শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদদের কথা আলোচনা করতে গিয়ে আমরা এখন মদন মহারাজ বা স্বামী চিৎবিলাসানন্দ মহারাজের কথায় ছিলাম। তবে যাঁর কথা বা যাদের কথাই এখানে বলা হোক না কেন – সব কথার মূলে রয়েছেন সেই স্বামী পরমানন্দ ! যেমন সূর্য আছে বলেই দিনের বেলায় জগতের ছোটো, বড় সবকিছু আমাদের সামনে প্রকাশিত হয়ে ওঠে, আমরা বলতে পারি “দ্যাখো – দ্যাখো – এইগুলি কি ক্ষুদ্র, কতটা ছোটো !” অথবা বলতে পারি “ওই দ্যাখো মহাসাগর ! দেখেছো কি বিশাল তার ব্যপ্তি, কি প্রচণ্ড তার শক্তি ! ওই দ্যাখো ! অনন্ত আকাশকে দ্যাখো ! দেখেছো কি বিরাট – কতদূর পর্যন্ত তার প্রসার !” এই বলে আমরা সেগুলির মহিমা বর্ণনার চেষ্টা করি ! এখানেও যেন ব্যাপারটা সেইরকম হয় !
জগতে আমরা শরীর ধারণ করে – কত কি দেখি, কত কিছু নিয়ে ভাবি, লেখার দ্বারা, চিত্রের দ্বারা বা অন্যান্য কলার দ্বারা কতকিছু প্রকাশ করতে চাই, অপরকে বোঝাতে চাই, দেখাতে যাই, শেখাতে চাই। কিন্তু নিজেরই প্রকৃত রহস্যটা বোঝা হয়ে ওঠে না, শেখা হয়ে ওঠে না ! জগতের রহস্য বলতেই বা কি বোঝায়__? সেই রহস্যটা হোচ্ছে – ” সবকিছুরই মূলে রয়েছে সেই পরম সত্যস্বরূপ, পরমপুরুষ বা পরমাপ্রকৃতি !” ধর্মজগতের মানুষেরা সেই ‘পরমসত্য’-কেই ব্রহ্ম, ঈশ্বর, আল্লা, গড, কালী, কৃষ্ণ ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন নামে সম্বোধন করেছে, ভিন্ন ভিন্ন রূপে তাঁর উপাসনা করেছে ! আর এইটা করতে গিয়েই বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম পালন, ভিন্ন ভিন্ন স্তব-স্তুতি-প্রার্থনা মন্ত্রের উদ্ভব হয়েছে। মানুষ তার চেতনার জগতের level অনুযায়ী এক একটা মহামানবের জীবনাদর্শ, তাঁর দর্শন – সেই মতের ধর্মাচরণের পদ্ধতিগুলিকে তার মনের মতো ভেবে আপন করে নিয়ে থাকে ! এই মনুষ্য সমাজের সকল সদস্যরাই এইভাবে তার নিজ নিজ চেতনার level অনুযায়ী (অবশ্যই দেশ-কাল-পাত্রের প্রভাবও রয়েছে) ভিন্ন ভিন্ন ধর্মমত গ্রহণ ও ধর্মাচরণ পালন করে থাকে !
এই ভিন্নতা থেকেই মনুষ্য সমাজে জন্ম নিয়েছে ভেদ-বিভেদ-বিদ্বেষ-বিরোধ এবং ফলস্বরূপ হিংসা-মারামারি-রক্তারক্তি ! মারামারি, রক্তারক্তি অবশ্য হয় শুধুমাত্র রাজন্যবর্গ যখন নিজেদের মত-কে(ধর্মমতকে) অপরের উপর জোর করে চাপাতে শুরু করে – তখন ! রাজশক্তি যদি পুরোহিত(পাদ্রী) শক্তিকে আস্কারা না দেয় – তাহলে কখনোই সমাজে ধর্ম নিয়ে এতো বিদ্বেষ তৈরি হোতো না ! পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজন্যবর্গরাই তাদের কোনো না কোনো স্বার্থ কায়েম করার জন্য, তাদের মনোবাসনা চরিতার্থ করার জন্য __কালে কালে ধর্ম নেতাদেরকে ব্যবহার করেছে, – আর তার ফলেই আমাদের সমাজে এই ভয়ঙ্কর হিংসার, মানব হয়েও মানবের প্রতি বিদ্বেষ ও ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছে।
যাইহোক, আমরা ছিলাম স্বামী পরমানন্দ পার্ষদ মদন মহারাজের কথায়। উপরে উল্লিখিত মানবিকতা বিরোধী কোনোরকম মনোভাব আমরা কখনই মদন মহারাজের মধ্যে দেখিনি ! মহারাজ সহজ-সরল-সাদাসিধে মানুষ ছিলেন। ‘পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা’য় একেবারে গোড়ার দিকে একবার মদন মহারাজের কিছু কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তখনই উল্লেখ করা হয়েছিল যে, গুরুমহারাজের গর্ভধারিণীর সাথে মদন মহারাজের একটা সুন্দর সম্পর্ক ছিল। আসলে ‘মা নিভারাণী’ তো সবসময় তাঁর সন্ন্যাসী-পুত্র ‘রবি’-কে (গুরুমহারাজ) স্থূলে কাছে পেতেন না (সেটা তিনি প্রায়শই যাচ্ঞা করতেন)! তাই সন্ন্যাসীর বেশে থাকা মদন মহারাজ (অন্যান্য মহারাজদেরকেও নিশ্চয়ই)-কে কাছে পেলে ‘মা নিভারাণী’ তাঁকে নিজপুত্রের মতোই স্নেহ-ভালবাসায় ভরিয়ে দিতেন। নিজে নানান পদ রান্না করে খাওয়াতেন এবং খাবার পরিবেশন করে সামনে বসে থেকে খাওয়াতেন। সবচাইতে বড় ব্যাপার হোলো – বাড়িতে (কৃষ্ণদেবপুরে) ভালো কিছু পদ রান্না হলে (বিশেষতঃ ইলিশ মাছ বা গঙ্গায় ধরা কোন মাছ) মা ‘রবি’কে (গুরুমহারাজ) খাওয়াতে পারছেন না বলে_ মনে মনে দুঃখ করতেন। গর্ভধারিণীর সেই দুঃখ সঙ্গে সঙ্গে বনগ্রাম আশ্রমে থাকা গুরুমহারাজের অন্তরকে স্পর্শ করতো ! উনি মদন মহারাজকে ঘরে ডেকে পাঠিয়ে বলতেন – ” বিলাসানন্দ (গুরুমহারাজ এই নামেই মদন মহারাজকে সম্বোধন করতেন)! তোমার এখন বিজারা বা কালনার দিকে কোনো কাজকর্ম রয়েছে নাকি ! যদি থাকে তাহলে আমার মায়ের সাথে একবার দেখা কোরো। আর ওনার কাছেই খাওয়া-দাওয়া কোরো।”
মদন মহারাজ ওখানে গিয়ে দেখতেন – ‘মা’ যেন খাবার-দাবার সাজিয়েই বসে রয়েছেন ! উনি কৃষ্ণপুরের বাড়িতে পৌঁছানোর পর ‘মা’ বলতেন – ” আমি জানতাম ‘রবি’ ঠিকই কাউকে পাঠাবে। ও (গুরুমহারাজ) আমাকে বলেছিল – ‘ মা ! সবসময় তো আমাকে খাওয়াতে পারবে না, তবে জেনে রাখবে আমার আশ্রমের ছেলেদের খাওয়ালেই আমাকে খাওয়ানো হবে !”
সহজ-সরল মা নিভারাণী সেই কথাকেই ধ্রুবসত্য জ্ঞানে মেনে চলতেন। তাই মদন মহারাজ-সহ যেকোনো মহারাজ কৃষ্ণদেবপুরের বাড়িতে গেলে ‘মা’ খুব যত্ন করে খাওয়াতেন। মদন মহারাজকে যে গুরুমহারাজ মায়ের কাছে অনেকবার পাঠিয়েছিলেন – এই কথা মহারাজ আমাকে বেশ কয়েকবার বলেছিলেন ! [ক্রমশঃ]
জগতে আমরা শরীর ধারণ করে – কত কি দেখি, কত কিছু নিয়ে ভাবি, লেখার দ্বারা, চিত্রের দ্বারা বা অন্যান্য কলার দ্বারা কতকিছু প্রকাশ করতে চাই, অপরকে বোঝাতে চাই, দেখাতে যাই, শেখাতে চাই। কিন্তু নিজেরই প্রকৃত রহস্যটা বোঝা হয়ে ওঠে না, শেখা হয়ে ওঠে না ! জগতের রহস্য বলতেই বা কি বোঝায়__? সেই রহস্যটা হোচ্ছে – ” সবকিছুরই মূলে রয়েছে সেই পরম সত্যস্বরূপ, পরমপুরুষ বা পরমাপ্রকৃতি !” ধর্মজগতের মানুষেরা সেই ‘পরমসত্য’-কেই ব্রহ্ম, ঈশ্বর, আল্লা, গড, কালী, কৃষ্ণ ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন নামে সম্বোধন করেছে, ভিন্ন ভিন্ন রূপে তাঁর উপাসনা করেছে ! আর এইটা করতে গিয়েই বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম পালন, ভিন্ন ভিন্ন স্তব-স্তুতি-প্রার্থনা মন্ত্রের উদ্ভব হয়েছে। মানুষ তার চেতনার জগতের level অনুযায়ী এক একটা মহামানবের জীবনাদর্শ, তাঁর দর্শন – সেই মতের ধর্মাচরণের পদ্ধতিগুলিকে তার মনের মতো ভেবে আপন করে নিয়ে থাকে ! এই মনুষ্য সমাজের সকল সদস্যরাই এইভাবে তার নিজ নিজ চেতনার level অনুযায়ী (অবশ্যই দেশ-কাল-পাত্রের প্রভাবও রয়েছে) ভিন্ন ভিন্ন ধর্মমত গ্রহণ ও ধর্মাচরণ পালন করে থাকে !
এই ভিন্নতা থেকেই মনুষ্য সমাজে জন্ম নিয়েছে ভেদ-বিভেদ-বিদ্বেষ-বিরোধ এবং ফলস্বরূপ হিংসা-মারামারি-রক্তারক্তি ! মারামারি, রক্তারক্তি অবশ্য হয় শুধুমাত্র রাজন্যবর্গ যখন নিজেদের মত-কে(ধর্মমতকে) অপরের উপর জোর করে চাপাতে শুরু করে – তখন ! রাজশক্তি যদি পুরোহিত(পাদ্রী) শক্তিকে আস্কারা না দেয় – তাহলে কখনোই সমাজে ধর্ম নিয়ে এতো বিদ্বেষ তৈরি হোতো না ! পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজন্যবর্গরাই তাদের কোনো না কোনো স্বার্থ কায়েম করার জন্য, তাদের মনোবাসনা চরিতার্থ করার জন্য __কালে কালে ধর্ম নেতাদেরকে ব্যবহার করেছে, – আর তার ফলেই আমাদের সমাজে এই ভয়ঙ্কর হিংসার, মানব হয়েও মানবের প্রতি বিদ্বেষ ও ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছে।
যাইহোক, আমরা ছিলাম স্বামী পরমানন্দ পার্ষদ মদন মহারাজের কথায়। উপরে উল্লিখিত মানবিকতা বিরোধী কোনোরকম মনোভাব আমরা কখনই মদন মহারাজের মধ্যে দেখিনি ! মহারাজ সহজ-সরল-সাদাসিধে মানুষ ছিলেন। ‘পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা’য় একেবারে গোড়ার দিকে একবার মদন মহারাজের কিছু কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তখনই উল্লেখ করা হয়েছিল যে, গুরুমহারাজের গর্ভধারিণীর সাথে মদন মহারাজের একটা সুন্দর সম্পর্ক ছিল। আসলে ‘মা নিভারাণী’ তো সবসময় তাঁর সন্ন্যাসী-পুত্র ‘রবি’-কে (গুরুমহারাজ) স্থূলে কাছে পেতেন না (সেটা তিনি প্রায়শই যাচ্ঞা করতেন)! তাই সন্ন্যাসীর বেশে থাকা মদন মহারাজ (অন্যান্য মহারাজদেরকেও নিশ্চয়ই)-কে কাছে পেলে ‘মা নিভারাণী’ তাঁকে নিজপুত্রের মতোই স্নেহ-ভালবাসায় ভরিয়ে দিতেন। নিজে নানান পদ রান্না করে খাওয়াতেন এবং খাবার পরিবেশন করে সামনে বসে থেকে খাওয়াতেন। সবচাইতে বড় ব্যাপার হোলো – বাড়িতে (কৃষ্ণদেবপুরে) ভালো কিছু পদ রান্না হলে (বিশেষতঃ ইলিশ মাছ বা গঙ্গায় ধরা কোন মাছ) মা ‘রবি’কে (গুরুমহারাজ) খাওয়াতে পারছেন না বলে_ মনে মনে দুঃখ করতেন। গর্ভধারিণীর সেই দুঃখ সঙ্গে সঙ্গে বনগ্রাম আশ্রমে থাকা গুরুমহারাজের অন্তরকে স্পর্শ করতো ! উনি মদন মহারাজকে ঘরে ডেকে পাঠিয়ে বলতেন – ” বিলাসানন্দ (গুরুমহারাজ এই নামেই মদন মহারাজকে সম্বোধন করতেন)! তোমার এখন বিজারা বা কালনার দিকে কোনো কাজকর্ম রয়েছে নাকি ! যদি থাকে তাহলে আমার মায়ের সাথে একবার দেখা কোরো। আর ওনার কাছেই খাওয়া-দাওয়া কোরো।”
মদন মহারাজ ওখানে গিয়ে দেখতেন – ‘মা’ যেন খাবার-দাবার সাজিয়েই বসে রয়েছেন ! উনি কৃষ্ণপুরের বাড়িতে পৌঁছানোর পর ‘মা’ বলতেন – ” আমি জানতাম ‘রবি’ ঠিকই কাউকে পাঠাবে। ও (গুরুমহারাজ) আমাকে বলেছিল – ‘ মা ! সবসময় তো আমাকে খাওয়াতে পারবে না, তবে জেনে রাখবে আমার আশ্রমের ছেলেদের খাওয়ালেই আমাকে খাওয়ানো হবে !”
সহজ-সরল মা নিভারাণী সেই কথাকেই ধ্রুবসত্য জ্ঞানে মেনে চলতেন। তাই মদন মহারাজ-সহ যেকোনো মহারাজ কৃষ্ণদেবপুরের বাড়িতে গেলে ‘মা’ খুব যত্ন করে খাওয়াতেন। মদন মহারাজকে যে গুরুমহারাজ মায়ের কাছে অনেকবার পাঠিয়েছিলেন – এই কথা মহারাজ আমাকে বেশ কয়েকবার বলেছিলেন ! [ক্রমশঃ]
