জিজ্ঞাসু :– একটা বইয়ে পড়লাম (জয়দেব মুখার্জির ‘ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে’), পুষ্কলাবতী নামে একটা রাজ্য বৌদ্ধ যুগে জ্ঞান-গরিমায় খুব উন্নত ছিল । ওই বইয়ে আরও আছে যে শিব (দেবাদিদেব মহাদেব) বা সদাশিব কোনো সময় শরীরধারী মহামানব ছিলেন । তাঁর কিছু প্রমাণও উনি উপস্থাপনা করেছেন । এগুলো কি ঠিক না কাল্পনিক ?
গুরুমহারাজ :– বহু পূর্বে পুষ্কলাবতী রাজ্য গান্ধার রাজ্যের অন্তর্গত ছিল । পরে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বহু প্রাচীনকাল থেকে ওইসব অঞ্চল খুবই সমৃদ্ধ ছিল । ‘সমৃদ্ধ’__ অর্থে ধনে, জ্ঞানে, সংস্কৃতিতে – সবদিক থেকেই উন্নত ছিল ! বর্তমান আফগানিস্তানের কান্দাহার নামটি তৎকালীন গান্ধার থেকেই এসেছে । বহু পূর্বে হিমালয়পুষ্ট সরস্বতী নদীর প্রবাহ ছিল ওই সব অঞ্চল দিয়ে (এখন প্রত্নতাত্বিক গবেষণায় এসব তথ্য পাওয়াও গেছে।)৷ তাই ওই সমস্ত স্থান এখনকার মতো রুক্ষ ভূমি ছিল না বরং নদীমাতৃক উর্বর এলাকা ছিল ৷ তাই প্রাচীনকাল থেকেই ওই সমস্ত অঞ্চল কৃষিতে সমৃদ্ধ ছিল বলে_ সভ্যতার বিকাশও ঘটেছিল দ্রুত । South গ্রীসের (বর্তমান তুরস্ক) ম্যাসিডন (ম্যাকিডনিয়া) অঞ্চল থেকে আলেকজান্ডার যখন ওই সমস্ত অঞ্চল আক্রমণ করেছিল, তখন পুষ্কলাবতী নগরীর সম্পূর্ণ পতন হয় ৷ বর্তমানে আর ওই অঞ্চলের অস্তিত্ব নাই বললেই চলে ৷ তবে ওখানে কিছু জনজাতি এখনো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
‘আলেকজান্ডার’ বা ‘সেকেন্দার শাহ’ _এই নামকরণ করেছে ঐতিহাসিকেরা, কিন্তু এ দুটোই ওর নাম নয় _ দুটিই উপাধি বা পাওয়া নাম ৷ আলেক্স আন্দ্রেয়স্ বা ঈশ্বরের পুত্র । আর আরবীতে সেকেন্দার বা সিকান্দার অর্থে _’যে জেতে’ বা ‘জয়ী হয়’ । ম্যসিডন থেকে বেরিয়ে পরপর রাজ্য জয় করেছিল বলে _ কোনো কোনো ঐতিহাসিক ওর নাম দিয়েছিল ‘সেকেন্দার শাহ’ ।
‘শাহ’ অর্থে রাজা বা সম্রাট । আর ঈশ্বরের পুত্র বা Son of God __কথাটার ইউরোপে প্রচলন হয়েছিল আলেকজান্ডারের পর থেকেই ৷ আলেকজান্ডার প্রচার করেছিল যে, সে ঈশ্বরের পুত্র _ তার কখনোই পরাজয় ঘটবে না! তার শরীরে কেউ কখনও অস্ত্রাঘাত করতে পারবে না – ইত্যাদি । তবে দিগ্বীজয়ী বা এই ধরনের যে সব উপাধি ওকে দেওয়া হয়েছিল বা আরো যেসব বিশেষণ ব্যবহার করা হয়েছিল – সেগুলি কোনোটাই যথার্থ নয় ! কারণ তেমন খুব একটা বড় ধরনের যুদ্ধ ওকে করতেই হয়নি যে, একজন দিগ্বীজয়ী বীরের বীরত্বের পরীক্ষা হবে !
ম্যাকিডনিয়া বা ম্যাসিডন থেকে ও যখন বেরোলো, তখন ওর সৈন্যসংখ্যা কত ছিল ? খুবই সামান্য । ম্যাসিডন তো তৎকালীন গ্রীসের উত্তর অংশের একটা ভাগ, বর্তমানে এ স্থান তুরস্কের অন্তর্গত ! ওখানকার ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর নরপতি ছিল ওর পিতা ফিলিপ । ফলে খুবই কম সংখ্যক সৈন্য নিয়ে ও প্রথমে আসে ব্যবিলনে ৷ ব্যবিলনের তখন করুন অবস্থা! ভেঙে ভেঙে ক্ষুদ্র রাজ্যে পরিণত হয়েছে ! সৈন্যসংখ্যা খুবই কম, তাই ব্যবিলন জয় করতে আলেকজান্ডারের তেমন কোনো অসুবিধাই হয়নি । এরপর Red Sea ধরে আগাতে আগাতে ও এসে পৌঁছেছিল মিশরে । তখনকার মিশরও অনেকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ! ফলে ছোট ছোট অনেকগুলো রাজা,যাদের নিজেদের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা ! ওখানেও কোনো শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি !
এইভাবে আলেকজান্ডারের মিশর জয় হয়ে গিয়েছিল । তখনকার দিনে বেশিরভাগ রাজারা যুদ্ধবিগ্রহের সময় ভাড়াটে সৈন্য ব্যবহার করতো । রাজ্য জয় হোলে ‘রাজ্য আমার, আর লুটের মাল তোমাদের’_এই ছিল শর্ত। তখনকার বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত মরুদস্যুরা ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে কাজ করতো । ফলে আলেকজান্ডার যত রাজ্য জয় করতে লাগলো_ওর সৈন্যসংখ্যা দিন দিন ততই বাড়তে লাগলো ৷ কারণ মরুদস্যুরা একজন সেকেন্দার-কে পেয়ে গেল, তার সঙ্গে থাকলেই নতুন নতুন রাজ্যজয় এবং রাশি রাশি লুটের মাল লাভ। এরা ছাড়াও বিজিত রাজাদের সৈন্যরাও ঐ একই শর্তে জয়ী সম্রাটের দলে যোগ দিয়ে দিতো ৷
যাইহোক, এইভাবে সৈন্যসংখ্যা বাড়িয়ে ওখান থেকে আলেকজান্ডার গতিপথ পরিবর্তন করে আসে পারস্য (ইরান) । এইখানে এসে একটু হোলেও প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছিল আলেকজান্ডারকে ৷ কিন্তু যেহেতু ততদিনে ওর সৈন্যসংখ্যা হয়ে গেছিলো প্রচুর, তাই পারস্যের সেনাবাহিনী সংখ্যার বিচারে কম হওয়ায় ওখানকার সম্রাট প্রথমটায় প্রতিরোধ গড়ে তুলেও পরাজিত হয়ে গেল ।
এই যে আলেকজান্ডার মিশর থেকে তার যাত্রার অভিমুখ পরিবর্তন করলো অর্থাৎ আফ্রিকা বা ইউরোপের দিকে না গিয়ে এশিয়ার ভারতের দিকে আগাতে লাগলো, তার পেছনে একটা কারণ ছিল । ছোটবেলায় ওকে(রাজপুত্র তো বটে) পড়াতে আসতো যেসব আচার্য তাদের মধ্যে ছিলেন অ্যারিস্টটল / ডায়াজেনেসের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিরা ! তাঁদের জ্ঞান-গরিমায় মুগ্ধ হয়ে বালক আলেকজান্ডার আচার্যদেরকে জিজ্ঞাসা করতো – ‘এই যে আমাদের দেশে আপনাদের মতো এতো জ্ঞানী রয়েছে এবং রয়েছে এতো জ্ঞান, এইরকম দেশ কি পৃথিবীতে অন্য কোথাও রয়েছে ? অ্যারিস্টটল উত্তর দিয়েছিলেন – পূর্বদিকে এক সুসভ্য দেশ রয়েছে । সেখানকারই সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানরাশি গ্রীকসহ বাকি সমস্ত স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে ৷ আমাদের যা জ্ঞান ,তার সেখান থেকেই প্রাপ্ত। সেই দেশে গুরু, গঙ্গা ও গীতা রয়েছে ।” আলেকজান্ডার সেই ছোটোবয়সেই সংকল্প করেছিল যে, ‘সে বড় হয়ে সেই দেশে যাবেই যাবে’ I
সেই ছোটবেলার কথা আলেকজান্ডারের স্মরণে আসতেই ওর গতিপথের পরিবর্তন ! হঠাৎ করে মিশর থেকে আরও পশ্চিমে না গিয়ে ও পূর্বের রাস্তা ধরে এবং ঘোষণা করে ” আমি সূর্য ওঠার দেশ পর্যন্ত যাবো ৷” ….. (বাকি অংশ পরের দিন)।
[ক্রমশঃ]
গুরুমহারাজ :– বহু পূর্বে পুষ্কলাবতী রাজ্য গান্ধার রাজ্যের অন্তর্গত ছিল । পরে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বহু প্রাচীনকাল থেকে ওইসব অঞ্চল খুবই সমৃদ্ধ ছিল । ‘সমৃদ্ধ’__ অর্থে ধনে, জ্ঞানে, সংস্কৃতিতে – সবদিক থেকেই উন্নত ছিল ! বর্তমান আফগানিস্তানের কান্দাহার নামটি তৎকালীন গান্ধার থেকেই এসেছে । বহু পূর্বে হিমালয়পুষ্ট সরস্বতী নদীর প্রবাহ ছিল ওই সব অঞ্চল দিয়ে (এখন প্রত্নতাত্বিক গবেষণায় এসব তথ্য পাওয়াও গেছে।)৷ তাই ওই সমস্ত স্থান এখনকার মতো রুক্ষ ভূমি ছিল না বরং নদীমাতৃক উর্বর এলাকা ছিল ৷ তাই প্রাচীনকাল থেকেই ওই সমস্ত অঞ্চল কৃষিতে সমৃদ্ধ ছিল বলে_ সভ্যতার বিকাশও ঘটেছিল দ্রুত । South গ্রীসের (বর্তমান তুরস্ক) ম্যাসিডন (ম্যাকিডনিয়া) অঞ্চল থেকে আলেকজান্ডার যখন ওই সমস্ত অঞ্চল আক্রমণ করেছিল, তখন পুষ্কলাবতী নগরীর সম্পূর্ণ পতন হয় ৷ বর্তমানে আর ওই অঞ্চলের অস্তিত্ব নাই বললেই চলে ৷ তবে ওখানে কিছু জনজাতি এখনো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
‘আলেকজান্ডার’ বা ‘সেকেন্দার শাহ’ _এই নামকরণ করেছে ঐতিহাসিকেরা, কিন্তু এ দুটোই ওর নাম নয় _ দুটিই উপাধি বা পাওয়া নাম ৷ আলেক্স আন্দ্রেয়স্ বা ঈশ্বরের পুত্র । আর আরবীতে সেকেন্দার বা সিকান্দার অর্থে _’যে জেতে’ বা ‘জয়ী হয়’ । ম্যসিডন থেকে বেরিয়ে পরপর রাজ্য জয় করেছিল বলে _ কোনো কোনো ঐতিহাসিক ওর নাম দিয়েছিল ‘সেকেন্দার শাহ’ ।
‘শাহ’ অর্থে রাজা বা সম্রাট । আর ঈশ্বরের পুত্র বা Son of God __কথাটার ইউরোপে প্রচলন হয়েছিল আলেকজান্ডারের পর থেকেই ৷ আলেকজান্ডার প্রচার করেছিল যে, সে ঈশ্বরের পুত্র _ তার কখনোই পরাজয় ঘটবে না! তার শরীরে কেউ কখনও অস্ত্রাঘাত করতে পারবে না – ইত্যাদি । তবে দিগ্বীজয়ী বা এই ধরনের যে সব উপাধি ওকে দেওয়া হয়েছিল বা আরো যেসব বিশেষণ ব্যবহার করা হয়েছিল – সেগুলি কোনোটাই যথার্থ নয় ! কারণ তেমন খুব একটা বড় ধরনের যুদ্ধ ওকে করতেই হয়নি যে, একজন দিগ্বীজয়ী বীরের বীরত্বের পরীক্ষা হবে !
ম্যাকিডনিয়া বা ম্যাসিডন থেকে ও যখন বেরোলো, তখন ওর সৈন্যসংখ্যা কত ছিল ? খুবই সামান্য । ম্যাসিডন তো তৎকালীন গ্রীসের উত্তর অংশের একটা ভাগ, বর্তমানে এ স্থান তুরস্কের অন্তর্গত ! ওখানকার ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর নরপতি ছিল ওর পিতা ফিলিপ । ফলে খুবই কম সংখ্যক সৈন্য নিয়ে ও প্রথমে আসে ব্যবিলনে ৷ ব্যবিলনের তখন করুন অবস্থা! ভেঙে ভেঙে ক্ষুদ্র রাজ্যে পরিণত হয়েছে ! সৈন্যসংখ্যা খুবই কম, তাই ব্যবিলন জয় করতে আলেকজান্ডারের তেমন কোনো অসুবিধাই হয়নি । এরপর Red Sea ধরে আগাতে আগাতে ও এসে পৌঁছেছিল মিশরে । তখনকার মিশরও অনেকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ! ফলে ছোট ছোট অনেকগুলো রাজা,যাদের নিজেদের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা ! ওখানেও কোনো শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি !
এইভাবে আলেকজান্ডারের মিশর জয় হয়ে গিয়েছিল । তখনকার দিনে বেশিরভাগ রাজারা যুদ্ধবিগ্রহের সময় ভাড়াটে সৈন্য ব্যবহার করতো । রাজ্য জয় হোলে ‘রাজ্য আমার, আর লুটের মাল তোমাদের’_এই ছিল শর্ত। তখনকার বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত মরুদস্যুরা ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে কাজ করতো । ফলে আলেকজান্ডার যত রাজ্য জয় করতে লাগলো_ওর সৈন্যসংখ্যা দিন দিন ততই বাড়তে লাগলো ৷ কারণ মরুদস্যুরা একজন সেকেন্দার-কে পেয়ে গেল, তার সঙ্গে থাকলেই নতুন নতুন রাজ্যজয় এবং রাশি রাশি লুটের মাল লাভ। এরা ছাড়াও বিজিত রাজাদের সৈন্যরাও ঐ একই শর্তে জয়ী সম্রাটের দলে যোগ দিয়ে দিতো ৷
যাইহোক, এইভাবে সৈন্যসংখ্যা বাড়িয়ে ওখান থেকে আলেকজান্ডার গতিপথ পরিবর্তন করে আসে পারস্য (ইরান) । এইখানে এসে একটু হোলেও প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছিল আলেকজান্ডারকে ৷ কিন্তু যেহেতু ততদিনে ওর সৈন্যসংখ্যা হয়ে গেছিলো প্রচুর, তাই পারস্যের সেনাবাহিনী সংখ্যার বিচারে কম হওয়ায় ওখানকার সম্রাট প্রথমটায় প্রতিরোধ গড়ে তুলেও পরাজিত হয়ে গেল ।
এই যে আলেকজান্ডার মিশর থেকে তার যাত্রার অভিমুখ পরিবর্তন করলো অর্থাৎ আফ্রিকা বা ইউরোপের দিকে না গিয়ে এশিয়ার ভারতের দিকে আগাতে লাগলো, তার পেছনে একটা কারণ ছিল । ছোটবেলায় ওকে(রাজপুত্র তো বটে) পড়াতে আসতো যেসব আচার্য তাদের মধ্যে ছিলেন অ্যারিস্টটল / ডায়াজেনেসের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিরা ! তাঁদের জ্ঞান-গরিমায় মুগ্ধ হয়ে বালক আলেকজান্ডার আচার্যদেরকে জিজ্ঞাসা করতো – ‘এই যে আমাদের দেশে আপনাদের মতো এতো জ্ঞানী রয়েছে এবং রয়েছে এতো জ্ঞান, এইরকম দেশ কি পৃথিবীতে অন্য কোথাও রয়েছে ? অ্যারিস্টটল উত্তর দিয়েছিলেন – পূর্বদিকে এক সুসভ্য দেশ রয়েছে । সেখানকারই সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানরাশি গ্রীকসহ বাকি সমস্ত স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে ৷ আমাদের যা জ্ঞান ,তার সেখান থেকেই প্রাপ্ত। সেই দেশে গুরু, গঙ্গা ও গীতা রয়েছে ।” আলেকজান্ডার সেই ছোটোবয়সেই সংকল্প করেছিল যে, ‘সে বড় হয়ে সেই দেশে যাবেই যাবে’ I
সেই ছোটবেলার কথা আলেকজান্ডারের স্মরণে আসতেই ওর গতিপথের পরিবর্তন ! হঠাৎ করে মিশর থেকে আরও পশ্চিমে না গিয়ে ও পূর্বের রাস্তা ধরে এবং ঘোষণা করে ” আমি সূর্য ওঠার দেশ পর্যন্ত যাবো ৷” ….. (বাকি অংশ পরের দিন)।
[ক্রমশঃ]
