শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদদের সম্বন্ধে এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। তবে, এখানে একটা কথা বারবারই বলতে হয় যে, স্বামী পরমানন্দ সম্বন্ধে প্রায় কিছুই বলা যায় না ! স্বামী পরমানন্দের শিষ্য-ভক্ত-পার্ষদদের সম্বন্ধে তবু অনেক কিছু বলা যায়, কারণ এঁরা সকলেই সীমায়িত, এঁদেরকে সীমানার দ্বারা তবু বেঁধে রাখা যায় – কিন্তু স্বামী পরমানন্দ যে অসীম-অনন্ত ! তাহলে তাঁকে কি করে সম্পূর্ণ রূপে বর্ণনা করা যাবে ? যে যেটাই করবে তা হবে আংশিক ! যদি কেউ কখনো কোথাও বলে বসে যে, আমি স্বামী পরমানন্দের সবটা জানি – তাহলে জানতে হবে, সে হয় উন্মাদ না হয় অহংকারী অথবা মহা আহাম্মক !
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এইজন্যেই অন্ধদের হাতি-দর্শনের গল্পের অবতারণা করে এই ব্যাপারটাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। কতকগুলি অন্ধ যখন হাতি সম্বন্ধে ধারণা তৈরি করার মানসে কোনো মাহুতকে ধরে তার পোষ-মানা হাতিটার কাছে গিয়েছিল এবং তারা ওই হাতিকে স্পর্শ করে করে তার সম্বন্ধে একটা ধারণা করতে চেয়েছিল।
গুরুমহারাজের কাছে আমরা শুনেছিলাম পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয়ের সাথে পঞ্চকর্মেন্দ্রিয়ের যোগাযোগের কথা ! যেমন চক্ষুর সাথে সম্পর্ক রয়েছে হস্তের ! আমরা সাধারণভাবেও যদি দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকারে যদি আমাদের কিছু খুঁজতে হয় তখন তা আমাদেরকে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজতে হয়। ‘হাতড়ে খোঁজা’ অর্থে – হাতের সাহায্যে স্পর্শ করে করে – “এটা নয়, ওটাও নয়” – এইভাবে খুঁজতে হয় ! সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে, অন্ধ-ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এটাই স্বাভাবিক রীতি ! তারাও যে কোনো বস্তুকে ‘হাত’ দিয়ে স্পর্শ করেই বিচার করে, তার মূল্যায়ন করে।
ঠাকুরের গল্পের ওই অন্ধগুলিও এইরূপ-ই করেছিল – ওদের কেউ পোষা হাতিটির পা ধরেছিল, কেউ লেজ ধরেছিল, আবার কেউ হাতির একটা কানে হাত দিয়ে হাতিটি কেমন দেখতে তা বোঝার চেষ্টা করছিল, কেউ শুধু হাতির পেটের কাছটায় কেবল হাত বুলিয়ে যাচ্ছিলো ! ফলে যখন তাদেরকে ‘হাতি ঠিক কেমন দেখতে’– তা জিজ্ঞাসা করা হোলো, তখন তাদের মধ্যে কেউ বললো – ”হাতি দেখতে থামের মতো”, কেউ বললো – ”মোটা দড়ির মতো”, আরেকজন বললো – “কুলোর মতো”, অন্যজন বললো – “না-না, হাতি বড় জালার (বড় হাঁড়ি) মতো”!
তাহলে অন্ধরা একটা ‘হাতি’ দেখতে চেয়েই যদি বর্ণনার ক্ষেত্রে এইরকম গোলমাল বাধিয়ে বসে – তাহলে আমাদের মতো অজ্ঞানান্ধ, মোহান্ধ, ষড়রিপুর তাড়নায় অন্ধ সাধারণ ব্যক্তিরা অনাদি-অসীম-অনন্ত পরমব্রহ্মের কূল-কিনারা কি কখনো করতে পারবো ? কখনোই পারবো না !
এইরূপে, অক্ষর ব্রহ্মের প্রথম প্রকাশিত রূপ ঈশ্বরের সম্বন্ধে সম্যক ধারণা বা ঈশ্বরতত্ত্বের সীমায়িত রূপ ‘ভগবান’- সম্বন্ধেও বা কিভাবে সম্যক ধারণা করতে পারবো ? তাই আমাদের চেষ্টাও হবে ঐরকমই ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র, খন্ড-খন্ড ! বলতে পারা যায় – এক-একজনের ঈশ্বরের মহিমা বর্ণনা যেন এক-একটা খণ্ডচিত্র – তার বেশি কিছুই নয় ! মহাজ্ঞানী পুষ্পদন্ত তার ‘শিবমহিম্ন স্তোত্র’ লিখতে গিয়ে ঐজন্যেই সেই বিশেষ শ্লোকটি লিখেছিলেন – ” অসিত-গিরি-সমং স্যাত্ কজ্জলং সিন্ধু-পাত্রে ……… পারং ন যাতি।৷”
প্রায়দিনই মূল লেখার চাইতে উপক্রমণিকাটাই বড় হয়ে যাচ্ছে ! এইজন্য পাঠককুলের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি। আমরা ছিলাম পরমানন্দ-পার্ষদ ‘স্বামী ভগবতানন্দ’ বা ‘বাউল বাবা’ সম্পর্কিত কথায় – তাই সেখানে ফিরে যাই ! বাউলবাবার জীবন কিন্তু খুবই বিচিত্র এবং সংগ্রামপূর্ণ ! বাড়ি-ঘর, পিতা-মাতা বা পরিজন থাকা সত্ত্বেও এবং হাতের কাজে প্রসিদ্ধি থাকা সত্বেও ছোটবেলা থেকেই তাঁর যে স্বভাবসিদ্ধ ভ্রাম্যমাণ ভবঘুরে জীবনের প্রতি অমোঘ আকর্ষণ – এটাই তাঁকে আর পাঁচজনের থেকে পৃথক করে রেখেছিল ! তিনি যখন যেখানেই থেকেছেন – সঙ্গীত তাঁর সঙ্গে থেকেছে, আর থেকেছে একান্ত গোপনে তাঁর সাধন-ভজন। উনি নিজের মুখেই বলেছিলেন যে, “যেকোনো পরিস্থিতিতে, এমনকি অনেক মানুষের মধ্যে থেকেও কখনোই তাঁর সাধন-ভজনের বিঘ্ন ঘটেনি !
যাই হোক, আমরা এবার আসবো গুরুমহারাজের সাথে স্বামী ভাগবতানন্দ মহারাজের (তখনকার সুকুমার দা) প্রথম সাক্ষাৎকারের সময়কার কথায় ! সেটা কিন্তু তাঁর কাছে মোটেই সুখস্মৃতি ছিল না ! ধাত্রীগ্রামের (মালতিপুর) গোবিন্দ প্রামাণিকদের যে দলটি বাউলবাবার সাথে গান-বাজনা করতো – সেই পুরো দলটিকে নিয়েই মহারাজ প্রথমবারের জন্য বনগ্রাম আশ্রমে এসেছিলেন। গোবিন্দদার সাথে মহারাজের প্রথম যোগাযোগ হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। কিন্তু উনি বনগ্রাম আশ্রমে এসেছিলেন ১৯৭৯-সালে সরস্বতী পূজাের পরের পরদিন অর্থাৎ মাকড়ি সপ্তমী তিথির দিন। এদিকে গুরুমহারাজ সরস্বতী পুজোর তিথিতেই (শুক্লাপঞ্চমী) সকলের অনুমতিক্রমে বনগ্রামে তার কুঠিয়াতেই ”নির্বিকল্প সমাধি” সম্পন্ন করার জন্য আসন স্থাপন করে বসে পড়েছিলেন ! বনগ্রামের মুখার্জিবাড়ির মানুষজন (দেবীবাবু, ন’কাকা, দীপ্তি মহারাজ, তপি-মা) এবং তৃষাণ মহারাজ, মিহির মহারাজ প্রমুখরা পালাপালি করে গুরুমহারাজের কুঠিয়াকে পাহারা দিচ্ছিলেন !
যদিও তখন ওই দিকটায় গ্রামের মানুষজন তেমন একটা যেতো না, তবু কৃষকেরা যেতো এবং রাখাল বালকের গরু-চড়ানোর জন্য ঝোপ-ঝাড় বিশিষ্ট ওই স্থানটিকে পছন্দ করতো ! তাছাড়াও গুরুমহারাজের নিজস্ব কোনো প্রয়োজন হতে পারে – এইসব কারণেই রাতদিন পাহারার ব্যবস্থা ছিল ! (এর পরের ঘটনা পরের আলোচনায়।) [ক্রমশঃ]