জিজ্ঞাসু :– আমাদের মতো অনেক ছেলেমেয়েই সংসার-ত্যাগ করে আশ্রমে এসে নানারকম কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে । বিভিন্ন department-এ অনেকেই ভালো ভালো কাজ‌ও করছে । কই – তার জন্য আপনি তো আমাদের কারোরই তেমন প্রশংসা করেন না ?
গুরুমহারাজ :– সে কি রে! তুই প্রশংসা শোনার জন্য আশ্রমে থাকিস নাকি ? এখানে কোনো রকম কাজের সাথে যুক্ত থেকে তুই আমার কাছে শুধুই প্রশংসা শুনতে চাস !– ব্যস্ আর কিছু নয় ? তুই একটা মেয়ে হয়েও কি বোকা রে ‘লি..ল্’ ! তোদের জন্য প্রয়োজনীয় ‘কাজের কাজ’-টা যে আমি নীরবে করে চলেছি, তার সন্ধান কি তুই রাখিস ? তোদের মধ্যে কজন তার খবর রাখে ! বাকীদের কথা ছাড়্ – তোর কথাই বল্ – তুই কি তা টের পাস্ ? তুই কোনদিনই তার খোঁজ পাবিও না – কারণ তোর সেই চেষ্টা কোথায় ?
তাছাড়া দ্যাখ্, ___আমি যার তার প্রশংসা করতেই বা যাবো কেন ? কখন, কোথায়, কাকে প্রশংসা করতে হয়, সেটা তো আমি জানি । সেইরকম প্রশংসার যোগ্য হোলে, আমি তেমনটা করেও থাকি । কিন্তু এসবের মধ্যে আমি এটাও জানি যে, অযথা কারোর প্রশংসা করতে নেই ! এমনটা করে কাউকে হয়তো সাময়িক খুশী করা যায় কিন্তু তার প্রকৃত ‘ভালো’ করা যায় না ।
প্রশংসার দ্বারা কেউ বড় হয়েছে বা কারো চেতনার উন্নতি ঘটেছে, এমন দু-একটা উদাহরণ দেখাতে পারবি ? কোনো ব্যক্তি ‘বড়'(আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত) হয়ে বা চেতনার উন্নতি ঘটিয়ে মানুষের প্রশংসা পেয়েছে – জগতসংসারে সবসময় এমনটাই হয় ৷ একজনকে শুধু প্রশংসা দিয়ে, উৎসাহ দিয়ে খানিকটা কাজ করিয়ে নেওয়া যায় –এর দ্বারা ‘বড়’- কিছু হয় না ! ‘বড়’-কিছু করতে গেলে তার মধ্যে তো ‘মাল’ থাকতে হবে ! এটা জেনে রাখবি __ রত্নাকর-রাই বাল্মিকী হয় (রত্ন+আকর) ! অর্থাৎ এমন ব্যক্তি’ যার মধ্যে রত্ন আছে, ‘মাল’ আছে ! দ্যাখ্ না, সেই সময় তো বহু চোর-ডাকাত ওই অঞ্চলে ছিল, ব্রহ্মা আর নারদ ইচ্ছা করলেই তাদের সাথেও দেখা করতে পারতেন – কিন্তু তা করলেন না তো ! ‘যার’ দ্বারা হবে ‘তার’ কাছেই ওনারা গিয়েছিলেন ! ব্যাপারটা বুঝতে পারলি কি ?
তেমনি এখানেও অনেকে কাজ করছে __কিন্তু তাদের সবাই কি প্রশংসার যোগ্য ? এই আশ্রমের কর্মীরা সবাই কি নিজের নিজের কাজে Perfect ? যদি আমার এখানকার ব্রহ্মচারী-ব্রহ্মচারীনী-সন্ন্যাসীদের মধ্যে কেউ Perfect হয়ে থাকে , তাহলে জানবি_অবশ্যই তার প্রতি আমি সন্তুষ্ট ! আর গুরু যার উপর সন্তুষ্ট, তার আর কি চাই !
ভারতীয় দর্শনে একটা কথা রয়েছে_ গুরু রুষ্ট হোলে রুদ্রও শিষ্যকে ত্রান করতে পারেন না, কিন্তু গুরু কারো উপর তুষ্ট থাকলে ‘গুরু’-ই তখন তার সমস্ত রকম বিপদের ত্রাতা – তার আর ভয় কি ৷ আর তার চাহিদাই বা কি ?
যাই হোক, তুই আমার কাছে প্রশংসা শুনতে চাইছিলি বলেই এতো কথা তোকে বলছি । আমি তোকে আর‌ও বলছি শোন্‌ –’যেচে যেচে প্রশংসা শুনতে চাওয়াটা অজ্ঞানের লক্ষণ’ I প্রশংসায় কি হয় ! এতে শুধু শুধু মানুষের অহংকার বাড়ে – আর কিছুই হয় না ! তাই শুধু তুই কেন __ এখানে যারাই রয়েছে, তাদের সবাইকেই সাবধান করছি__ কেউ কখনোই অপরের কাছ থেকে প্রশংসা শোনার আশা করবে না ! এটা জেনে রাখবে যে, প্রশংসা শোনারও একটা ‘নেশা’ আছে ! এই মেয়েটির মতো অনেকেই চায় __পাঁচজনে তার প্রশংসা করুক, তাকে ভালো বলুক ! কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষা ভালো তো নয়ই, বরং খুবই খারাপ । বিশেষত যারা সাধন পথে রয়েছে, তাদের এই ব্যাপারটিতে চরম সাবধান হোতে হবে ! তোমরাও খুব সাবধানে থাকবে ! যেখানেই প্রশংসা শুনবে _ সেখানেই সচেতন হবে ! এর কারণ _ নিশ্চিত জানবে যে, এরপরেই ধাক্কা খাবার সম্ভাবনা ! প্রশংসার পরেই আসবে নিন্দা, অপবাদ, ঘৃণা!!
যাইহোক, এখানে যে সমস্ত ব্রহ্মচারী-ব্রহ্মচারীনী, সন্ন্যাসীরা কাজ করছে, আমি তাদেরকে উদ্দেশ্য করেই এই কথাগুলো বলছিলাম ! আমি দেখেছি __ এদের অনেকেই তাদের জন্য নির্ধারিত কাজটাও ঠিকঠাক করে না ! আশ্রমিক হয়েও অনেকে আশ্রমোচিত জীবন যাপন করে না ! ব্রহ্মচর্য্য নিয়েও কেউ কেউ ঠিকমতো তা রক্ষা করার চেষ্টা করে না ! গুরু পরম্পরার বিচারে এগুলি কিন্তু ভয়ঙ্কর অপরাধ ! তবে অবশ্য আমার এখানে(বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে) এইসব কর্মগুলিকে ‘অপরাধ’ বলে ধরা হয় না ! সেই অর্থে, আমি কোনো গুরুপরম্পরার গুরু নই –আর তাই এখানকার কারো কোনো অপরাধ আমি ধরি না ! যদি আমি গুরুপরম্পরার গুরু হোতাম __ তাহলে এদের অনেককেই আশ্রম থেকে বের করে দিতে হোতো ৷ কারণ সেক্ষেত্রে পরম্পরা আমাকে বারবার সতর্ক করতো –’এই ছেলেটি বা মেয়েটি, এই এই অপরাধ করছে! একে আশ্রম থেকে বের করে দাও” । আর ঐ পরম্পরার যে কোনো গুরুকে সেই নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য হোতেই হয় ৷ তাই তাদেরকে আশ্রম থেকে বের করে দিতে হোতো !
কিন্তু আমি স্বাধীন –আমি কোনো পরম্পরার দাস নই ৷ তাই আমার ওইসব কোনো দায়‌ও নাই । দ্যাখোনা, এখানে যে কেউ, যে কোনো অবস্থায় এসে আমাকে স্পর্শ করে প্রণাম করছে, আমার সাথে তর্ক-বিতর্ক করছে, কেউ কেউ আবার আমার সাথে ফস্টি-নস্টি করছে – দেখবে কোনো কোনো সময় আবার আমিও তাতে যোগ দিচ্ছি !
আমি এটা করছি_ কারণ আমি কারও দোষ দেখি না, কারো কোনো অপরাধ নিই না ৷ আমার এখানে যারা কাজ করে, তাদেরও অনেক সময় সেবা-অপরাধ হয়_ আমি সেগুলিকেও কিছু মনে করি না ! ফলে সরাসরি তাদের কোনো অপরাধও হয় না,ফলে তারজন্য এদেরকে কোনো Punishment-ও ভোগ করতে হবে না ।
তবে ভারতীয় সনাতন আদর্শের পরম্পরা তো রয়েছে । আমরা প্রতিদিনই আশ্রমে প্রার্থনায় একটি শ্বাশ্বত গুরুপরম্পরার মন্ত্র পাঠ করি – সেটি শুরু হয়েছে এই ভাবে, “নারায়নম্ পদ্মভবম্ তৎপুত্র বশিষ্ঠম….” ! এই সুপ্রাচীন গুরু পরম্পরাকে বা ভারতীয় মূল আদর্শকে যদি কেউ অপমান করে, অসম্মান করে __ তখন কোনোএকজন গুরুর দ্বারা না হোলেও পরম্পরাগত গুরুকুলের দ্বারা__ তার শাস্তি হবে । তাও আমি তোমাদের বলছি – আমাদের আশ্রমের কারও এইরকম কোনো ভুলের জন্য, যদি কোনো Punishment-ও হয় ___তাহলে কিছুদিন হয়তো সে ক্লেশ পাবে অর্থাৎ তার ঐ শাস্তির ভোগ-ভোগান্তি হবে । তবে, তা এমন কিছু নয় ! আমি ঠিক সময় বুঝে তাকে Hooking করে _ আবার এখানে নিয়ে আসবো । আধ্যাত্মিকভাবে পূর্ণতাদানের ভার যখন নিয়েছি, মাঝপথে কাউকে ছেড়ে রেখে দেব না । যাকে যেমন কৌশলে পারি – তার আধ্যাত্মিক উন্নতির রাস্তা প্রশস্ত করে রাখবো !
এইবার __একেবারেই যদি তার আত্মকৃপা না থাকে, বা প্রচেষ্টা না থাকে – তাহলে তার দুর্গতি কে আটকাবে বলো ! তবে সেক্ষেত্রেও অন্য পথ আছে ! সেই পথ দিয়েই আমি তাকে বের করে নিয়ে চলে যাবো ! কিন্তু সব আলোচনা এখানে করা যাবে না, স্থান-কাল-পাত্রে র ব্যাপার রয়েছে ! চেতনার উন্নতির ও উপযুক্ততার অভাব রয়েছে ৷ তাই এখন এই পর্যন্তই থাক!!(ক্রমশঃ)