[একজন ভক্তের জিজ্ঞাসার উত্তরে গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ আলেকজান্ডারের ভারত অভিযান এবং তার পরবর্তী সময়ের কথা বলছিলেন! আজ তার পরবর্তী অংশ!]
……এরপর চাণক্যই হয়েছিলেন মগধের তথা মৌর্যবংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা চন্দ্রগুপ্তের গুরু এবং তাঁর রাজ্যের মহামন্ত্রী । এই সময় রাজকার্য্যের অবসরে উনি বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যার মধ্যে ‘অর্থশাস্ত্র’-গ্রন্থটির কথা শিক্ষিত ব্যক্তি মাত্র সকলেই জানে । যে গ্রন্থটিকে গোটা পৃথিবীর সমস্ত অর্থনীতি সংক্রান্ত পুস্তকের ‘জননী’ বলা যায় । তাছাড়াও বিষ্ণুগুপ্ত বা চাণক্য জীবনে চলার প্রতিপদে, মানুষের কি করা কর্তব্য বা উচিত এবং কি কি করা উচিত নয় – তার জন্য বহু মূল্যবান উপদেশ লিখে রেখে গেছেন ! যেগুলি বাংলায় “হিতোপদেশ” বলা হয় । ‘হিতোপদেশ’ অর্থে যে উপদেশাবলী পালন করলে মানুষের হিত বা মঙ্গল হয় ৷ পরবর্তীতে ‘মুদ্রারাক্ষস’ গ্রন্থটি চাণক্যকে নিয়েই রচিত হয়েছিল ৷ কোনো রাজা প্রজাদেরকে পীড়ন না করে তার রাজ্য থেকে কত ভাবে বা কত রকম উপায়ে রাজস্ব আদায় করে রাজকোষ সমৃদ্ধ করতে পারে – তার পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা রয়েছে কৌটিল্য রচিত “অর্থশাস্ত্রে”।
দ্যাখো, তুমি প্রাচীন পুষ্কলাবতীর কথা মনে পাড়াতেই ভারতবর্ষের সেই সব দিনের কথা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে, আর আমি তাই দেখেই তোমাদের বলে যাচ্ছি ৷ তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলে_কোনো একজন লেখকের লেখা অনুযায়ী শিব বা সদাশিবের পৃথিবীতে শরীর ধারণের কথা ? হ্যাঁ, ঠিকই লিখেছে লেখক ! কোন বই-এ এগুলো পড়েছো স্বরূপানন্দ ? বই-টা আমাকে দিও তো – আমিও একটু দেখবো ৷ আমাকে অনেকেই অনেক বই দিয়ে যায় পড়ার জন্য ! কিন্তু আমার সবসময় সব ব‌ই পড়া হয় না, আসলে পড়ার সময়ই হয়ে ওঠে না ! দেখছো তো, এতো লোকজনের আসা-যাওয়া – সবার সাথে যোগাযোগ করতে করতেই আমার দিনের বেশিরভাগ সময় কেটে যায় ৷ তারপর ঘরে যখন একা থাকি , তখন হয় তৃষাণ _না হয় মুরারি কোনো না কোনো আশ্রমের সমস্যা নিয়ে এসে হাজির হয় ! ওদের দোষ দিচ্ছি না _ ওরাই বা কি করে ! আশ্রমের কোনো সমস্যার কথা–অসুবিধার কথা কাকে আর বলবে –আমাকেই তো বলবে ! তাই সেগুলোও শুনতেই হয় এবং সমাধানের ব্যবস্থাও করতে হয় ৷ ফলে পড়াশোনা করার সময় আর হয়ে ওঠে না । অনেকগুলো বই জমে গেলে স্বরূপানন্দকে ডেকে পাঠাই, বলি – বইগুলো লাইব্রেরীতে নিয়ে গিয়ে জমা করে নাও ৷ এখন আবার ঐ বইটা চাইলাম – হয়তো ঐ ব‌ইটায় একবার চোখ বোলাবো।
তবে, আমি ছোটবয়সে দুজন নাঙ্গা সন্ন্যাসীর সাথে যখন কৈলাস মানস সরোবর অঞ্চল ঘুরেছিলাম তখন যে সমস্ত স্থানে শিব বা সদাশিব থাকতেন, তার কিছু কিছু জায়গায় নাঙ্গা সন্ন্যাসীরা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল । সদাশিব প্রকৃতপক্ষে তিব্বতে শরীর নিয়েছিলেন, পরে উনি দীর্ঘদিন কৈলাস অঞ্চলে ছিলেন ৷ পৃথিবীতে এমন সাতটি (৭টি) field রয়েছে যেখানে সাধারণ জীব যেতে পারে না, শিবাবস্থার ব্যক্তিরাই যেতে পারেন। ওইগুলো সবই শিবস্থল(এই স্থানগুলির মধ্যে একটিকে কেউ কেউ ‘জ্ঞানগন্জ’ বলেছে), এরমধ্যে হিমালয়েই বেশ কয়েকটা এমন স্থান রয়েছে । শিবাবস্থা_একটা স্থিতি ! অষ্টপাশযুক্ত জীব, আর অষ্টপাশমুক্ত শিব । আজ্ঞাচক্রের পারে স্থিতিলাভ করেছেন যিনি_একমাত্র তিনিই পাশমুক্ত হোতে পারেন। এখনও হিমালয়ের ঐ সাতটি স্থানে একমাত্র পাশ-মুক্তরাই যেতে পারে ! আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ঐরূপ সাতটি স্থানেই পা দেবার !
সেগুলির মধ্যে কৈলাসেও একটি শিবস্থান রয়েছে ৷ আজও পরম্পরাগতভাবে ওখানে সদাশিবের ব্যবহৃত ত্রিশূল, বাঘছাল, বড় বড় রুদ্রাক্ষ ইত্যাদি অনেক কিছু সংরক্ষিত রয়েছে । ১৮০০০/১৯০০০ ফুট উঁচু কৈলাসের শিখর প্রদেশের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ঐসব রয়েছে । ওখানে যাবার পর আমি ঠিক কি দেখেছিলাম, তার সবটা তোমাদের বলতে পারবো না ! কারণ সেটার ব্যাপারে নানারকম নিষেধ রয়েছে এবং আমি এই নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারটা মেনে নিয়েছি । কিন্তু এটা তোমাদের অবশ্যই বলতে পারি যে, সদাশিব এবং পার্বতী কোনো এক সময় স্থূলশরীর ধারণ করেছিলেন এবং সদাশিব চমরী গরুর পিঠে চড়ে ঐ সমস্ত অঞ্চল ঘুরেছিলেন। তাছাড়া তিনি কিছুকাল ঐসব অঞ্চলে যে থেকেও ছিলেন __তাও নিশ্চিত এবং এইসব কথার অনেক বাস্তব প্রমাণ এখনও সেখানে বিদ্যমান !
একটা কথা রয়েছে শিবতত্ত্ব ! তত্ত্ব বা সংস্কৃতে ‘তত্ত্বম্’ কথাটির অর্থ ” তৎ – তম্ “। সুতরাং তত্ত্বে যা আছে_ বাস্তবেও তা আছে, অথবা আগে ছিল বা পরে হবে ! শিব সকলের আদর্শ, সবার দেবতা । শিব – ভোলানাথ, প্রমথেশ. পশুপতি, ভূতনাথ আবার দেবাদিদেব মহাদেব । ‘শিব’ অর্থে মঙ্গলরূপ-শান্তরূপ, আবার ‘রুদ্র’ অর্থে ভয়ঙ্কর রূপ । এইভাবে সব প্রকৃতির, সব অবস্থার মানুষ সহ অন্যান্য সকল জীবের আরাধ্য শিব !
ভারতীয় শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে__পৃথিবীর যাবতীয় জ্ঞান শিবের কাছ থেকেই সমাজের মানুষ পেয়েছে ৷ তন্ত্র বা আগম, আবার বেদ-বেদান্ত বা নিগম অর্থাৎ সমস্ত ধরণের সাধনবিদ্যাও শিবের কাছ থেকেই পাওয়া ! আবার সমাজবিজ্ঞান, আয়ুর্বেদবিজ্ঞান, শস্ত্রবিজ্ঞান বা ধনুর্বেদ সবেরই প্রবক্তা শিব ! স্বামী বিবেকানন্দ তো এইজন্যই তাঁর বক্তব্যে,বক্তৃতায় বিভিন্ন ভাবে শিব-বন্দনা বারবার করেছেন। বলেছিলেন_’সমগ্র পৃথিবী ঘুরে দেখেছি বিভিন্ন নামে বা রূপে শিব আর শিবানী-ই পূজিত হয়ে চলছেন!’ তিনি ভারতবাসীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘হে ভারত ! ভুলিও না সর্বত্যাগী শংকর-ই তোমার একমাত্র আরাধ্য, তোমার আদর্শ ।’