জিজ্ঞাসু :– রামায়নে বর্ণিত চরিত্র হনুমানের যে মূর্তি এখন বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় সেখানে মুখটি বানরের মতো – শরীরটা মানুষের মতো । তাহলে কি রামচন্দ্রের সময় ওই ধরনের প্রজাতির মানুষ ছিল ?
গুরুমহারাজ :– দ্যাখো, এসব কথা আমি আগেও আলোচনা করেছি, হয়তো তুমি শোনোনি । রামায়নে বর্ণিত বা লিখিত কিষ্কিন্ধাকান্ডের যে চরিত্রগুলি বালি, সুগ্রীব, হনুমান, জাম্বুবান ইত্যাদি সবাইকেই বানর বা ভল্লুক ইত্যাদি জন্তু-জানোয়ারের মুখবিশিষ্ট হিসাবে এখানে দেখানো হচ্ছে । কিন্তু বাস্তবিক তা নয় ৷ হনুমান ছিলেন দক্ষিণ ভারতের মানুষ, শিবাবতার ৷ উনি ছিলেন মহাযোগী, মহাজ্ঞানী ও শক্তিমান মানুষ । কবিরাই ইতিহাসকে বিকৃত করেছে ৷ রামচন্দ্রের সময়কাল আজ থেকে প্রায় ১০০০০ (দশ হাজার) বছর আগের । ভারতবর্ষে বিদেশীরা এসে প্রাচীন শাস্ত্রাদির চরম ক্ষতিসাধন করেছে । যার ফলে ইতিহাসের Link -টা কেটে গেছে ৷ তাছাড়া উপযুক্ত শিক্ষকেরও অভাব হয়ে পড়েছিল । বিদেশীদের অত্যাচারে একসময় ভারতবর্ষে শিক্ষাদীক্ষার পাট‌ই প্রায় উঠে গেছিলো । যেটুকু ছিল, তা উচ্চ বর্ণের বংশপরম্পরার সঙ্কীর্ণ গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে প্রাচীন শাস্ত্রাদির রহস্য উদঘাটনের সঠিক আচার্যের অভাবেই এইরকম অসাধারণ চরিত্রে সাধারন জীববিশেষের মুখ বসে গেছে ৷৷
রামচন্দ্রের সময় উত্তরভারতের রাজবংশে ছিল আর্যসভ্যতার আলোকে আলোকিত মানুষেরা । তাছাড়াও আরও দুটি উন্নত সভ্যতাও ছিল তখন – নিষাদ সভ্যতা এবং দ্রাবিড় সভ্যতা । হনুমান-রা ছিল ভারতের দক্ষিণ অংশের দ্রাবিড় সভ্যতার লোক । তৎকালীন তিনটি সভ্যতাই কমবেশি যথেষ্টই উন্নত ছিল । এছাড়া ভারতবর্ষের বাইরে রাবণের সাম্রাজ্যেও যথেষ্ট সমৃদ্ধি ছিল, বিজ্ঞান প্রযুক্তিতেও লঙ্কাপুরী খুবই উন্নত ছিল । আবার রাবণের শ্বশুরবাড়ী মায়া সভ্যতার(বর্তমান দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে পড়ে) অন্তর্গত ছিল ৷ এই যে, রামায়ণে রয়েছে হনুমান লাফ দিয়ে সমুদ্র পার হয়েছিল – এখানে ব্যাপারটা হোচ্ছে হনুমান কোনো ছোট Space Ship ব্যবহার করেছিল, যা Sound Control -এ চলতো । এইধরনের কোনো উন্নত প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছিল হনুমান । কিন্তু ওই যে বললাম লঙ্কার প্রযুক্তিও যথেষ্ট উন্নত ছিল – ওদের Radar System (Radio Detection and Ranging) বহিরাগত Space ship-কে চিহ্নিত করে ফেলেছিল এবং মিসাইল চার্জ করে Space Ship -এ আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল ৷ এটাকেই হনুমানের লেজে আগুন বলে চালানো হয়েছে । কিন্তু হনুমান দক্ষ Pilot ছিল । ও ঐ জ্বলন্ত Space Ship কে লঙ্কার রাজপ্রাসাদের দিকে মুখ করে চালিয়ে দিয়ে নিজে Parachute নিয়ে লাফিয়ে নেমেছিল অশোককাননে । আর জ্বলন্ত Space ship -এর আগুনে লঙ্কার রাজপ্রাসাদের বেশ কিছুটা অংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং ঐ আগুন‌ই প্রাসাদের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ায় লঙ্কাপুরীর বেশ কিছুটা ক্ষতিসাধন হয়েছিল ৷ পরে কিছুকাল লঙ্কারাজ্যের জন-অরণ্যে ছদ্মবেশে মিশে থেকে বিভীষণের সহায়তায় পুনরায় রামের কাছে ফিরে এসেছিল হনুমান । এই তো হোল ইতিহাস ! আর এটাকেই বিভিন্ন পন্ডিতরা কি না কি সব ব্যাখা করেছে !
আবার দ্যাখো, লঙ্কাকে রাক্ষসপুরী বা রাবণদেরকে ‘রাক্ষস’ বলা হয়েছে কিন্তু তারা আমাদের কল্পনায় যেমনটা রয়েছে অথবা শিশুপাঠ্যে যে শিংওয়ালা, বড়দাঁত বা বিরাট চেহারাবিশিষ্টদেরকে রাক্ষস হিসাবে দেখানো হয়েছে –রাবণরা সেইরকমটা মোটেও ছিল না ! ওরাও আর পাঁচজনের মতোই দেখতে ছিল – সাধারণ মানুষ !
তৎকালীন রাবণের যে রাজ্য তা আজকের শ্রীলঙ্কা ঠিক নয়
৷ বর্তমান শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ দিক থেকে সুবর্ণদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত একটা স্থলভাগ (যা এখন সমুদ্রগর্ভে) জুড়ে ছিল তৎকালীন লঙ্কারাজ্য ৷ ওখানকার অধিবাসীরা দ্রাবিড় সভ্যতা এবং মায়া সভ্যতা _উভয় সভ্যতার সঙ্গেই সম্পৃক্ত ছিল ৷ কিষ্কিন্ধ্যার সম্রাট বালি-র সাথে লঙ্কারাজ রাবণের খুবই যোগাযোগ ছিল । অবশ্য ওদের মধ্যে শত্রুতা বা পারস্পরিক শক্তি প্রকাশের প্রতিযোগিতাও যথেষ্ট ছিল । প্রথম যৌবনে মন্দোদরীকে উভয়েই বিবাহ করার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছিল ৷ জনকের রাজসভায় সীতার স্বয়ংবর সভাতেও উভয়েই উপস্থিত ছিল – সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে, উভয়েই ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের রাজা হিসাবেই সভায় আমন্ত্রিত হয়েছিল ৷
এখানে ‘রাক্ষস’ অর্থে ‘রাক্ষস ভাব’। যেমন কোনো মানুষের স্বভাব উন্নত হোলে – বলা হয় ওনার ‘দেবভাব’। তেমনি কোনো মানুষ হিংস্র, শক্তি-প্রদর্শনকারী হলে আমরা বলি ‘অসুর ভাব’। এইরকমই ‘দানব ভাব’, ‘রাক্ষস ভাব’ অথবা ‘পিশাচ ভাব’। তৎকালীন লঙ্কা অঞ্চলের মানুষদের, বিশেষত রাজ-পরিবারের বেশীরভাগ মানুষের ‘রাক্ষস ভাব’ ছিল । তাই ওদেরকে ‘রাক্ষস’ বলা হয়েছে । রাবণ, কুম্ভকর্ণ, শূর্পণখাকে ‘রাক্ষস’ বা ‘রাক্ষসী’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে ৷ কিন্তু বিভীষণ ছিল দেব-স্বভাবের ৷ দেখবে, বিভীষণকে কোথাও রাক্ষস হিসাবে বর্ণনা করা হয়নি ৷… (শেষাংশ পরের দিন)