলো ! আমরা (তিনজন গৃহীভক্ত এবং একজন গেরুয়া পড়া ব্রহ্মচারী) ওনার এইরকম ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ দেখে একটু অবাক হলাম এবং একেবারে শান্ত হয়ে গেলাম ! ফলে কিছুক্ষণ লম্ফঝম্প-আস্ফালন করার পরে ও চুপ করে গেল ! কিন্তু বারবার “ও যে একজন সন্ন্যাসী এবং সেটাই ওর অহংকার”– এই কথাটা বলছিল ! সেই সঙ্গে আমাদের সাথে যে গেরুয়া পড়া ব্রহ্মচারীটি ছিল, তাকেও চিৎকার করে যথেষ্ট পরিমাণে ‘জ্ঞান’ দিচ্ছিলো (যেটা রামকৃষ্ণ পরম্পরার বর্তমান সাধুরা প্রায়শঃই দিয়েই থাকে) যে, ”তাঁরও গৃহীদেরকে পাত্তা দেওয়া উচিত নয়, তাদের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা উচিত”- ইত্যাদি ইত্যাদি !
দেখুন ! এর ফলে কি হোলো – ওই সাধুটিই আমাদের চোখে অনেকটাই খেলো হয়ে গেলো ! ওর সন্ন্যাসী হিসাবে ‘অহংকার’ ষোলআনা, কিন্তু দুটো-একটা গুরুমহারাজের কথা শুনেই ক্রোধে উন্মত্তপ্রায় হয়ে উঠলো। শ্রীমদ্ভাগবত গীতায় রয়েছে – ‘কাম বিকৃতি থেকে ক্রোধের সৃষ্টি বা উৎপত্তি হয়!’ – সেই কথাটাও সেই মুহূর্তে সাধুটি ভুলে বসলো !
যাইহোক, এইসব বিভিন্ন কারণে সাধুসমাজের দিক থেকেও সাধারণ মানুষ অনেকটাই মুখ ফিরিয়ে রেখেছে ! তবু সেবামূলক কাজ যে সব মঠ-মিশনে হয় সেখানে মানুষ (যাদের পয়সা বা শ্রম দেবার ক্ষমতা ও ইচ্ছা রয়েছে) নিজেদেরকে associate করে।
গুরুমহারাজ বনগ্রাম আশ্রমের গৃহীভক্তদেরকে উদ্দেশ্য করে এই সমস্ত কাজে সহযোগিতা করার জন্য বলেছিলেন। উনি বলেছিলেন সাধারণ মানুষ নিজে আর কতটুকু সেবামূলক কাজ করতে পারে ? তাই বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হোতে পারলে – তার মাধ্যমে অন্তত ক্ষুদ্র সামর্থ্য দিয়েও অংশগ্রহণ করা যায়। এই কাজগুলি নিঃস্বার্থ হওয়ায় একে ‘নিষ্কাম কর্ম’ বলা হয়। আর একমাত্র নিষ্কাম কর্মের দ্বারাই জন্ম-জন্মান্তরের সঞ্চিত কর্মফলের ক্ষয় হয়। তাই চেতনাসম্পন্ন সকল ব্যক্তিরই এই ধরনের নিষ্কাম কর্মের সাথে যুক্ত হওয়া উচিৎ !
(ক্রমশঃ)
